চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থ, টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ, তাদের যোগ্যতা, কার্যক্রম, দায়িত্ব ও জবাবদিহি নির্ধারণ করে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (বার্থ, টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ) বিধিমালা, ২০২৬’-এ অপারেটর নিয়োগ থেকে শুরু করে লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন, কার্যক্রম পরিচালনা, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে। গত ৫ নভেম্বর বিধিমালার গেজেট জারি হয়। এতে বার্থ, টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগে দরপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই নিয়োগে সরকারের অনুমোদন এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুসরণ করতে হবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো অপারেটর বন্দর কর্তৃপক্ষ বা রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নিরাপত্তার পরিপন্থি কোনো কাজে জড়িত হলে, এমন কাজে সহায়তা কিংবা সমর্থন করলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের তালিকাভুক্তি ও লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করা যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর আইন, ২০২২-এ বার্থ অপারেটর, টার্মিনাল অপারেটর ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের বিধিমালার আওতায় পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। সেই আইনের বিধান বাস্তবায়ন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আনতেই নতুন এই বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।’
বিধিমালায় বার্থ অপারেটর, টার্মিনাল অপারেটর ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের কার্যক্রম পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠান কী ধরনের কাজ করতে পারবে, কী যোগ্যতা থাকতে হবে, কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের অভ্যন্তরে কর্তৃপক্ষের নিয়োগ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অপারেটর হিসেবে কাজ করতে পারবে না বলে বিধান রাখা হয়েছে।
বিধিমালায় বার্থ, টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা ও সক্ষমতা যাচাই করে নিয়োগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধান অনুসরণ করতে হবে। দরপত্রের কার্যক্রম ই-জিপির মাধ্যমে অথবা বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিয়ে অফলাইনে সম্পন্ন করারও সুযোগ রাখা হয়েছে।
দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট কাজ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও কারিগরি সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। জাহাজ থেকে পণ্য ও কনটেইনার ওঠানো-নামানো, পণ্য সংরক্ষণ, ডেলিভারি এবং সংশ্লিষ্ট অপারেটিং সিস্টেম পরিচালনার সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, নতুন দরদাতাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার নির্ধারিত কিছু প্রাক্?যোগ্যতার শর্ত শিথিল করতে পারবে। এ ছাড়া একাধিক পুরনো বা নতুন লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত শর্ত যৌথভাবে পূরণ করে অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী একজন সফল দরদাতাকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য বার্থ, টার্মিনাল বা শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে। তবে সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে পাঁচ বছরের বেশি সময়ের জন্যও অপারেটর নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, বার্থ অপারেটর নির্ধারিত বার্থে জাহাজ, জেটি ও ইয়ার্ডে পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম পরিচালনা করবে। আমদানি পণ্য ও কনটেইনার নির্ধারিত সংরক্ষণ এলাকা, শেড বা গুদামে স্থানান্তর এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সংরক্ষণের দায়িত্বও পালন করতে হবে।
সংরক্ষণস্থল থেকে আমদানিকারকের পরিবহনে পণ্য ও কনটেইনার সরবরাহ করতে হবে। জাহাজে পণ্য ওঠানো-নামানো, জেটি ও ইয়ার্ডের কার্যক্রম এবং কনটেইনার স্টাফিং ও আন-স্টাফিংয়ের দায়িত্বও অপারেটরকে পালন করতে হবে।
জাহাজে পরিচালিত কার্যক্রমের জন্য জাহাজের মালিক, এজেন্ট বা পণ্যপ্রাপকের কাছে এবং জেটি ও ইয়ার্ডের হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে অপারেটর দায়বদ্ধ থাকবে। কনটেইনার স্টাফিং ও আন-স্টাফিংয়ের ক্ষেত্রে মেইন লাইন অপারেটর এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ উভয়ের কাছে দায়বদ্ধতার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া জাহাজে পণ্য ওঠানো-নামানোর পরিকল্পনা, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা ও জাহাজের প্রতিনিধির সঙ্গে পরামর্শ করে শিপ প্ল্যান, ইয়ার্ড প্ল্যান ও ক্রেন সিকোয়েন্স তৈরি করতে হবে।
অপারেটরদের দায়িত্বের মধ্যে শ্রমিক ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিজ নিজ কার্যক্রমে নিয়োজিত শ্রমিকদের বিদ্যমান আইন, বিধি ও শ্রম আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শ্রমিকদের মজুরি, পারিশ্রমিক, মজুরি বৃদ্ধি, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কাজের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত সুরক্ষামূলক পোশাক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দিতে হবে। শ্রমিকদের আইনানুগ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও প্রাপ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর বন্দরের বহিঃনোঙর এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জেটি ছাড়া অন্যান্য মুরিং ও বিশেষায়িত জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক, কর্মচারী, গিয়ার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। জাহাজে পণ্য ওঠানো বা নামানোর আগে সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট বা পণ্যপ্রাপকের কাছ থেকে কার্গো সারসংক্ষেপ, ম্যানিফেস্ট ও স্টোয়েজ প্ল্যান সংগ্রহ করতে হবে। বিদেশগামী জাহাজে পণ্য বোঝাইয়ের ক্ষেত্রে জাহাজের চিফ অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে কার্গো পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
জাহাজ থেকে লাইটারে পণ্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট, পণ্যপ্রাপক ও লাইটার সরবরাহকারীর সঙ্গে পরামর্শ করে পরিকল্পনা করতে হবে। পণ্য ওঠানো-নামানোর আগে প্রয়োজনীয় কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র এবং ডেলিভারি অর্ডার সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির উপযুক্ত সনদ সংরক্ষণ ও কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করতে হবে। ভারী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে প্রতি ছয় মাস অন্তর এবং হালকা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে প্রতি তিন মাস অন্তর সনদ দাখিলের বিধান রাখা হয়েছে।
শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের মধ্যে কাজ বণ্টনের জন্য পাঁচ সদস্যের জাহাজ বরাদ্দ কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। কমিটিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিবহন ব্যবস্থাপক (অপারেশন) আহ্বায়ক থাকবেন।
বিধিমালায় শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের কার্যক্রমে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত, নষ্ট বা বিনষ্ট হলে জাহাজের মালিক, এজেন্ট, পণ্যপ্রাপক বা শিপারের কাছে অপারেটর দায়বদ্ধ থাকবে। একইভাবে পণ্য ওঠানো-নামানোর সময় বন্দরের মালিকানাধীন সম্পদ, স্থাপনা, সরঞ্জাম বা অন্য কোনো সম্পত্তির ক্ষতি হলে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে দায় নিতে হবে।
বিধিমালায় টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, সরঞ্জাম, পরিচালন সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতার বিষয়গুলো দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী যাচাই করা হবে।
টার্মিনাল পরিচালনায় কনটেইনার ও পণ্য জাহাজ থেকে নামানো, জাহাজে তোলা, সংরক্ষণ, ডেলিভারি এবং সংশ্লিষ্ট অপারেটিং সিস্টেম পরিচালনার সক্ষমতা থাকতে হবে। দরপত্রে অংশগ্রহণকারীকে নির্ধারিত যোগ্যতার সমর্থনে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র দাখিল করতে হবে। একাধিক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবেও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে আবেদন করতে পারবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনালের জন্য বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এগুলো হলো পতেঙ্গা, লালদিয়া ও নিউমুরিং। নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।
সূত্র : দৈনিক আমাদের সময়