মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠালেই নজরদারির আওতায় আসতে পারে কে টাকা পাঠালেন, কাকে পাঠালেন, কোথা থেকে পাঠালেন এবং লেনদেনের ধরন স্বাভাবিক কি না? ভুয়া সিম, প্রতারণামূলক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাব, অর্থ পাচার ও ডিজিটাল আর্থিক অপরাধ ঠেকাতে এবার লেনদেনে নজরদারির নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে যাচ্ছে সরকার।
এতে ব্যবহার করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং ও রিয়েল-টাইম লোকেশন তথ্য। পাশাপাশি সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে তৈরি হবে রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা। ভুয়া সিম ও ভুয়া এমএফএস হিসাব শনাক্ত এবং বাতিলে গড়ে তোলা হবে পৃথক কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম। এমএফএস হিসাব খোলার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে এনআইডি ও বায়োমেট্রিক যাচাই। এজেন্টদের কার্যক্রম নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে রাখতে চালু হবে ভার্চুয়াল ডিজিটাল সীমানা।
এমনকি কোনো গ্রাহকের মৃত্যুর ছয় মাস পর তার নামে নিবন্ধিত সিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং অগ্রগতি জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) গড়ে তুলবে রিয়েল-টাইম লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। এআই ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হবে প্রতারণার ধরন, অস্বাভাবিক লেনদেন এবং অর্থ পাচারের সম্ভাব্য প্রবণতা।
বাংলাদেশ ব্যাংক, এনটিএমসি ও এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে কোনো লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং লেনদেনের অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। রিয়েল-টাইম লোকেশন তথ্য সরবরাহের সুপারিশ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিকল্প হিসেবে লেনদেনের সময় সংশ্লিষ্ট অ্যাপ চালু হলে জিওলোকেশন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। এমএফএস এজেন্টদেরও ভার্চুয়াল ডিজিটাল সীমানার আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত এলাকার বাইরে এজেন্টের কার্যক্রম পরিচালিত হলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে এক এলাকার এজেন্ট আইডি ব্যবহার করে অন্য এলাকায় অবৈধ বা অননুমোদিত লেনদেন ঠেকানোর সুযোগ তৈরি হবে। এমএফএস হিসাব খোলার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্যের বাধ্যতামূলক যাচাই করা হবে। বিটিআরসির সেন্ট্রাল বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই যাচাই সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু নতুন হিসাব নয়, পুরোনো এমএফএস হিসাবও যাচাইয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। গ্রাহকের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর মিলিয়ে দেখা হবে।
ভুয়া বা অবৈধ ব্যবহারকারী শনাক্ত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক, এজেন্ট ও রিটেইলারদের শতভাগ ই-কেওয়াইসি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত তথ্য হালনাগাদের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সিম নিবন্ধনে আনা হচ্ছে আরও কঠোরতা। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ছয় মাস পর তাঁর নামে নিবন্ধিত সিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিলের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এজন্য বায়োমেট্রিক যাচাই ব্যবস্থাকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্যভান্ডারসহ অন্যান্য সরকারি ডেটাবেসের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
একটি এনআইডির বিপরীতে সব অপারেটর মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি সিম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দুটির বেশি সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে করা হবে অতিরিক্ত যাচাই। সিম নিবন্ধনের সময় আঙুলের ছাপ ও মুখমণ্ডলের ছবিও কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাইয়ের আওতায় আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এমএফএস ব্যবহার করে অপরাধ, অর্থ পাচার ও মাদক ঠেকাতে সরকার একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে এমএফএস সেবার অপব্যবহার বন্ধ হবে। উৎস: বিডি প্রতিদিন।