সহযোগীদের খবর: সুমিতোমো করপোরেশনের নেতৃত্বাধীন এ কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার ব্যাপারে দরকষাকষি করছে সরকার। ৩ এপ্রিল ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ‘থার্ড টার্মিনাল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ’ বিষয়ক এক সভায় রাজস্ব ভাগাভাগির এ প্রস্তাব দেয় জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধি দল। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন
যদিও জাপানি কনসোর্টিয়ামকে তাদের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। ৩ এপ্রিল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের বরাত দিয়ে মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাপানি প্রতিনিধি দলকে পুনরায় সংশোধিত প্রস্তাব দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে এটি ছিল জাপান-বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিতীয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে, যেখানে টার্মিনাল থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের ১৮ শতাংশ বাংলাদেশকে দেয়ার প্রস্তাব করেছিল জাপানের কনসোর্টিয়াম।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাব অনুযায়ী জাপানি কনসোর্টিয়াম ১৫ বছরের জন্য থার্ড টার্মিনালে অপারেটর হিসেবে থাকবে। এ সময়ে (১৫ বছর) টার্মিনাল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৫৯ দশমিক ৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে তারা। বিনিময়ে টার্মিনাল থেকে যা আয় হবে, তার সাড়ে ২২ শতাংশ বাংলাদেশকে দেয়া হবে।
বেবিচকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, থার্ড টার্মিনাল থেকে রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ। অ্যারোনটিক্যাল চার্জের মধ্যে রয়েছে প্যাসেঞ্জার সার্ভিস ফি, ল্যান্ডিং চার্জ, বোর্ডিং ব্রিজ চার্জ ও কার্গো সিকিউরিটি চার্জ। শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রীদের কাছ থেকে বর্তমানে ৫০০ টাকা বা ৬ দশমিক ৪ ডলার এবং অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য ৫০ টাকা সার্ভিস ফি আদায় করা হয়। থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৭ সালে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী এ বিমানবন্দর ব্যবহার করবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীর সংখ্যা ১ কোটি ৩৫ লাখের বেশি।
অন্যান্য অ্যারোনটিক্যাল চার্জের মধ্যে ঢাকা বিমানবন্দরে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট থেকে গড়ে ২ হাজার ১৫৭ ডলার ল্যান্ডিং চার্জ আদায় করা হয়। প্রতিটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট থেকে ল্যান্ডিং চার্জ বাবদ আদায় করা হয় ৩ হাজার ৩০০ টাকা। বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহারের জন্য প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট থেকে গড়ে ১৩৮ ডলার আদায় করা হয়। আর কার্গো সিকিউরিটি চার্জ হিসেবে প্রতি কেজি পণ্যের বিপরীতে দশমিক শূন্য ৬ ডলার আদায় করা হয়। বেবিচকের তথ্য বলছে, বছরে এক লাখের বেশি ফ্লাইট শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করে।
অন্যদিকে নন-অ্যারোনটিক্যাল রাজস্ব আয়ের খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে শুল্কমুক্ত দোকান, খাবার ও পানীয় বিক্রি, পার্কিং, গাড়ি ভাড়া, বিজ্ঞাপন, লাউঞ্জ, রিয়েল এস্টেট লিজিং, মুদ্রা বিনিময়সহ বিমানবন্দরের যাবতীয় বাণিজ্যিক কার্যক্রম। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, একটি বিমানবন্দরের মোট আয়ের ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত আসে নন-অ্যারোনটিক্যাল খাত থেকে।
২১ হাজার ১৩৯ কোটি টাকায় নির্মিত থার্ড টার্মিনালের অপারেটর নিয়োগ দিতে ২০২৩ সালে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে দফায় দফায় বৈঠক হলেও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারও একাধিক বৈঠক করে জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে। রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারও থার্ড টার্মিনালে অপারেটর নিয়োগ দিতে পারেনি। যদিও এক বছরের বেশি সময় ধরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালুর জন্য ‘প্রস্তুত’ অবস্থায় রয়েছে টার্মিনালটি।
বেবিচকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টার্মিনাল পরিচালনার জন্য যে কোম্পানিকে নিযুক্ত করা হবে, তারা চুক্তির পরপরই টার্মিনালে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করে টার্মিনালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে ছয়-আট মাসের মতো সময় লাগতে পারে। এখন পর্যন্ত অপারেটরের সঙ্গে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় চলতি বছর টার্মিনাল চালুর সম্ভাবনা কমে আসছে বলে জানিয়েছেন তারা।
টার্মিনালের অপারেটর নিয়োগ নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চলমান আলোচনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চুক্তি নিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা চলমান আছে। আলোচনায় অনেক বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি।’