উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও নিলামে চায়ের দাম সে অনুপাতে বাড়ছে না। এর সঙ্গে পুরনো ও অনুৎপাদনশীল চা-গাছ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জটিলতা দেশের চা শিল্পের সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। এতে বাগানগুলোর মুনাফা কমছে এবং নতুন করে চা-গাছ রোপণ ও বাগান পরিচর্যায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের চা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতাশক্তি আরো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সূত্র: বণিকবার্তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের ‘টি ইন্ডাস্ট্রি ইন বাংলাদেশ: আ ভায়াবিলিটি স্টাডি’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেশের চা শিল্পের এমন চিত্র উঠে এসেছে। গত মার্চে প্রকাশিত গবেষণাটিতে উৎপাদনশীলতা, উৎপাদন ব্যয়, অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, বাজার ব্যবস্থা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের চা শিল্পের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও কাঠামোগত দুর্বলতা ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ এ খাতের টেকসই বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজিতে। ওই বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ৮০ লাখ কেজি। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হয়েছে প্রায় দেড় কোটি কেজি। একই সময়ে একরপ্রতি গড় উৎপাদন ২০২৩ সালের ৭০৯ কেজি থেকে কমে ২০২৪ সালে ৬২৯ কেজিতে নেমে আসে।
দেশের চা উৎপাদনের বড় অংশ এখনো বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে মোট উৎপাদনের প্রায় ৭২ শতাংশই এসেছে এ অঞ্চল থেকে। এর মধ্যে শুধু মৌলভীবাজারে উৎপাদন হয়েছে দেশের মোট চায়ের ৫০ শতাংশ ও হবিগঞ্জে ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে পঞ্চগড়ের অবদান ১৫ শতাংশ ও চট্টগ্রামের ১২ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরাঞ্চলেও চা উৎপাদন কমেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে উৎপাদন ২০২৩ সালের ১ কোটি ৭৯ লাখ কেজি থেকে ২০২৪ সালে কমে ১ কোটি ৪৩ লাখ কেজিতে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। বৈশ্বিক উৎপাদনে বাংলাদেশের অবদান প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত চা বাগানের সংখ্যা ছিল ১৭০। পাশাপাশি নয়টি জেলায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ নিবন্ধিত ক্ষুদ্র চাচাষী রয়েছেন। সব মিলিয়ে চা আবাদসংশ্লিষ্ট জমির পরিমাণ ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪২ একর। এ শিল্পে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান রয়েছে এক লাখের বেশি মানুষের। আর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করে প্রায় ১০ লাখ মানুষ।
উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া ও প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় চা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলো ২০২০ সাল পরবর্তী সময় থেকেই ধুঁকছিল। এজন্য দুই বছর ধরে চা নিলামে ন্যূনতম মূল্যস্তর বা ফ্লোর প্রাইস বেঁধে দেয় বাংলাদেশ চা বোর্ড। এ কারণে গত বছর চায়ের দাম বাড়তে শুরু করে। আর চলতি বছরও মূল্যবৃদ্ধির এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে চায়ের গড় নিলাম মূল্য ছিল প্রতি কেজি ১৭১ দশমিক ২৪ টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ২৪৫ দশমিক ৫০ টাকায় দাঁড়ায়। আর চলতি অর্থবছরে নিলাম পর্যায়ে চায়ের দাম আরো বেড়েছে। এর প্রভাবে খুচরা বাজারেও দাম বেড়ে এখন প্রতি কেজি ৫০০-৬৫০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে।
দেশের অন্যতম চা উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি দ্য কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড। কোম্পানিটি ফিনলে ব্র্যান্ডের নামে চা বিপণন করে। এ কোম্পানির চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় চা শিল্পের যে পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে, সেটিই বাস্তবতা। ব্রিটিশরা এ দেশে চা নিয়ে এসেছিল। দেশের চা বাগানগুলোর বেশির ভাগের বয়স শত বছরের বেশি। আগের মতো মাটির গুণাগুণ এখন আর নেই। শ্রমিক ও সার থেকে শুরু করে কোনো কিছুই এখন আর সুলভ মূল্যে মেলে না। এ কারণে মূল্যবৃদ্ধির পরও দেশের বহু বাগান এখনো লোকসানে চলছে।’
বিরাজমান পরিস্থিতিতে চা বাগানগুলোকে লাভজনক রাখতে বিকল্প কিছু ভাবা হচ্ছে বলে জানান আজম জে চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বাগানগুলোতে চায়ের পাশাপাশি বিকল্প কিছু চাষের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। চা বাগানে অনেক খালি জায়গা থাকে। সেগুলোতে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানোর সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায়ও চা শিল্পের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, সার, শ্রম, বাগান পরিচর্যা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চা উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কিন্তু নিলামে বিক্রির দাম একই অনুপাতে বাড়ছে না। এতে বাগানের আয় ও মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়, মুনাফা কমে যাওয়ায় অনেক বাগান মালিক পুরনো চা-গাছ তুলে নতুন চারা রোপণ, নিয়মিত ছাঁটাই ও জমি পরিচর্যার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাজে বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছেন। অথচ এসব কার্যক্রমের ওপরই বাগানের ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ কমে গেলে স্বল্পমেয়াদে ব্যয় সামাল দেয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
গবেষণায় চা বাগানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতাকেও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে বলা হয়, অনেক বাগানের অভ্যন্তরীণ ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়ন দুর্বল হওয়ায় ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে চা উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে শ্রমিকের মজুরি, সার, কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণ কেনার জন্য কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন হয়। এ সময় ঋণ পেতে দেরি হলে বাগানের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গবেষণার সুপারিশে চা শিল্পের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা ও মৌসুমের শুরুতেই অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাগানগুলোর আর্থিক অবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সাময়িক নমনীয়তা বিবেচনা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে, যাতে কার্যকর উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শুধু আর্থিক দুর্বলতার কারণে বাগানগুলো প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত না হয়।
চা উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনও বড় কারণ হিসেবে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ বিষয়ে বলা হয়, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাগানগুলোর উৎপাদন ও পরিচর্যার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আসায় চা-গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে সেচ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে।
পুরনো ও অনুৎপাদনশীল চা-গাছের আধিক্যও উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ উল্লেখ করে গবেষণাপত্রে বলা হয়, বাগানভেদে গাছের বয়স, মাটির গুণাগুণ, বৃষ্টিপাত, ভূমির বৈশিষ্ট্য, শ্রমিকের দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার পার্থক্যের কারণে উৎপাদনশীলতায় বড় ব্যবধান রয়েছে। সময়মতো ছাঁটাই ও নতুন চারা রোপণ না হওয়ায় এ ব্যবধান আরো বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন, নিয়মিত ছাঁটাই, পুরনো গাছের পরিবর্তে নতুন চারা রোপণ এবং জলবায়ু সহনশীল জাত ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাগান ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনশীলতার মানদণ্ড নির্ধারণ এবং মাঠ পর্যায়ে কারিগরি সহায়তা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের চা শিল্পের বাজার কাঠামোও বদলে গেছে বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, একসময় রফতানিমুখী পণ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও এখন উৎপাদনের সিংহভাগই দেশের বাজারে ব্যবহৃত হয়। গবেষণার হিসাবে, দেশে উৎপাদিত চায়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। ২০২৪ সালে ৯ কোটি ৩০৪ লাখ কেজি চা উৎপাদনের বিপরীতে রফতানি হয়েছিল মাত্র ২৪ লাখ ৫০ হাজার কেজি।
দেশীয় চাহিদা বাড়লেও রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচলিত চায়ের পাশাপাশি গ্রিন টি, অর্থোডক্স চা, জৈব চা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের চায়ের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। পণ্যের মান উন্নয়ন, আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ ও আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনের মাধ্যমে নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চা বিক্রির নিলাম ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নেরও সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণায়। নিলাম প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল করা, দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় চুক্তি ও আগাম চুক্তিভিত্তিক বিক্রির সুযোগ অনুসন্ধানের মাধ্যমে উৎপাদকদের আয় ও বাজার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা সম্ভব বলে মনে করছে গবেষক দল।
বড় বাগানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র চাচাষী ও পাতা কিনে প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে গবেষক দল। এ বিষয়ে বলা হয়, ক্ষুদ্র চাষীদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, উন্নত চাষ পদ্ধতি ও মানসম্মত পাতা উৎপাদনে সহায়তার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাতা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণে মান বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর তদারকি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নকেও শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করেছে গবেষণাটি। বাগান এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, আবাসন ও মাধ্যমিক শিক্ষা সুবিধার সীমাবদ্ধতা দূর করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি চা বাগানের জমি ব্যবহারের প্রচলিত বিধিবিধান আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে, যাতে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ, বিকল্প ফসল ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে বাগানের আয় বাড়ানো যায়।
গবেষণার সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দক্ষ শ্রমশক্তি, বিদ্যমান অবকাঠামো, অনুকূল ভূমি ও আবহাওয়া দেশের চা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ চাহিদা, নতুন রফতানি বাজার ও উচ্চমূল্যের চা উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে। তবে ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রম ব্যয়, দামের ওঠানামা ও ব্যাংক ঋণের সীমাবদ্ধতা এসব সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থায়ন, বাজার ব্যবস্থা, নীতিমালা ও শ্রমিক কল্যাণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা দল।