দ্য প্রিন্ট প্রতিবেদন: নারায়ণ চন্দ্র গিয়েছিলেন স্থানীয় বাজারে ইলিশ কিনতে। প্রতিটি ১ হাজার ২০০ টাকা দরে তিনি ৮০০ গ্রাম ওজনের দুটি মাছ কেনেন। এই মৌসুমে এটিই ছিল তার প্রথম ইলিশ কেনা। সেদিন সন্ধ্যায় প্রিয় এই মাছটি পাতে পড়ার দৃশ্য তিনি ততক্ষণে কল্পনা শুরু করেছেন।
কিন্তু গরম সরিষার তেলে ভাজার সময় মাছের টুকরোগুলো ভেঙে যেতে থাকে। চন্দ্র অবাক হলেন। বাংলাদেশের বিখ্যাত পদ্মার ইলিশকে তিনি কখনো এভাবে ভেঙে যেতে দেখেননি।
ঢাকা থেকে টেলিফোনে তিনি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে বলেন, 'এটা কি গুজরাটের ইলিশ নাকি পুরোনো মাছ ছিল? এর স্বাদ বাংলাদেশের ইলিশের মতো ছিল না।'
তার সন্দেহ অমূলক ছিল না। গত কয়েক মাসে ভারতের গুজরাটের নর্মদা অঞ্চল থেকে টনকে টন ইলিশ বাংলাদেশে ঢুকেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ব্যবসায়ী এসব মাছকে পদ্মার ইলিশ বলে বিক্রি করেছেন।
২৩ সেপ্টেম্বর আমদানিকারকদের দেওয়া ১০৩টি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বাতিল করে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, ২০ জুলাই থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ৫৫৩ টন ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
ঢাকার একটি মাছ বাজারের মালিক বলেন, 'বিক্রেতারা এগুলোকে পদ্মার ইলিশ বলে গুজব ছড়িয়েছিল, সে কারণেই বাংলাদেশের মানুষ গুজরাটের ইলিশ কিনছিল।'
বিক্রেতাদের এই কৌশলের ফাঁদে পড়া মানুষের মধ্যে চন্দ্রও একজন।
মাছ বাজারের ওই মালিক দ্য প্রিন্টকে বলেন, 'এগুলোর দাম কম, আবার আকারেও বড়; কিন্তু স্বাদের দিক থেকে এগুলো বাংলাদেশের ইলিশের ধারেকাছেও নেই।'
গুজরাটের ইলিশে সন্তুষ্ট নন ক্রেতারা
চাঁদপুরের বাসিন্দা আলমগীর পাটোয়ারীও কয়েকদিন আগে ইলিশ কিনতে গিয়েছিলেন। বিক্রেতা যখন তার কাছে মাছটিকে বাংলাদেশের ইলিশ বলে দাবি করেন, তখন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি পার্থক্য ধরতে পেরেছিলেন।
আলমগীর বলেন, 'গুজরাটের ইলিশ দেখতে সামুদ্রিক মাছের মতো লাগে। এতে সেই মিষ্টি স্বাদটা নেই।'
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারি অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএফএ) বলছে, আমদানি বন্ধ করে দেওয়ার পরও অবৈধ পথে গুজরাটের ইলিশ এখনো বাংলাদেশের বাজারে ঢুকছে।
বিএমএফএর সাধারণ সম্পাদক শেখ আবিদ হোসেন বলেন, 'বুধবার সুন্দরবন সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রায় ৭৫ টন মাছ আমাদের উপকূলে পৌঁছেছে।'
জুমার নামাজের পর ঢাকায় ইলিশ কিনতে গিয়ে আবিদও বাজারে গুজরাটের এই মাছ দেখতে পান। তিনি বলেন, 'সাধারণ মানুষের চোখে প্রথম দেখায় হয়তো কোনো পার্থক্য ধরা পড়বে না, কিন্তু আমরা ঠিকই পার্থক্য বুঝতে পারি।'
ঠিক কবে থেকে গুজরাটের ইলিশ বাজারে আসতে শুরু করেছে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি। তবে ঢাকার ওই মাছ বাজারের মালিক জানিয়েছেন, তিনি শহরের বেশ কয়েকটি বড় বাজারে এই মাছ দেখেছেন।
বাংলাদেশে গুজরাটের ইলিশ বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রেতারা ভাবতে থাকেন, তারা এতদিন আসলে কী কিনেছেন। চন্দ্রও বুঝতে পারলেন কেন তার কেনা মাছের স্বাদ ভিন্ন ছিল।
তিনি বলেন, 'ওই মাছ দিয়ে আমরা কখনোই ইলিশের তরকারি রাঁধতে পারতাম না।' এর বদলে তার পরিবার ইলিশের ভর্তা বানিয়েছিল।
মাছের মান নিয়ে হতাশ ছিলেন চন্দ্র। প্রায় দুই বছর আগে বাংলাদেশের ইলিশের অন্যতম কেন্দ্র চাঁদপুর থেকে কয়েক কেজি ইলিশ কেনার কথা মনে পড়ে তার।
তখন এক কেজি চাঁদপুরের ইলিশের দাম ছিল প্রায় ২ হাজার টাকা। চন্দ্র বলেন, 'ওই মাছে বাড়তি তেল লাগত না। গরম তেলে একবার ভাজলে, ইলিশ রান্নার সুবাসে পুরো এলাকা ম-ম করত।' নর্মদার ইলিশ তার পাতে সেই জাদু আনতে পারেনি।
ব্যবসায়ীদের মন জয়েও ব্যর্থ গুজরাটের ইলিশ
দেশের অভ্যন্তরে ইলিশের আহরণ কমে যাওয়ায় সস্তায় মাছ কিনে সামান্য লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা গুজরাটের দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু সবার জন্য এই বাজি কাজে লাগেনি।
ঢাকার অন্যতম বড় পাইকারি ব্যবসায়ী দাস প্রায় দুই দশক ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অন্যান্য অনেক ব্যবসায়ীর মতো তিনি গুজরাটের ইলিশ বিক্রি করেননি। মান কিছুটা খারাপ হওয়া সত্ত্বেও তিনি দেশি ইলিশই বিক্রি করে গেছেন।
দাস দ্য প্রিন্টকে বলেন, 'গুজরাটের ইলিশ ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো। প্রতি কেজিতে ২৫০ টাকা কর ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিলে দোকানদারদের কোনো লাভই থাকত না।'
ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে এত বিপুল পরিমাণ ইলিশ বাংলাদেশের বাজারে ঢুকতে এবারই প্রথম দেখেছেন তিনি। 'মাছের রাজা' হিসেবে পরিচিত ইলিশ বাঙালির খাদ্যতালিকায় বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে।
তবে বাংলাদেশের ভোক্তাদের কাছে গুজরাটের ইলিশ পদ্মার ইলিশের স্বাদ ও গন্ধের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর যেসব ব্যবসায়ী গুজরাটের দিকে ঝুঁকেছিলেন, তাদের আশা সত্ত্বেও পশ্চিম ভারতের এই মাছ বাংলাদেশে খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি।
ব্যতিক্রমী ইলিশ বাণিজ্যের ফল হয়েছে এরকম: ভারত থেকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসা ইলিশ মুখ থুবড়ে পড়েছে; আর ক্রেতাদের মনে সেই পরিচিত দেশি ইলিশের জন্যই কেবল আক্ষেপ তৈরি করেছে। অনুবাদ: টিবিএস