কক্সবাজারের প্রবালসমৃদ্ধ পাথুরে দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের উপকূলকে মাছের খনি বলা হয়। তবে এখন সেখানে মাছের খরা চলছে। দ্বীপের আড়াই শ জেলের ট্রলারে মাছ ধরা পড়ছে না। বরং ঝাঁকে ঝাঁকে জেলিফিশ ও জেলিফিশ আকৃতির ক্ষুদ্র প্রাণী ‘জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন’ উঠে আসছে জেলেদের জালে। সূত্র: প্রথম আলো
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলিফিশের মতো দেখতে জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন নরম জেলির আবরণে তৈরি। স্থানীয় জেলেরা এটিকে নুইন্যা বলে ডাকেন। এরা স্রোতের বিপরীতে খুব বেশি সাঁতার কাটতে পারে না, স্রোতের সঙ্গে ভেসে বেড়ায়। মানুষের শরীরে লাগলে চুলকায়। এটি সামুদ্রিক মাছের জন্য ক্ষতিকর। এরা মাছের খাবার, মাছের ডিম ও পোনা নষ্ট করে। বঙ্গোপসাগরে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের বিচরণ কমে যাওয়ার এটিও অন্যতম কারণ হতে পারে। সাগরে জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন অতিরিক্ত হারে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় ট্রলারমালিক ও জেলেদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বেড়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্সের একদল গবেষক সেন্ট মার্টিনে গবেষণা চালিয়ে সমুদ্রের বিশাল এলাকায় ঝাঁকে ঝাঁকে জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন প্রাণীর বিচরণ দেখতে পেয়েছেন।
দ্বীপে মাছের সংকট
সেন্ট মার্টিন বোট মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও দুটি ট্রলারের মালিক আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, গত ১ ডিসেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ভ্রমণে যাচ্ছেন হাজারো পর্যটক। তখন কিছু ছোট ইলিশ, কালো চান্দা, পোপা, ফ্লাইং ফিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ ধরা পড়েছিল। সাত থেকে আট দিন ধরে কোনো মাছই ধরা পড়ছে না। সাগরের বিশাল এলাকাজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে নুইন্যার (জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন) বিচরণ দেখা যাচ্ছে, যা অতীতে দেখা যায়নি। জেলেদের ধারণা, নুইন্যার কারণে সাগর থেকে সামুদ্রিক মাছ উধাও হয়ে গেছে। হঠাৎ সেন্ট মার্টিন উপকূলে কেন এই প্রাণীর বিচরণ, তা জানা যাচ্ছে না। এ জন্য দরকার গবেষণা।
সম্প্রতি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে জলসীমানায় গবেষণা চালিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ‘জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের’ অস্বাভাবিক আধিক্য ও উপস্থিতি পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের একদল গবেষক। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ চৌধুরীর নেতৃত্বে সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের একটি গবেষক দল দীর্ঘদিন ধরে সেন্ট মার্টিনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জেলিফিশ ও তাদের নিকটতম প্রজাতির উপস্থিতি ও বিস্তার নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছেন।
সেন্ট মার্টিন ও ছেঁড়াদিয়া সৈকতে ইদানীং জেলিফিশ ও জেলিফিশ আকৃতির মৃত প্রাণী ভেসে আসছে বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনে জেলিফিশ কিংবা জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন প্রাণীর বিচরণ বেড়েছে কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ আমাদের নেই। কী কারণে হঠাৎ এমনটা হচ্ছে, সাগর থেকে মাছ কেন উধাও হলো, তা নিয়ে গবেষণা দরকার।’
সমুদ্র–গবেষক ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা জানান, বঙ্গোপসাগরে অন্তত ২৫ প্রজাতির জেলিফিশ বিচরণ করে, তবে কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন উপকূলে তিন প্রজাতির জেলিফিশের বিচরণ দেখা যায়। এর মধ্যে হোয়াইট জেলিফিশ (সাদা নুইন্যা) বর্ষার শেষে কিংবা শীতের শুরুতে বেশি দেখা যায়। এগুলো দেখতে সাদা বা হালকা নীলচে রঙের। এই প্রজাতি মানুষের খাদ্য হিসেবে উপযোগী। মুন জেলিফিশ নামের আরেক প্রজাতি কক্সবাজার ও কুয়াকাটা উপকূলে বিচরণ করে। এটি স্বচ্ছ ও কাচের মতো পরিষ্কার। হালকা গোলাপি-লালচে জননাঙ্গ রয়েছে এর। শরীরের সংস্পর্শে এলে সামান্য চুলকানি হতে পারে। আর বক্স জেলিফিশ সেন্ট মার্টিন ও টেকনাফ উপকূলে বেশি বিচরণ করে। এটি অত্যন্ত বিষাক্ত এবং দংশন মানুষের জন্য মারাত্মক হতে পারে। তবে জেলিফিশ কিংবা জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন—দুটিই মৎস্যসম্পদের জন্য বেশ ক্ষতিকর।
এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জেলিফিশ কিংবা জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের উপস্থিতি বাড়তে পারে। সাগরে সামুদ্রিক কাছিমের উপস্থিতি যদি কমে যায়, তাহলে জেলিফিশের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে এবং সামুদ্রিক মৎস্য ভান্ডারে তার প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, সামুদ্রিক কাছিমের প্রধান খাদ্য জেলিফিশ। আবার জেলিফিশের প্রধান খাদ্য মাছের ডিম, রেণু বা পোনা। তবে সেন্ট মার্টিনের জেলিফিশ কিংবা জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের উপস্থিতি নিয়ে এই কেন্দ্রের হালনাগাদ তথ্য বা গবেষণা নেই।
কী বলছেন গবেষকেরা
সম্প্রতি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে জলসীমানায় গবেষণা চালিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের অস্বাভাবিক আধিক্য ও উপস্থিতি পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের একদল গবেষক । অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ চৌধুরীর নেতৃত্বে সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের একটি গবেষক দল দীর্ঘদিন ধরে সেন্ট মার্টিনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জেলিফিশ ও এদের নিকটতম প্রজাতির উপস্থিতি ও বিস্তার নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছেন।
এই গবেষণার অংশ হিসেবে ২০ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ১১ দিন দলটি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উপকূলসহ দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সামুদ্রিক জলজ পরিবেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি জরিপের কাজ সম্পন্ন করেন।
গবেষক দলের প্রধান ড. অধ্যাপক শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, জরিপের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানীরা সালফিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের বৃহৎ ঝাঁকের সন্ধান পান। প্রতিটি ঝাঁক কয়েক কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব ঝাঁকে প্রাণীর সংখ্যা এতই বেশি যে সহজে এদের উপস্থিতি পানির ওপর থেকেও টের পাওয়া যায়।
শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, একই ইনস্টিটিউটের গবেষকদের ২০২১ সালে পরিচালিত অন্য একটি গবেষণায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রথম এই প্রাণীর অস্তিত্ব রেকর্ড করা হয়, যা খ্যাতনামা স্প্রিঙ্গার কর্তৃক প্রকাশিত ‘থ্যালাসাস, এন ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেরিন সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত হয়।
শাহনেওয়াজ চৌধুরীর মতে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপের চারপাশে বিস্তীর্ণ এলাকায় এমন অধিক সংখ্যক জেলিফিশ জাতীয় প্রাণীর উপস্থিতি এর আগে দেখা যায়নি। এ ধরনের প্রাণীর উপস্থিতি সামুদ্রিক জলজ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতাকে ইঙ্গিত করছে বলে মনে করেন তিনি।