রাজধানীর কালাচাঁদপুর এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া খাতুন জোয়ার সাহারা এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তাঁর হাতের আঙুলের ফাঁকে ছোট ছোট ফোসকার মতো দেখা দেয়। তীব্র চুলকানির সঙ্গে ক্ষত তৈরি হয়ে আঙুল থেকে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সাদিয়া বলেন, ‘সারা শরীরে চুলকানির যন্ত্রণায় রক্ত বেরিয়ে গেছে। অবস্থা বেগতিক হওয়ায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি জানান আমি ছোঁয়াচে রোগ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন, ক্রিম লাগিয়ে এবং ব্যবহৃত কাপড়, বিছানার চাদর সবকিছু পরিচ্ছন্ন করে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি।’
দেশের বেশ কিছু জায়গায় ছোঁয়াচে রোগ স্ক্যাবিসের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। ঢাকা, গাজীপুর, রাজশাহী, কুমিল্লা, দিনাজপুরসহ দেশের বেশ কিছু জায়গায় স্ক্যাবিস আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। ছোঁয়াচে হওয়ার কারণে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রামক এই রোগ।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়া নয়; ছোঁয়াচে রোগ স্ক্যাবিস একধরনের পরজীবীর কারণে হয়। আমার ৪৩ বছরের কর্মজীবনে এত বেশি স্ক্যাবিস আক্রান্ত রোগী দেখিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, মেসে বসবাসকারী শিক্ষার্থী, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, হোস্টেলে থাকা কর্মজীবী নারী-পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। পোশাককর্মী, বস্তিতে বসবাসকারী বাসিন্দারা আক্রান্ত হচ্ছেন। গাদাগাদি করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকলে, কাপড় পরিচ্ছন্ন না রাখলে, নিয়মিত সাবান দিয়ে গোসল না করলে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
শিশু, বয়স্ক এবং যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা বেশি আক্রান্ত হয়।’ এই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘স্ক্যাবিসের প্রচলিত মুখে খাওয়ার ওষুধ, লোশন, ক্রিমগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। তাই এই রোগ প্রতিরোধী কার্যকর ওষুধ খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পরিবারে একজন আক্রান্ত হলে পুরো পরিবারকেই চিকিৎসার আওতায় নিতে হবে। বারবার স্ক্যাবিস আক্রান্ত হলে রোগীর কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এজন্য এ রোগের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।’
স্ক্যাবিস রোগের বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্ক্যাবিস বা খোসপাঁচড়া একটি অত্যন্ত সংক্রামক চর্মরোগ, সারকোপটিস স্ক্যাবি নামের একধরনের মাইক্রোস্কোপিক পরজীবী প্রাণীর কারণে হয়। এই পরজীবী মানুষের ত্বকের ওপরের স্তরে বাসা বেঁধে ডিম পেড়ে বংশবিস্তার করে, ফলে তীব্র চুলকানি, লাল ফুসকুড়ি এবং ছোট ছোট ফোসকার সৃষ্টি হয়। রোগটি সাধারণত হাতের আঙুলের ফাঁক, কবজি, কোমর, নিতম্ব এবং জননাঙ্গের চারপাশে বেশি দেখা যায়। রাতে এই চুলকানি তীব্র আকার ধারণ করে, যা রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে।’
আক্রান্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা : বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, গণরুম, মেসে থাকা শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হচ্ছেন স্ক্যাবিসে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রায়হান ইসলাম জানান, প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ জন এ ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মশিউর আলম বলেন, প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ জন রোগী স্ক্যাবিস রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য আসছেন। অসচেতনতায় মূলত এ রোগ ছড়াচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, গত তিন মাসে পাঁচ শতাধিক রোগী স্ক্যাবিস রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার্থী ৮০ শতাংশ ও শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ২০ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
পোশাকশিল্প শ্রমিকদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি : দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের লাখো শ্রমিকের কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি অনেকেই বসবাস করেন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত ‘অ্যাসেসমেন্ট অব স্ক্যাবিস সিম্পটমস অ্যান্ড রিস্ক ডিটারমিন্যান্টস অ্যামং গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি ওয়ার্কার্স অব টঙ্গী, গাজীপুর, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত একটি পোশাক কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্রে স্ক্যাবিসে আক্রান্ত ১০০ কর্মীকে নিয়ে করা হয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া সবাই চুলকানির কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ৮৮ শতাংশের রাতে চুলকানি বেড়ে যায়। ৯৪ শতাংশের শরীরে স্ক্যাবিসের সাধারণ লক্ষণ-লালচে দানা, ফুসকুড়ি বা ত্বকের নিচে মাইটের তৈরি সরু দাগ পাওয়া যায়। টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মাহমুদ ইকবাল হাফিজ বলেন, স্ক্যাবিস আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে পোশাক কারখানার নারীশ্রমিকের সংখ্যা বেশি। এ ছাড়া শিশু ও অন্য রোগীরাও আসেন। উৎস: বিডি-প্রতিদিন।