শিরোনাম
◈ প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ‘স্নাইপার’ মন্তব্য, ছাড়া পেয়ে যা বললেন কলেজশিক্ষার্থীর বাবা (ভিডিও) ◈ গভীর রাতে ভুলতা-গাউছিয়া রোডে ডাকাতের কবলে রফিকুল ইসলাম মাদানি (ভিডিও) ◈ ১৭০ বছর পর বাণিজ্যিক উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা, বিশ্ববাজারে রপ্তানির অপেক্ষায় বাংলাদেশের ঢাকাই মসলিন ◈ এমবাপের জোড়া গোলে ক্লাসিকোয় বা‌র্সেলোনার বিরু‌দ্ধে রিয়াল মা‌দ্রিদের জয় ◈ একটু খ্যাতি পেলেই পরিশ্রমে ভাটা, ক্রিকেটারদের ধু‌য়ে দি‌লেন পি‌সি‌বি সভাপ‌তি   ◈ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা: এবার কোন পথ বেছে নেবে বিএনপি? ◈ চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী ◈ দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার পথে জিম্বাবুয়েতে দুই বাংলাদেশির রহস্যজনক মৃত্যু ◈ ৩৪ দিন পর শ্রেণিকক্ষে ফেরার সিদ্ধান্ত চুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ◈ বিশ্বে প্রথম ভাসমান হাইড্রোজেন উৎপাদন প্ল্যাটফর্ম নামালো চীন

প্রকাশিত : ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১২ দুপুর
আপডেট : ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৪ দুপুর

প্রতিবেদক : মনজুর এ আজিজ

১৭০ বছর পর বাণিজ্যিক উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা, বিশ্ববাজারে রপ্তানির অপেক্ষায় বাংলাদেশের ঢাকাই মসলিন

বাসস: সরকারের দূরদর্শী উদ্যোগ, বিজ্ঞানীদের নিরলস জিনোম গবেষণা ও প্রান্তিক নারী কারিগরদের আঙুলের জাদুতে কিংবদন্তির ‘বোনা বাতাস’ বা ‘হাওয়াই কাপড়’ ঢাকাই মসলিন রূপকথার পাতা থেকে বাস্তবে ফিরে এসেছে। সুতা তৈরির আদি প্রযুক্তি ও কাঁচামাল পুনরুদ্ধার করে মসলিন এখন বাণিজ্যিকভাবে বিশ্ববাজারে ডানা মেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েছে।

এক খণ্ড সাদা মেঘের মতো স্বচ্ছ, ভোরের শিশিরের মতো স্নিগ্ধ আর বাতাসে ওড়ানো সুতোর মতো হালকা ঢাকাই মসলিন খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকেই বিশ্বের প্রথম সারির লাক্সারি ব্র্যান্ড হিসেবে রোমান, গ্রিক ও আরব সাম্রাজ্যে সমাদৃত ছিল।

মুঘল আমলে এর আভিজাত্য এমন শিখরে পৌঁছায় যে মসলিনের শ্রেষ্ঠ সংস্করণ ‘মলমল খাস’ শুধু সম্রাটদের পরিধানের জন্য সংরক্ষিত থাকত।

নকশা ও গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে বাঙালির শৈল্পিক অহংকার ও বুননশিল্পের পরম পরাকাষ্ঠা মসলিনের ছিল বিভিন্ন কাব্যিক নাম। যেমন: আবে-রওয়ান (প্রবাহিত পানি) ও শবনম (ভোরের শিশির)।

Advertisement

একটি আস্ত শাড়ি দিয়াশলাইয়ের বাক্সে এঁটে যাওয়া কিংবা একটি ছোট আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে পার করে দেওয়ার গল্পগুলো মসলিনের অকল্পনীয় সূক্ষ্মতার ঐতিহাসিক প্রমাণ দেয়।

প্রায় ১৭০ বছর আগে ১৮শ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ম্যানচেস্টারের মিলের তৈরি সস্তা কাপড়ের আগ্রাসন, দেশীয় তাঁতিদের ওপর অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন (যেমন বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে দেওয়া) ও শাস্তিমূলক উচ্চ শুল্ক আরোপ এই শিল্পের টুঁটি চেপে ধরে।

মসলিন তৈরির একমাত্র বিশেষ কাঁচামাল— মেঘনা নদীর অববাহিকায় জন্মানো ‘ফুটি কার্পাস’ তুলা গাছটি একপর্যায়ে প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, যা এই শিল্পের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। ১৮৫০ সালে লন্ডনের মহাপ্রদর্শনীতে শেষবারের মতো আদি ঢাকাই মসলিন প্রদর্শিত হয়েছিল, এরপর এটি কেবলই ইতিহাস হয়ে যায়।

ঢাকাই মসলিন বুনন শুধু একটি সাধারণ কায়িক শ্রম ছিল না, এটি ছিল আবহাওয়ার সঙ্গে জড়িত এক জটিল লোকজ বিজ্ঞান। ফুটি কার্পাসের অতি-মিহি সুতা শুকনো বাতাসে ভেঙে যায়। তাই মসলিনের সুতা কাটার জন্য ভোরের সূর্য ওঠার আগের ও সন্ধ্যার পরের আর্দ্র আবহাওয়া বেছে নেওয়া হতো।

বিশেষ করে শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকার স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা এই সুতা কাটার জন্য প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ ছিল। তুলা মাঠ থেকে সংগ্রহ করা, আঁশ ছাড়ানো, বিশেষ বোয়ালের চোয়ালের হাড় দিয়ে তুলা পরিষ্কার করা, অতি-সূক্ষ্ম তকলি ও চরকায় সুতা কাটা, সুতা ধোয়া ও বিশেষ নকশায় তাঁতে বুনন পর্যন্ত মোট ১৬টি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ধাপ পার করে তবেই একটি আসল ঢাকাই মসলিন তৈরি হতো।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড মসলিন পুনরুদ্ধারে একটি উচ্চপর্যায়ের গবেষক দল গঠন করে। গবেষক দলটির এই দীর্ঘ যাত্রা ছিল কোনো বৈজ্ঞানিক থ্রিলার উপন্যাসের মতোই রোমাঞ্চকর।

১৭৮৮ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের লেখা বইয়ের স্কেচ ও ঐতিহাসিক সূত্র ধরে গবেষকেরা কাপাসিয়া, গাজীপুর, বাঘাবাড়ী ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে ৩৯টি বন্য তুলার জাত সংগ্রহ করেন।

লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আদি মসলিনের সুতার নমুনার সঙ্গে সংগৃহীত তুলার ডিএনএ সিকোয়েন্সিং ও জিনোম ম্যাচিং করে অবশেষে শতভাগ খাঁটি ‘ফুটি কার্পাস’ শনাক্ত ও চাষ করা হয়। মসলিন বোনার জন্য আদি ৫০টিরও বেশি বিশেষ তৈরি যন্ত্রপাতি আবার নতুন করে প্রস্তুত করতে হয়েছে।

সাধারণ সুতির কাপড়ের কাউন্ট যেখানে ৪০ থেকে ৮০ হয়, সেখানে পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিনের সুতা ৭৩১ থেকে ৭৫০ মেট্রিক কাউন্ট পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে, যা কাপড়টিকে শিশিরের মতো স্বচ্ছতা দেয়।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে, যা আন্তর্জাতিক মহলে এর একক মালিকানা ও স্বত্ব নিশ্চিত করেছে।

মসলিন এখন গবেষণাগারের বা প্রদর্শনীর বস্তু থেকে জীবন্ত বাণিজ্যিক শিল্পে রূপ লাভ করছে। প্রথম ধাপের সফলতার পর সরকার বর্তমানে ১৮.৫ কোটি টাকার (১৮৫ মিলিয়ন বিডিটি) দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সামাজিক দিক হলো- মসলিনের এই অতি-সূক্ষ্ম সুতা কাটার জন্য ৩শরও বেশি প্রান্তিক নারীকে সুনিপুণভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ স্পিনারে রূপান্তর করা হয়েছে, যারা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের মতো বড় দেশগুলোর লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলো এই পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিন ক্রয়ে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৫০০ গজ মসলিন কাপড়ের একটি বড় অর্ডারও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে নির্মিত ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’-কে কেন্দ্র করে বর্তমানে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।

সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক সেমিনারে ফুটি কার্পাসের জাত আরও উন্নত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কাঁচামালের ঘাটতি মেটাতে কাপাসিয়া, রাজশাহী ও কুমিল্লার গ্রামীণ চাষিদের সাথে চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

প্রথম দিকে একটি শাড়ির উৎপাদন খরচ ৩.৬০ লাখ টাকা হলেও ব্যাপকভিত্তিক উৎপাদনের মাধ্যমে তা ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। একটি সুনিপুণ মসলিন শাড়ি বুনতে ২ থেকে ৪ জন তাঁতির কয়েক মাস সময় লাগে।

তাই এটি মূলত বিশ্ববাজারের উচ্চবিত্তদের জন্য একটি প্রিমিয়াম লাক্সারি ফ্যাশন হিসেবে স্থান করে নেবে। বাণিজ্যিক উৎপাদনের ফলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তৈরি পোশাক খাতের বাইরে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক লাক্সারি রপ্তানি খাতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি হলেও বেসরকারি খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের পর এবং ব্যাপকভিত্তিক চাষাবাদ শুরু হলে শাড়ির বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। 

  • সর্বশেষ