ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। একই সঙ্গে ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব নিয়োগ পর্যালোচনারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমুজাদ্দেদী আলফেসানী পৃথকভাবে এসব সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সুপারিশের জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে রয়েছেন উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্য এবং সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমুজাদ্দেদী আলফেসানী বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেছেন—এমন অভিযোগ ও বিভিন্ন প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা পড়েছে। সেসব অভিযোগ যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং তারা যে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষক’ প্ল্যাটফর্মের জমা দেওয়া ১২৫ শিক্ষকের তালিকাও তদন্ত কমিটি পর্যালোচনা করবে। উপাচার্য বলেন, অভিযুক্ত কোনো শিক্ষক যদি কোনো শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কার্যক্রমও স্থগিত করা হতে পারে।
এর আগে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল এবং জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) উপাচার্যের কাছে আওয়ামী লীগপন্থি নীল দলের শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা দেন। তাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় নীল দলের কিছু শিক্ষক সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরোধিতা করেন এবং তৎকালীন সরকারের অবস্থানকে সমর্থন দেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি উল্টো তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. তাজমেরি এস এ ইসলাম জানান, জুলাই নিয়ে কটূক্তি ও শিক্ষার্থীবিরোধী অবস্থানের অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা মিললে অন্যদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব নিয়োগ পর্যালোচনা করা হবে। এজন্য উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালামের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন অনুষদের ডিনরা ওই কমিটির সদস্য থাকবেন।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্টে’র (হেকাপ) আওতায় বাস্তবায়িত গবেষণা প্রকল্পগুলোর অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমুজাদ্দেদী আলফেসানীর নেতৃত্বে পৃথক আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সভায় অধ্যাপক সাদেকা হালিমের বিরুদ্ধে আগের তদন্ত কমিটির স্থায়ী বহিষ্কারের সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন অভিযোগে অধ্যাপক মো. আবদুল মুহিত, অধ্যাপক আবু সারা শামসুর রউফ, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন, ড. রফিক শাহরিয়ার, অধ্যাপক আফরোজা শেলী এবং অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলামকে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও ক্লাস নেওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই নীল দলের রাজনীতিতে যুক্ত।
অন্যদিকে, সিন্ডিকেট সভা চলাকালে ডাকসু, হল সংসদ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধা-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত নীতিমালার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে সিট বণ্টনের নতুন নীতিমালা অনুমোদন না দিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আরও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।