শিরোনাম
◈ পাহাড়ি আম-আনারসসহ কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা, চাঁদাবাজি বন্ধে গুরুত্ব সরকারের ◈ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট স্থগিত করল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ◈ ২০২৭ সালের পবিত্র রমজান রমজান ও ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ জানাল আরব আমিরাত ◈ দিল্লি পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্ত কেজরিওয়াল-মমতা, আটককে ‘অপহরণ’ বললেন তৃণমূল নেত্রী ◈ সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আহত বহু যাত্রী; বাতিল বহু ফ্লাইট ◈ আবুধাবি টেস্ট, বাংলা‌দে‌শের বিরু‌দ্ধে লড়‌ছে আফগা‌নিস্তান, এখ‌নো ১৩৫ রানে পিছিয়ে ◈ যুক্তরাষ্ট্রে পেনসিলভানিয়ায় বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলি, শিশুসহ নিহত ৯ ◈ ফেসবুকে পরিচয় কে এই রাজু, ১৭ দিনের সম্পর্কের পর কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে কী ঘটেছিল স্কুলছাত্রীর সঙ্গে ◈ চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি চুক্তি: বাংলাদেশের লাভ কতটা, ঝুঁকি কোথায়? ◈ কোনো দেশের মুখাপেক্ষী নয়, সমমর্যাদার অংশীদার হতে চায় বাংলাদেশ : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:০০ সকাল
আপডেট : ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:৪৫ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আবাসন খাতে মন্দা, বন্ধ হচ্ছে প্রকল্প ও বাতিল হচ্ছে জমির চুক্তি

ফ্ল্যাট বিক্রিতে স্থবিরতা, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার ও নতুন করের চাপে দেশের আবাসন খাতের সংকট আরো গভীর হচ্ছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারছেন না অনেক ডেভেলপার।

কোথাও কোথাও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বাতিল হচ্ছে জমির মালিক ও আবাসন প্রতিষ্ঠানের চুক্তি। এর প্রভাব পড়ছে নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন, ব্যাংকিং, আসবাব ও গৃহস্থালি পণ্যের বাজারেও।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আবাসন খাতের সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান এবং সরকারের রাজস্ব আয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজালের মতে, আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত।

স্বাভাবিক সময়ে এ খাত থেকে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি সরাসরি কর আদায় হয়।
ফ্ল্যাট নিবন্ধনে বড় পতন : নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ৪১ হাজার ৮০৪টি ফ্ল্যাট হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধিত হয়েছে। এসব ফ্ল্যাটের ঘোষিত মূল্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকায় নিবন্ধিত হয়েছে ২৯ হাজার ৯১৩টি ফ্ল্যাট।

২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ফ্ল্যাট নিবন্ধন কমেছে ১৯.৬১ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ২৫.৩৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারি-জুনের তুলনায় কমেছে ৪২.৭৩ শতাংশ। এর আগে ২০২৩ সালে দেশে এক লাখ ৪৬ হাজার ফ্ল্যাট নিবন্ধিত হয়েছিল। যার ঘোষিত মূল্য ছিল এক লাখ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে নিবন্ধিত ফ্ল্যাটের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় এক লাখ ১২ হাজারে।

Advertisement

এসব ফ্ল্যাটের ঘোষিত মূল্য ছিল ৭৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালে নিবন্ধিত ফ্ল্যাটের সংখ্যা আরো কমে এক লাখ চার হাজারে নেমে আসে। তখন এসব ফ্ল্যাটের ঘোষিত মূল্য ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা। নিবন্ধন কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আদায়েও প্রভাব পড়ছে। নিবন্ধন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফ্ল্যাট নিবন্ধন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় সম্পত্তি নিবন্ধন থেকে রাজস্ব আদায় কমেছে।

নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে ৫০-৬০ শতাংশ : আবাসন খাতের সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রীর দাম ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম বেড়েছে ১০০ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম ৫১০ থেকে ৫৮০ টাকা। প্রতি টন মাইল্ড স্টিল রডের দাম ৮৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ায় নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে রড, সিমেন্ট, ইট, বালু, পাথর, টাইলস, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, রং ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরবরাহকারী, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা এবং পরিবহন ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন।

বাতিল হচ্ছে জমির চুক্তি, থমকে নির্মাণকাজ

আবাসন খাতের মন্দায় নতুন প্রকল্পের পাইপলাইন সংকুচিত হচ্ছে। জমির মালিকদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প করার চুক্তি কমে গেছে। অর্থনৈতিকভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হওয়ায় পুরনো চুক্তিও বাতিল হচ্ছে। রিহ্যাব সূত্র বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে শুধু ঢাকাতেই জমির মালিক ও ডেভেলপারদের মধ্যে প্রায় ৪৫০টি চুক্তি বাতিল হয়েছে। ২০২৫ সালে বাতিল হয়েছিল প্রায় এক হাজার চুক্তি। এ ছাড়া ফ্ল্যাট কিনে এখনো বুঝে না পাওয়া ক্রেতাদের প্রায় দুই হাজারটি অভিযোগের নিষ্পত্তি নিয়ে কাজ করছে রিহ্যাব। জানা গেছে, রাজধানীর দক্ষিণ বারিধারায় একটি প্রতিষ্ঠানের দুটি প্রকল্পে মোট ৪৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি ২২টি ফ্ল্যাট বিক্রির চুক্তি করে। কিন্তু তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণের পর বাকি ২৬টি ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া চুক্তির টাকা বিনিয়োগ করে যতটা সম্ভব প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এখন নির্মাণকাজ সচল রাখতে ব্যাংকঋণ নেওয়ার জন্য নিজেদের অংশের সম্পত্তিও বন্ধক রাখতে হয়েছে। এদিকে ফ্ল্যাটের ক্রেতারা ভোগান্তিতে পড়েছেন।

৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে

আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, স্যানিটারি মিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রি, রং মিস্ত্রিসহ বিভিন্ন পেশার শ্রমিক। এ ছাড়া প্রকৌশলী, স্থপতি, ঠিকাদার, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারী ও পরিবহনকর্মীরাও এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। নির্মাণকাজ কমে গেলে এসব পেশার মানুষের কাজ ও আয় কমে যায়। এতে তাঁদের পরিবারের ব্যয় সংকুচিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে স্থানীয় দোকানপাট, পরিবহন ও অন্যান্য সেবামূলক ব্যবসারও চাহিদা কমতে থাকে।

রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আবাসন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। সরকার প্রতিবছর রেজিস্ট্রেশন, ভ্যাট, ট্যাক্সসহ বিভিন্ন উৎস থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে আবাসন খাত থেকে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি সরাসরি ট্যাক্স আসে। কিন্তু সংকট দীর্ঘায়িত হলে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে। অনেক শ্রমিক ও মধ্যম পর্যায়ের পেশাজীবীরা কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।’

তিনি বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর আরোপ, রড ও সিমেন্টের ওপর ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক এবং অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগে কঠোরতার কারণে আবাসন খাতের সংকট আরো বাড়তে পারে। নতুন করের কারণে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষের জন্য জটিলতা বাড়বে।’

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা

আবাসন খাতের সংকট কাটাতে শুধু ফ্ল্যাটের দাম কমানো যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা, গৃহঋণের সুদ, নির্মাণসামগ্রীর দাম, কর ও নিবন্ধন ব্যয় এবং বিনিয়োগের পরিবেশ—সবদিক বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ, জমি ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি অন্তত ১০০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন। সেখানে ২০৫০ ও ২১০০ সালের সম্ভাব্য জনসংখ্যা বিবেচনায় নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট জোনিং, সমন্বিত অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগের সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান থাকতে হবে। পাশাপাশি মেট্রো ও স্যাটেলাইট সিটিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে নগর সম্প্রসারণ করতে হবে।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ

  • সর্বশেষ