কমিশন, সার্ভিস চার্জ, পেমেন্ট ফি, অর্ডার বাতিলের জরিমানা ও পাওনা টাকা পরিশোধে বিলম্ব নিয়ে রেস্তোরাঁ মালিকদের ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছে খাবার ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম ফুডপান্ডা। এর ফলে রেস্তোরাঁ, গ্রাহক ও রাইডারদের (ডেলিভারি কর্মী) মধ্যে খাবার পৌঁছানোর খরচ কীভাবে ভাগ হয়, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, নানা খাতে টাকা কেটে নেওয়ায় তাদের মুনাফার মার্জিন কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, সরাসরি রেস্তোরাঁয় খাবারের যে দাম, প্ল্যাটফর্মটিতে তার চেয়ে অনেক বেশি দাম রাখা হয়।
গতকাল চট্টগ্রাম মহানগর রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সমিতি ফুডপান্ডার মোট চার্জ সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশে বেঁধে দেওয়াসহ আরও পাঁচটি দাবি জানিয়েছে। এসব দাবি মানা না হলে বন্দরনগরীর রেস্তোরাঁগুলো সম্মিলিতভাবে ফুডপান্ডার অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি। ঢাকার রেস্তোরাঁ মালিকরাও টিবিএসকে একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
তবে ফুডপান্ডা এসব অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে এবং প্রতিটি সহযোগী রেস্তোরাঁর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই চুক্তির শর্ত নির্ধারণ করে।
ফুডপান্ডা যেভাবে আয় করে
ফুডপান্ডা তাদের অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গ্রাহক, রেস্তোরাঁ ও রাইডারদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। এর মাধ্যমে তারা অর্ডার, পেমেন্ট, লজিস্টিকস ও নতুন গ্রাহক তৈরির কাজগুলো সমন্বয় করে। প্রতিষ্ঠানটির আয়ের সম্ভাব্য উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে কমিশন, ডেলিভারি ও সার্ভিস ফি, অনবোর্ডিং চার্জ ও অর্থের বিনিময়ে প্রচারণা। প্রতিটি রেস্তোরাঁর সঙ্গে আলাদা চুক্তি এবং তারা কী ধরনের সেবা নিচ্ছে, তার ওপর এসব চার্জের পরিমাণ নির্ভর করে।
রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, সমস্যা শুধু কমিশন নিয়েই নয়। এর বাইরেও সেবার ওপর ভ্যাট, অনলাইন পেমেন্ট ফি, ওয়েটিং চার্জ, ট্যাবলেট কম্পিউটারের ভাড়া ও ইন্টারনেট খরচের মতো নানা খাতে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়া হয়। চুক্তি ভেদে এসব চার্জের হার ভিন্ন হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে নিচে একটি হিসাব তুলে ধরা হল; তপবে এটি ফুডপান্ডার সব রেস্তোরাঁর জন্য প্রযোজ্য বা যাচাইকৃত অভিন্ন চার্জের তালিকা নয়।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো রেস্তোরাঁয় ১০ হাজার টাকার খাবার বিক্রি হলে এবং কমিশনের হার আনুমানিক ৩০ শতাংশ ধরা হলে, ফুডপান্ডা কমিশন বাবদ ৩ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ফি ও সমন্বয় বাবদ আরও ২০০ টাকা কেটে রাখবে। এই ৩ হাজার ২০০ টাকা চার্জের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ধরা হলে আরও ৪৮০ টাকা কাটা যাবে। সব মিলিয়ে রেস্তোরাঁটি পাবে ৬ হাজার ৩২০ টাকা।
ব্যবসায়ী সমিতির প্রস্তাব অনুযায়ী মোট চার্জ সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হলে, একই পরিমাণ বিক্রি থেকে রেস্তোরাঁর হাতে থাকবে ৮ হাজার ৫০০ টাকা।
তবে এই টাকার কোনোটিই রেস্তোরাঁর নিট মুনাফা নয়। কারণ এই অর্থ থেকেই রেস্তোরাঁগুলোকে খাবারের উপকরণ, কর্মীদের বেতন, প্যাকেজিং, দোকান ভাড়া, ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে হয়।
খাবারের জন্য বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের
রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমুননাহার জানান, সরাসরি রেস্তোরাঁর তুলনায় ফুডপান্ডায় খাবারের দাম ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
টিবিএসকে তিনি বলেন, 'বৃহস্পতিবার আমি এক প্লেট সাদা পোলাও ও চিকেন রোস্ট অর্ডার করেছিলাম। এই দুই আইটেমের জন্য আমার খরচ পড়ে ৩৩০ টাকা। অথচ রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেলে একই খাবারের দাম সাধারণত ২২০ থেকে ২৫০ টাকা রাখা হয়।'
নাজমুননাহার জানান, পরে অর্ডারটি বাতিল করে তিনি সরাসরি রেস্তোরাঁয় গিয়ে ২২০ টাকায় একই খাবার খান।
আরেক গ্রাহক, গুলশানের বাসিন্দা রাকিবুর রহমান জানান, ফুডপান্ডার মাধ্যমে খিচুড়ি ঘর থেকে বিফ খিচুড়ি অর্ডার করতে ফি ও ভ্যাটসহ তার প্রায় ৩৫০ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ রেস্তোরাঁয় বসে খেলে এর দাম পড়ত ২৫০ টাকা।
ঢাকার মগবাজারে কাচ্চি ভাই-এর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম বলেন, প্ল্যাটফর্মটিতে খাবারের যে দাম দেখানো হয়, তার ওপর রেস্তোরাঁগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকে খুব সামান্যই। তবে ফুডপান্ডার দাবি, খাবারের দাম রেস্তোরাঁগুলোই নির্ধারণ করে; দামের ক্ষেত্রে তারা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না।
টাকা কেটে রাখা ও পরিশোধে বিলম্ব নিয়ে রেস্তোরাঁগুলোর প্রশ্ন
চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সেক্রেটারি মঞ্জুরুল হক জানান, পাওনা পরিশোধের সেটেলমেন্ট স্টেটমেন্ট অত্যন্ত জটিল হওয়ায় ঠিক কোন কোন খাতে টাকা কাটা হচ্ছে, তা বোঝা রেস্তোরাঁগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'দেশীয় ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো যখন একটি একক ও সমন্বিত কমিশন কাঠামোর আওতায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে, তখন ফুডপান্ডা কেন কমিশনের বাইরেও অতিরিক্ত চার্জ চাপাবে?'
রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, খাবার প্রস্তুত করার পর অর্ডার বাতিল হলে তাদের লোকসান গুনতে হয়, কারণ ওই খাবার হয়তো পরে আর বিক্রি করা যায় না। এছাড়া রাইডার দেরিতে পৌঁছানোর কারণে গ্রাহক অর্ডার বাতিল করলেও উল্টো রেস্তোরাঁগুলোকে জরিমানা গুনতে হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
কয়েকজন মালিকের অভিযোগ, কোনো গ্রাহক অভিযোগ জানালে তা যথাযথভাবে যাচাই না করে বা রেস্তোরাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই টাকা কেটে রাখা হয়। এছাড়া বিক্রির পাওনা টাকা বুঝে পেতে ১৩ দিন বা তারও বেশি সময় লেগে যায় বলে জানান তারা।
ব্যবসায়ী সমিতির ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—মোট চার্জ সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশে বেঁধে দেওয়া, কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে তার বিস্তারিত বিবরণী দেওয়া, রেস্তোরাঁর ত্রুটি ছাড়া অর্ডার বাতিল হলে তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া, রাইডারের বিলম্বের কারণে রেস্তোরাঁর ওপর জরিমানা বন্ধ করা, যাচাইবিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে টাকা কেটে নেওয়া থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং সাত দিনের মধ্যে বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা।
সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের জন্য বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
ফুডপান্ডার অভিন্ন চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
ফুডপান্ডা বলছে, প্রতিটি রেস্তোরাঁর ব্যবসায়িক মডেল, কাজের মান ও পরিধির ভিত্তিতেই তাদের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তারা অংশীদার রেস্তোরাঁগুলোর সঙ্গে আলাদাভাবে চুক্তি সই করে এবং কোনো তৃতীয় পক্ষ বা সমিতির মাধ্যমে শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করে না। তাদের যুক্তি, সব রেস্তোরাঁর জন্য একই হারে কমিশন নির্ধারণ করা হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার পার্থক্য ও বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব হবে না।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, প্রযোজ্য চার্জের বাইরে তারা নিজ থেকে কোনো ভ্যাট আরোপ করে না। করের হার সরকারই নির্ধারণ করে দেয়। তবে লেনদেনের ধরন ও প্রাসঙ্গিক করের নিয়ম অনুযায়ী, খাবারের দাম ও প্ল্যাটফর্মের সেবার ওপর আলাদাভাবে ভ্যাট প্রযোজ্য হতে পারে।
ফুডপান্ডা বাংলাদেশ লিমিটেডের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের প্রধান জাহেদুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠানটি রেস্তোরাঁ মালিকদের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। যৌক্তিক উদ্বেগগুলো সমাধানের জন্য তারা প্রতিটি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে।
তবে বিভিন্ন ক্যাটাগরির রেস্তোরাঁর কাছ থেকে কোন খাতে কত চার্জ নেওয়া হয় কিংবা কীভাবে সব ফি হিসাব করা হয়, তার বিস্তারিত বিবরণ বা নমুনা ইনভয়েস ফুডপান্ডা সরবরাহ করেনি।
বাতিল হওয়া অর্ডারের দায় কার?
রেস্তোরাঁগুলো বলছে, খাবার তৈরির পর অর্ডার বাতিল হয়ে গেলে সেই খাবার অনেক সময়ই আর বিক্রি করা যায় না। এছাড়া রেস্তোরাঁ থেকে খাবার সংগ্রহ এবং গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে দেরি হওয়া নিয়েও প্রায়ই বিরোধ তৈরি হয়।
ফুডপান্ডা বলছে, বাতিল হওয়া অর্ডারের বিপরীতে তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে কোনো অর্থ পায় না। রেস্তোরাঁগুলোর লোকসান কমাতে ফুডপান্ডা নিজস্ব তহবিল থেকে খাবারের খরচের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বহন করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে ওই খাবার রেস্তোরাঁয় ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এছাড়া অর্ডার বাতিলের ফলে বিপণন, লজিস্টিকস ও গ্রাহক তৈরির ব্যয়ও তাদের নিজেদেরই বহন করতে হয় বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে মূল যে বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে তা হলো—অর্ডার বাতিলের দায় কার, সেটি কীভাবে নির্ধারণ করা হয়; কোন প্রমাণের ভিত্তিতে টাকা কেটে নেওয়া হয় এবং এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর কোনো কার্যকর উপায় রেস্তোরাঁগুলোর আছে কি না।
সুস্পষ্ট নীতিমালা চায় এ খাত
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং কাদেরিয়া রেস্তোরাঁর চেয়ারম্যান ফিরোজ আলম সুমন বলেন, ফুডপান্ডার অর্ডারে রেস্তোরাঁগুলোর মুনাফার হার খুব কম সময়ই ৫-৭ শতাংশের বেশি হয়। কখনো কখনো তা কমে ১-২ শতাংশেও নেমে আসে।
ফিরোজ বলেন, ফুডি ও পাঠাও ফুডের মতো দেশীয় ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো যেখানে ১০-১৫ শতাংশ কমিশন নেয়, সেখানে ফুডপান্ডা অনেক বেশি হারে কমিশন আদায় করে।
টিবিএসকে তিনি বলেন, 'বাতিল হওয়া অর্ডারের কারণেও আমাদের লোকসান গুনতে হয়। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, খাবার বিক্রির এক সপ্তাহ পর ফুডপান্ডা আমাদের টাকা পরিশোধ করে। এতে আমাদের চলতি মূলধন আটকে থাকে।'
তিনি জানান, লাভের মার্জিন খুব সামান্য হওয়া সত্ত্বেও শুধু নিজেদের ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি ও সুনাম ধরে রাখতেই রেস্তোরাঁগুলো প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে যুক্ত থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
সুমন মনে বলেন, সব মিলিয়ে ১৫ শতাংশ চার্জ কিংবা সুনির্দিষ্ট অন্য কোনো হার নির্ধারণ করা হলে এসব বিরোধ কমে আসতে পারে। প্রতিটি রেস্তোরাঁর ওপর জোর করে একই হারে কমিশন না চাপিয়েও জবাবদিহি বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এজন্য তিনি ফি-সংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা, খাতওয়ারি সেটেলমেন্ট স্টেটমেন্ট, অর্ডার বাতিলের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রমাণ এবং পূর্বানুমানযোগ্য পেমেন্ট শিডিউল নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড