শিরোনাম
◈ জাতিসংঘসহ ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ◈ পাঁচটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই শীর্ষ পদে শিবির প্রার্থীদের জয়ের কারণ কী? ◈ এনআইডি সংশোধন চালু নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত ◈ গাজীপুরে ঝুটের আগুন ছড়িয়েছে ১০ গুদামে, ৩ ঘণ্টাতেও আসেনি নিয়ন্ত্রণে (ভিডিও) ◈ আমরা খেলব, কিন্তু ভারতের বাইরে খেলব: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (ভিডিও) ◈ চিকিৎসা খরচ কমাতে বড় পদক্ষেপ সরকারের ◈ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড আরোপ দুঃখজনক হলেও অস্বাভাবিক নয়: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ◈ হাসনাতের আসনে নির্বাচন করতে পারবেন না বিএনপির মঞ্জুরুল: চেম্বার আদালতের রায় ◈ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কি পুনর্গঠন হবে? : ফরেন পলিসির বিশেষ প্রতিবেদন ◈ ধর্মঘট প্রত্যাহার, এলপি গ্যাস বিক্রি শুরু

প্রকাশিত : ০৭ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৫৩ বিকাল
আপডেট : ০৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ কেন? দ্বীপটি কতটা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে শনিবার (৩ জানুয়ারি) হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত ও আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। এই ঘটনার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুদিনের হুমকিগুলোর একটি বাস্তবে রূপ নেয়।

এই ঘটনার পর থেকেই তার পররাষ্ট্রনীতির ‘ইচ্ছা তালিকা’ নিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, ডেনমার্কের অধীনে থাকা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে তার বারবার প্রকাশ্য আগ্রহ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সাহসী সামরিক অভিযানের পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এতে ওয়াশিংটন ও তার ন্যাটো মিত্র ডেনমার্কের সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিদেশি কোনো হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। আবার গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষও বারবার জানিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না। এমনকি, ড্যানিশ প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে এও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের অবস্থান ন্যাটো জোটের ভাঙনের কারণও হতে পারে।

তাহলে প্রশ্ন হলো- কেন ট্রাম্প বারবার এই দূরবর্তী, জনসংখ্যায় কম দ্বীপটির দিকে নজর দিচ্ছেন? আর কেন বিষয়টি ইউরোপে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে?

গ্রিনল্যান্ড কেমন জায়গা?

গ্রিনল্যান্ড ৮ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমাইল বা ২১ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি সম্পদসমৃদ্ধ দ্বীপ। এটি একসময় ডেনমার্কের উপনিবেশ ছিল, বর্তমানে দেশটির স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। এটি বিশ্বের সবচেয়ে কম জনঘনত্বের দেশ।

এই দ্বীপ এতটাই দূরবর্তী যে, মাত্র ৫৬ হাজার বাসিন্দা এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে নৌকা, হেলিকপ্টার ও উড়োজাহাজ ব্যবহার করেন। দ্বীপটির পশ্চিম উপকূলে ছড়িয়ে থাকা শহরগুলোর মধ্যে রাজধানী নুক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রঙিন বাড়িঘর, খাঁজকাটা উপকূলরেখা ও পেছনের পাহাড়ের মাঝখানে গড়ে ওঠা এই শহর গ্রিনল্যান্ডের চিত্রই তুলে ধরে।

শহরগুলোর বাইরে গ্রিনল্যান্ড মূলত বন্য প্রকৃতি। এর ৮১ শতাংশ ভূমি বরফে ঢাকা। জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ ইনুইট বংশোদ্ভূত ও দীর্ঘদিন ধরে এখানকার অর্থনীতি মূলত মৎস্যনির্ভর।

কৌশলগতভাবে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থানে এবং তথাকথিত ‘জিআইইউকে গ্যাপের’ ওপর অবস্থিত। গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার এই সামুদ্রিক পথ আর্কটিক মহাসাগরকে আটলান্টিকের সঙ্গে যুক্ত করে।

গ্রিনল্যান্ড ট্রাম্পের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়ার মাঝামাঝি কৌশলগত অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। আবার গ্রিনল্যান্ডে রয়েছে তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজসহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ। অন্যদিকে, জলবায়ু সংকটে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলতে থাকায় উত্তরাঞ্চলীয় নৌপথগুলো বছরের বেশি সময়জুড়ে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, যা অঞ্চলটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।

গ্রিনল্যান্ডের তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজের বিশাল ভাণ্ডার এটিকে আরও কৌশলগত করে তুলেছে। বিশেষ করে বিরল খনিজের ক্ষেত্রে চীন বিশ্ববাজারে আধিপত্য বিস্তার করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এসব খনিজ বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুশক্তি টারবাইন থেকে শুরু করে সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে অপরিহার্য।

জলবায়ু সংকটে বরফ গলে যাওয়ায় গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ ভবিষ্যতে আরও সহজে উত্তোলনযোগ্য হতে পারে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় নৌপথ দীর্ঘ সময়ের জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যের দিকও বদলে যেতে পারে- যদিও ট্রাম্প জলবায়ু সংকটকে ‘সবচেয়ে বড় প্রতারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তবে ট্রাম্প সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার, খনিজের জন্য নয়। কিন্তু তার সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ফক্স নিউজকে বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রশাসনের আগ্রহ মূলত ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ’ ও ‘প্রাকৃতিক সম্পদ’ ঘিরেই।

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের সম্পর্ক কী?

মাদুরোকে উৎখাত করার পরদিন ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দরকার ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে’। হোয়াইট হাউজের নীতিবিষয়ক উপ-প্রধান স্টিফেন মিলারও একই বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করেন।

রোববার (৪ জানুয়ারি) এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। এখন এটি অত্যন্ত কৌশলগত। গ্রিনল্যান্ডে রুশ ও চীনা জাহাজে ভরে গেছে। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে না চাইলেও পরে তিনি যোগ করেন, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার, আর ডেনমার্ক এটা সামলাতে পারবে না।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউজ জানায়, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে ‘বিভিন্ন বিকল্প’ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং সামরিক পদক্ষেপও নাকচ করা হচ্ছে না।

এর আগে ট্রাম্প কী বলেছেন?

প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কেনার সম্ভাবনা নিয়ে খোঁজখবর নিয়েছিলেন। দ্বীপ কর্তৃপক্ষ ‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়’ জানালেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি আবার বিষয়টি সামনে আনেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, বিশ্বব্যাপী জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একান্ত প্রয়োজন।

তিনি পরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দরকার ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তার’ জন্য। এরপর ২০২৫ সালের মার্চে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ড সফরে গিয়ে বলেন, দ্বীপটির ডেনিশ নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি, তবে গ্রিনল্যান্ডবাসীকেই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে।

রয়টার্সের বরাতে জানা যায়, গ্রিনল্যান্ডে করা জরিপে ৮৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে বিরোধিতা করেছেন।

ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কী?

যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তাহলে ন্যাটো জোট ভেঙে পড়তে পারে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আরেকটি ন্যাটো দেশের ওপর সামরিক হামলা চালায়, তাহলে সবকিছু থেমে যাবে। ন্যাটো ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল সেটিও ভেঙে পড়বে।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ইউরোপের বড় শক্তিগুলোর নেতারা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, আর্কটিক নিরাপত্তা ন্যাটোর মাধ্যমেই যৌথভাবে রক্ষা করতে হবে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্কের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, গ্রিনল্যান্ড তার জনগণের। এ সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের।

তারা আরও বলেন, ন্যাটো আর্কটিক অঞ্চলকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে ও ইউরোপীয় মিত্ররা সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

গ্রিনল্যান্ডবাসীরা কী ভাবছেন?

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য দ্বীপটির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত করেছে। ডেনমার্কের উপনিবেশিক ইতিহাস ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই এখানকার রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। ১৯৫৩ সালে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ হয়। ১৯৭৯ সালে পায় স্বশাসন ও ২০০৯ সালে আত্মশাসনের অধিকার অর্জন করে। তবে পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও মুদ্রানীতি এখনো ডেনমার্কের হাতে।

সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় রাজনীতিকরা স্বাধীনতার কথা বললেও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি। সব গ্রিনল্যান্ডবাসী স্বাধীনতা চান না, তবে খুব কম মানুষই ডেনমার্কের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের শাসন চান।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন বলেন তিনি গ্রিনল্যান্ড চান এবং আমাদের ভেনেজুয়েলা ও সামরিক হস্তক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত করেন, তখন তা শুধু ভুল নয়, এটি অসম্মানজনক।

তিনি আরও বলেন, আর কোনো সংযুক্তিকরণের কল্পনা নয়। আমরা সংলাপে আগ্রহী, আলোচনায় আগ্রহী; তবে তা হতে হবে সঠিক পথে ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান রেখে। গ্রিনল্যান্ড আমাদের ঘর, আমাদের ভূখণ্ড ও সেটাই থাকবে।

তবে পার্লামেন্ট সদস্য ও যুক্তরাষ্ট্রপন্থি নালারাক পার্টির কুনো ফেনকার বলেন, ট্রাম্পের কিছু মন্তব্য ভালোভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, তিনি যদি বলেন গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে বা তারা যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দিতে পারে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বড় প্রস্তাব। তবে তিনি এও বলেন, যখন সামরিকভাবে দখল বা সংযুক্তিকরণের কথা ওঠে, তখন সেটিকে ভালোভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সূত্র: সিএনএন

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়