মনজুর এ আজিজ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আশ্বাস অনুযায়ী মঙ্গলবার দিবাগত রাত থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা। সেই অনুযায়ী মঙ্গলবার থেকেই গ্যাস সরবরাহে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। যদিও বিদ্যুৎ সংকট আগের মতোই আছে। প্রায় দুই মাস পর পূর্বের অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে এলএনজি সরবরাহ। মঙ্গলবার রাত থেকে ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে গ্যাস সরবরাহ অনেকটা বেড়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে আগের দিনে ২ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ ছিল, সেখান থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫৮২ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল)-এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্যাস সংকটের সুত্রপাত। কয়েক সপ্তাহ পরে এফএসআরইউ মেরামত হলেও শুরু হয় কার্গো সংকট। বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় এবং স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করে থাকে। বিদ্যমান দু’টি এফএসআরইউ দৈনিক সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দিতে সক্ষম।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। যে কারণে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুন দামে কিনতে হচ্ছে এলএনজি। ডিপিএম পদ্ধতিতে ৪ কার্গো এলএনজি আমদানির আদেশ দেওয়া হয়। যেগুলো কোনটাই দেশে আসেনি, যে কারণে মারাত্মক গ্যাস সংকট চলমান।
পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গ্যাস সরবরাহ পূর্বের অবস্থায় ফেরার আশা করলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সহসা ২১ জুলাইয়ে পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করার পথ বন্ধ বলা যায়। আমদানি অংশ পূর্বের অবস্থানে ফিরলেও দেশীয় উৎপাদন পূর্বের অবস্থায় ফেরার সুযোগ নেই বললেই চলে। ২১ জুলাই দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, যা এখন ১ হাজার ৬০২ মিলিয়নে নেমে এসেছে। মজুদ কমে যাওয়ায় প্রতিদিনেই কমছে উৎপাদন। তাই দিন যত গড়াচ্ছে সংকট তত বাড়ার শঙ্কা করা হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে অনেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের সঙ্গে তুলনা করেন। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলা একজন পরিচালক বলেছেন, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা এখন ১ হাজার ৬০২ মিলিয়নে ১৪ সেপ্টেম্বর নেমে গেছে। দুই বছরে দেশীয় উৎসের গ্যাস কমেছে প্রায় ৪০৮ মিলিয়ন ঘনফুট। যে কারণে আমদানি আগের সমান করলেও সংকট প্রকট মনে হচ্ছে।
এক সময়ে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদিত হলেও এখন ১৬০২ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। মজুদ কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত কমে আসছে উৎপাদন। উদ্বেগের বিষয় বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়া। ফিল্ডটি থেকে এখনও সাড়ে ৪৫ শতাংশের মতো গ্যাস যোগান আসছে। আর কনডেনসেট পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৬৮ শতাংশ। এক সময়ে ১৩৫০ মিলিয়নের মতো উৎপাদন দিতো, ১৩ সেপ্টেম্বর ৭২৫ মিলিয়নে নেমে গেছে। মজুদ কমে আসায় দ্রুতই কমে যাচ্ছে উৎপাদন।
চাহিদা যখন বাড়ন্ত তখন প্রতিদিনেই কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন। চাইলেও সহসা আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। আমদানি বাড়াতে হলে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে, যা খুবই সময় সাপেক্ষ।যে কারনে আসছে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে গ্যাস সংকট আরও প্রকট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদনে ব্যাপক ধসের শঙ্কার কারণে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী দেশে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে অনুমোদিত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক)। মতান্তরে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিবেচনা করা হয়। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। ১৩ সেপ্টেম্বর বিদ্যুতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৮৮১ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে।
বিপিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেছেন,গ্যাস সরবরাহ বাড়লে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়বে। তাতে লোডশেডিং সামাল দেওয়া সহজ হবে। আমরা আশা করছি ২০ সেপ্টেম্বর নাগাদ লোডশেডিং কমে আসবে।
গ্যাসের ঘোষিত চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বাইরে এক তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে ৩৭৯টি শিল্পের বিপরীতে প্রতিশ্রুত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যারা কোটি কোটি টাকা জামানত দিয়ে জুতার তলা ক্ষয় করছেন। অন্যদিকে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার উৎপাদনেও।৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।
বহুমূখী সংকটে জর্জরিত দেশের গ্যাস খাত, ভয়াবহ সংকটের মধ্যে দফায় দফায় দরপত্র দিয়েও মিলছে না এলএনজি সরবরাহের দরদাতা। একদিকে যখন এলএনজি সরবরাহ সংকট অন্যদিকে ভর্তুকি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) জ্বালানি খাতে ভতুর্কি বরাদ্দ রয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রথম দুই মাসেই (জুলাই-আগস্ট) ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বছরের আরও ১০ মাস নিয়ে চিন্তায় রয়েছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলা বলছে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে: পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, সোমবারের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। যদিও রাজধানীর আবাসিক লাইনের অনেক এলাকাতেই এখনও গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়নি। আবার অনেক এলাকাতে দিনের বেলা আজও চুলা জ্বলেনি। ফলে গ্যাস সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। অন্যদিকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতেও তেমন কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। মঙ্গলবার দুপুরেও প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।
কোথাও গ্যাস বেড়েছে, কোথাও সংকট আগের মতো: কিছু আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দিনের বেলা চুলা জ্বলেছে। আগের তুলনায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও চাপও বেড়েছে। তবে অনেক এলাকায় দিনের বেলায় গ্যাস না থাকায় আগের মতোই রান্নায় ভোগান্তি রয়েছে।
কলাবাগানের বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার জানান, এতদিন দিনের বেলা গ্যাসের চুলায় আগুনই ধরতো না। বিকালের পরে চুলা জ্বলতো। মঙ্গলবার দিনের বেলা চুলা জ্বলছে, তবে গ্যাসের চাপ কমই আছে।
বনশ্রীর বাসিন্দা মারিয়া ইসলাম জানান, তাদের এলাকায় আগের মতোই গ্যাসের কোনও দেখা নেই। প্রতিদিনের মতো রাতে গ্যাস আসার অপেক্ষায় আছেন। ওই সময় গ্যাস এলেই তারা পরদিনের রান্না করে রাখেন। এরপর বৈদ্যুতিক চুলায় খাবার গরম করে খান। বাড়তি কিছু রান্না করতে হলে তা ওই চুলাতেই করতে হয়।
কাকরাইলের বাসিন্দা রাব্বানী বলেন, আমাদের এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরে একেবারে গ্যাস পাওয়া যায় না। তবে গত কয়েকদিন চাপ খুবই কম ছিল। রান্না হতে অনেক সময় লাগতো। আজকে অন্যান্য দিনের তুলনায় চাপ বেড়েছে।
সিএনজি ফিলিং স্টেশনের অবস্থাও আগের মতোই রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সিএনজি মালিক সমিতির মহাসচিব ফারহান নুর বলেন, যে গ্যাস বাড়তে তা তো শিল্পেই যাওয়ার কথা। আমার কোথায় পাবো? আমাদের মতো একই। চাপ নাই। লম্বা লাইন, ভোগান্তি গ্রাহক আর আমাদের। একটা কার্গো আসায় এখন হয়তো কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ বেড়েছে কিন্তু এটা যে একই থাকবে তার নিশ্চয়তা কোথায়?
গ্যাস সরবরাহ বাড়লো কতটা: পেট্রোবাংলার হিসাবে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। সে সময় এলএনজি পাওয়া গেছে ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিকাল ৪টায় মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় খনি থেকে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি পাওয়া গেছে ৯৯১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট। রোববার একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৬২ মিলিয়ন ঘনফুটে। সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সোমবার দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৬১১ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে ৭৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট।
সেপ্টেম্বরে আসছে আরও পাঁচ এলএনজি কার্গো: পেট্রোবাংলা জানায়, সেপ্টেম্বর মাসে মোট নয়টি এলএনজি কার্গো আসার কথা। এর মধ্যে চারটি কার্গো ইতোমধ্যে এসেছে। আরও পাঁচটি কার্গো এ মাসে আসবে। সবশেষ গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর একটি কার্গো এসেছে। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর আরও একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর ফলে মঙ্গলবার থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে।
এলএনজি কার্গো আসার তারিখ অনুযায়ী, আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর গানভর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এনার্জি, ২৫ সেপ্টেম্বর আরামকো ও ২৮ সেপ্টেম্বর গানভর থেকে একটি করে মোট পাঁচটি কার্গো আসার কথা রয়েছে।
গ্যাস বাড়লেও কমেনি লোডশেডিং: গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখনও স্পষ্ট নয়। মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৯১৯ মেগাওয়াট। এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭০৫ মেগাওয়াট। এদিন দুপুর ১২টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াট। আগের দিন ১৪ সেপ্টেম্বর একই সময়ে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১৭৩ মেগাওয়াট। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং আগের তুলনায় কিছুটা কম দেখালেও বাস্তবে তা আগের মতোই আছে।
পিডিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে প্রথমেই সে গ্যাস যায় শিল্পে, এরপর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরে বাদ বাকি আর সবাই পায়। যেহেতু শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঘাটতি আগে থেকেই ছিল সেহেতু বাড়তি সরবরাহ করা গ্যাসের বেশি অংশ শিল্পে যাচ্ছে। এরপর বিদ্যুৎকেন্দ্রে।