দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস কেন দায়িত্ব নেননি? কোন প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ? কীভাবে তারা বঙ্গভবনে গেলেন? পরিকল্পনা করেছিলেন কে? গ্রেফতারের পর তারেক রহমানকে অমানবিক নির্যাতনের জন্য দায়ী কারা? রিমান্ডে থাকা লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং লে. জেনারেল শেখ মামুন খালেদ ও বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আফজাল নাছেরের কাছ থেকে এসব প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করছেন জিজ্ঞাসাবাদকারী গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তারা।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গতকাল বিকালে ঢাকার পল্টন থানায় মানব পাচার আইনে করা মামলায় দ্বিতীয় দফার ১১ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক মো. রায়হানুর রহমান তৃতীয় দফায় চার দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
গতকাল এজলাস থেকে নামার সময় নিজের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীনকে উদ্দেশ করে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেশপ্রেমের এই নমুনা, ‘আজ আমার হাতে হাতকড়া। আমি দেশের জন্য কাজ করেছি, মানুষের জন্য কাজ করেছি। সেই দেশপ্রেমের কারণেই আজ আমাকে হাতকড়া পরানো হয়েছে। মামলাগুলো হয়রানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য করা হয়েছে।’
জিজ্ঞাসাবাদকারী সূত্র জানিয়েছে, দুই সাবেক জেনারেলের কাছে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সরিয়ে সেনা-সমর্থিত সরকার গঠনের নেপথ্য ঘটনা, প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে গোয়েন্দা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে জেনারেল মাসুদ বলেন, তত্কালীন তিন বাহিনীর প্রধানসহ পাঁচ সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব ছাড়তে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না; পরে একটি চা-চক্রে যোগ দেন।
জেনারেল মাসুদ জানিয়েছেন, এক-এগারোর সময় প্রথমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব নিতে তিনি রাজি হননি। পরে ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কোকো এবং শেখ হাসিনাকে তত্কালীন সরকারের নির্দেশে গ্রেফতারের কথা জানান তিনি।
তবে এক্ষেত্রে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করেছেন। গ্রেফতার হওয়া দুই জেনারেলই এক-এগারোর পর তারেক রহমানকে নির্যাতনের বিষয়ে দায় অস্বীকার করেছেন। জেনারেল মাসুদ গোয়েন্দাদের কাছে দাবি করেছেন, নির্যাতনের খবর পেয়ে পরদিন তিনি এ বিষয়ে তত্কালীন সেনাপ্রধানের সামনে প্রতিবাদ করেছিলেন।
তত্কালীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার একপর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে ১৩টি শর্ত দিয়েছিল। মুক্তির জন্য শেখ হাসিনা শর্তগুলো মেনে নিলেও খালেদা জিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে জানিয়েছেন সাবেক দুই জেনারেল। জেনারেল মাসুদ আরো জানিয়েছেন, পরবর্তী সরকার কীভাবে গঠন করা হবে, তা নিয়ে আলোচনার জন্য মেজর হুমায়ুন নামের এক কর্মকর্তা প্রতি বৃহস্পতিবার শেখ হাসিনাকে গুলশানে ডিজিএফআইয়ের একটি সেফ হাউসে নিয়ে যেতেন। তবে এমন আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এক-এগারোর সরকারে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রসঙ্গে জেনারেলরা বলেন, সব দেশেরই কিছু না কিছু ভূমিকা থাকে। তবে এ বিষয়ে তারা সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
কীভাবে ওয়ান ইলেভেন হলো এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ উদ্দিন বলেছেন, তত্কালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদসহ তিন বাহিনীর প্রধান বঙ্গভবনে প্রবেশ করতে চাইলেও তাদের প্রথমে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তত্কালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার সামরিক সচিব আমিনুল করিম ছিলেন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের অনুগত। তার হস্তক্ষেপে তিন বাহিনীর প্রধান বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। সে সময় বঙ্গভবনে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন ব্রিগেডিয়ার বারী এবং লে. জেনারেল জাহাঙ্গীরসহ আরো অন্য কর্মকর্তারা। এরপর বঙ্গভবনে উপস্থিত হন লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তারা রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টাকে জরুরি অবস্থা জারির জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা প্রবল চাপ প্রয়োগের পর জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য হন রাষ্ট্রপতি।
মানব পাচার আইনে রাজধানীর পল্টন থানায় করা মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর তৃতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রায়হানুর রহমান চার দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করলে শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলমের আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। দ্বিতীয় দফায় ছয় দিনের রিমান্ড শেষে আজ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আদালতে হাজির করা হয়। বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে আদালতের হাজতখানা থেকে হাতকড়া ও মাথায় হেলমেট পরিয়ে কড়া পুলিশি পাহারায় তাকে আদালতে হাজির কর হয়। শুনানি শেষে বিকাল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে তাকে আবার হাজতখানায় নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে রিমান্ড শুনানি করেন সৈয়দ গোলাম মুর্তুজা ইবনে ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম সরকার। আদালতে তারা বলেন, এই আসামিরা সিন্ডিকেট করে ২ হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্সির কাছ থেকে কমিশন বাণিজ্য করে। কমিশন না দিলে তারা কাজ পেত না। এই সিন্ডিকেটের সবাই পলাতক তিনি ছাড়া। বাকি আসামিদের তথ্য জানার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে দুই কৌঁসুলি আরো বলেন, এই আসামি এক-এগারোর কুশীলব ছিলেন। টাকার নেশায় তিনি রিক্রুটিং এজেন্সি নিয়ে এই সিন্ডিকেট করেন। রিমান্ডে তিনি সব তথ্য দেননি। পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের জন্য চার দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।
আসামিপক্ষে রিমান্ড বাতিল চেয়ে শুনানি করেন আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ মামলায় আসামিকে দুই দফায় ১১ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার রিমান্ড আবেদনের ফরোয়ার্ডিং দেখলাম, সেখানে তদন্তসংক্রান্ত অগ্রগতির কিছুই লেখেননি। আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম আরো বলেন, ‘আমরা সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানতে পারছি, এটা মানব পাচার মামলা, কিন্তু এই তথ্য উদ্ঘাটন না করে তদন্ত কর্মকর্তা অন্য তথ্য উদ্ঘাটনে ব্যস্ত।
আত্মসাত্ করা টাকা উদ্ধার করা—এটা রিমান্ডে নেওয়ার গ্রাউন্ড হতে পারে না। এই লোকের বয়স ৭২ বছরের বেশি। মাইল্ড (মৃদু) স্ট্রোক হওয়ার কারণে ব্রেনে সার্জারি করা হয়েছে। হার্টে দুইটা রিং (স্টেন্ট) পরানো। তবু বারবার প্রেশার (চাপ দিয়ে) করে ওনাদের এক্সপেক্টেড (প্রত্যাশামতো) কথাগুলো পাচ্ছেন না। মনমতো তথ্য পাচ্ছেন না বলে রিমান্ডের আবেদন করা হচ্ছে।