মনিরুল ইসলাম: দীর্ঘ সাত বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা ভোটের মাঠে গড়ায়নি। নির্ধারিত ৮ আগস্ট ভোটগ্রহণের আগেই হাইকোর্টের নির্দেশে নির্বাচন দুই মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। ফলে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে দেশের চলচ্চিত্র প্রযোজকদের অন্যতম এই সংগঠন।
নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর সাধারণ সদস্যদের ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে খোরশেদ আলম খসরু ও শামসুল আলমের নেতৃত্বাধীন প্যানেল।
বুধবার সকালে এ বিষয়ে খোরশেদ আলম খসরু বলেন, তারা আদালতের অনুমতি নিয়ে শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে এতে অংশ নেবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আইন মেনেই ভোটাধিকার আদায়ে লড়ে যাব।’
খসরু অভিযোগ করেন, প্রযোজক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল হাইকোর্টে রিট আবেদন করার পর আদালত নির্বাচন স্থগিত করেন। তার দাবি, এই রিটের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ সদস্যদের ভোটাধিকার খর্ব করে ভোট ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন করার পথ তৈরি করা।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক একটি সংগঠনে সদস্যদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভোট ছাড়া কোনো নির্বাচন বৈধ হতে পারে না।
সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী শামসুল আলম বলেন, তারা আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। সদস্যদের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, উজ্জ্বল-লিপু প্যানেল ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে তারা দাবি করে, নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়; বরং আইন ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ার অংশ।
তাদের ভাষ্য, প্রার্থিতা নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও আপিল বোর্ডের বিপরীত সিদ্ধান্তের কারণে বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে গড়ায়। চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে।
সমিতির নির্বাচন সংকটের শিকড় বহু পুরোনো। সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট। এরপর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আইনি জটিলতায় আর নির্বাচন সম্ভব হয়নি। ২০১৬-১৮ মেয়াদে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও গঠনতন্ত্রের ৯(গ) ধারা নিয়ে আদালতে মামলা হওয়ায় সেটিও থেমে যায়। এরপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসকের মাধ্যমে সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
চলতি বছর ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রযোজকদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়। নির্বাচনে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে—উজ্জ্বল-লিপু প্যানেল এবং খসরু-শামসুল আলম প্যানেল।
তবে শুরু থেকেই মনোনয়ন বাতিল, আপিল বোর্ডের সিদ্ধান্তসহ নানা জটিলতায় নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত আদালতের স্থগিতাদেশে সেই প্রক্রিয়াও থেমে গেছে।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠনটি কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রযোজকদের স্বার্থ রক্ষা, চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পের নীতিনির্ধারণে সংগঠনটির ভূমিকা—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা না গেলে চলচ্চিত্র শিল্পে স্থবিরতা আরও বাড়তে পারে। প্রযোজকদের মধ্যে বিভক্তি তীব্র হওয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও চলচ্চিত্র প্রযোজনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে নির্বাচন স্থগিতের পর দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে যাচ্ছে। খসরু-শামসুল প্যানেল ভোটাধিকার রক্ষায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। অন্যদিকে উজ্জ্বল-লিপু প্যানেলও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার দাবি করছে।
তবে নির্বাচন কবে নাগাদ অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন সমিতির সাধারণ সদস্য ও সংশ্লিষ্টরা।