ইরান হুমকি দিয়েছে লেবাননে ইসরাইল যদি হামলা চালানো অব্যাহত রাখে, তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু করবে। মঙ্গলবার রাতের শেষ মুহূর্তে হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বুধবারই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, যখন তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং সৌদি আরবের একটি তেল পাইপলাইনে হামলা চালায়। লেবাননে ইসরাইলের বিমান হামলার প্রতিবাদে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দাবি করে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতায় নেই, তবে ইরান বলছে এটি অন্তর্ভুক্ত। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্ত স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে: যুদ্ধবিরতি নাকি ইসরাইলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। দুইটি একসঙ্গে সম্ভব নয়। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের একটি বক্তব্য তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়েছিল- যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা লেবাননসহ সর্বত্র তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
বুধবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, ইসরাইল লেবাননে হামলা কিছুটা কমাতে রাজি হয়েছে। তিনি বলেন, আমার বোঝাপড়া অনুযায়ী, ইসরাইল লেবাননে তাদের হামলা কিছুটা সংযত করতে চেয়েছে, যাতে আলোচনাগুলো সফল হয়। তিনি যুদ্ধবিরতির ফাটলকে একটি বাস্তবসম্মত ভুল বোঝাবুঝি বলে উল্লেখ করেন। বলেন, ইরান ভেবেছিল লেবানন চুক্তির অংশ, কিন্তু বাস্তবে তা নয়।
বুধবার বিকেলে ইসরাইল মাত্র ১০ মিনিটে বৈরুতে ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। তারা বলেছে, এটি ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ নির্মূলের অভিযান। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এতে অন্তত ১১২ জন নিহত হয়েছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের সঙ্গে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আমরা তাদের ওপর সর্বশক্তি দিয়ে হামলা চালিয়ে যাব। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, ইসরাইলকে এর জন্য শাস্তি দেয়া হবে।
এই সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তাতে নেতৃত্ব দেবেন জেডি ভ্যান্স, স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। তবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আলোচনার কাঠামো ভঙ্গের অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগ হলো- ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার অস্বীকার করা, ইরানের আকাশসীমায় ড্রোন পাঠানো এবং লেবাননে হামলা চালাতে দেয়া। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি বা আলোচনা অযৌক্তিক।
মঙ্গলবার রাতে ডনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া সময়সীমার মাত্র ৯০ মিনিট আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন- হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে তিনি ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করে দেশটিকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেবেন। এই যুদ্ধবিরতির শর্ত ছিল- ইরান প্রণালি খুলে দেবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করবে। কিন্তু বুধবারই ইরান সৌদি আরবের একটি তেল পাইপলাইন এবং কুয়েতের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়, যা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা কয়েক ঘণ্টায় ৯টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কুয়েতের সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ইরানের তীব্র হামলার ঢেউ মোকাবিলা করছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সব পক্ষ যেন সংযম প্রদর্শন করে এবং দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে সম্মান করে, যাতে কূটনীতি এগিয়ে যেতে পারে।
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বলেন, এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তিতে রূপ দিতে হবে। তিনি বলেন, এর প্রভাব ইতিমধ্যে বৃটেনে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস পরিস্থিতিকে কিছুটা হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। তারা বলেছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে সময় লাগে এবং তারা পরিস্থিতি ‘মিনিটে মিনিটে’ পর্যবেক্ষণ করছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার খবর ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’।