কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, শক্তিশালী বন্দরসেবা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কারণে নগররাষ্ট্রটি আবারো প্রথম স্থান অর্জন করেছে। আইএসসিডিআই ২০২৬-এর শীর্ষ দশের বাকি বন্দরনগরগুলো পর্যায়ক্রমে সাংহাই, লন্ডন, হংকং, দুবাই, নিংবো ঝৌশান, রটারডাম, নিউইয়র্ক, এথেন্স ও হামবুর্গ। সিনহুয়া ও বাল্টিক এক্সচেঞ্জ ২০১৪ সাল থেকে এ প্রভাবশালী ইনডেক্স প্রকাশ করছে। প্রতিবার বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বন্দরনগরী তাদের তালিকায় স্থান পায়।
তবে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং বছরে ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি শুল্কায়িত আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম বৈশ্বিক এ র্যাংকিংয়ে কখনো স্থান পায়নি। বরং প্রতি বছরই দেশের ‘সিঙ্গাপুর’ বন্দরনগর চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা, নালায় ডুবে মৃত্যু, যানজটসহ বিভিন্ন ভোগান্তির ঘটনায় সংবাদ শিরোনাম হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর, শিল্প ভিত্তি ও ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং নগর ব্যবস্থাপনার সংকট চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের সামুদ্রিক অর্থনৈতিক নগর কেন্দ্রে পরিণত হতে দিচ্ছে না।
ডিএনভি পাবলিকেশন ও মেনন ইকোনমিকসও বিশ্বের শীর্ষ বন্দরনগরীর র্যাংকিং প্রকাশ করে। এ র্যাংকিংয়ের সর্বশেষ সংস্করণে প্রথম পাঁচটি নগরী সিঙ্গাপুর, রটারডাম, লন্ডন, সাংহাই ও অসলো। ইনডেক্সে ৩০টি বন্দরনগরী স্থান পেয়েছে। এ তালিকায়ও জায়গা হয়নি চট্টগ্রামের।
অন্যদিকে ২০২৯ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে সিঙ্গাপুরের আদলে পরিচালনার উপযোগী করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ভাষ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন বে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় বিদেশী বিনিয়োগ আনার লক্ষ্যে সিঙ্গাপুরের পিএসএর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ আধুনিকায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের সব কনটেইনার টার্মিনাল চালু করা গেলে ২০২৯ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর মতো দ্রুত সেবা দেয়া সম্ভব হবে বলেও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য সিএমএ সিজিএমের মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি সিঙ্গাপুর টু চট্টগ্রাম ফিডার সার্ভিসের মাধ্যমে দুই দেশের সমুদ্রবন্দরকে সরাসরি সংযুক্ত করেছে।
এদিকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর চলতি বছরের শেষ নাগাদ একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করতে চায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দর ও শহরের উন্নয়নে সিঙ্গাপুরের দিকে নজর থাকলেও একটি নগরের ন্যূনতম নাগরিক সেবাও নিশ্চিত হয়নি চট্টগ্রামে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের উন্নয়নে অনেক আগে থেকেই মাস্টারপ্ল্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু সেসব বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকায় নগরের বিভিন্ন সমস্যা দিনে দিনে আরো প্রকট হয়েছে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা। তার বলছেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সংস্থা দক্ষভাবে নগরটি গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে চট্টগ্রামের ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সুফল চট্টগ্রামবাসী যথাযথভাবে পায়নি।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পূর্বাচল মাস্টারপ্ল্যানে ১৯৯৫ সালেই বলা ছিল যে ড্রেনের সমস্যার জন্য নতুন চারটি খাল খনন করতে হবে। তার লে-আউট ও কস্টিং দেয়া ছিল। তখন সেই কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি। কিন্তু ২০১৫ সালের পর আমরা অনেক বেশি ব্যয় করে সেটিকে করার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে খালের জায়গাগুলো দখলে হারিয়ে গেছে। আমাদের পূর্বসূরিরা এগুলো করার জন্য আগে লিখে গেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা রয়েছে।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনটি সংস্থার প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও টানা বৃষ্টিতে এখনো চট্টগ্রাম নগরী পানিতে ডুবে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক অগ্রগতির মাধ্যমে আইএসসিডিআই র্যাংকিংয়ে সাংহাই এবার লন্ডনকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে।
রটারডামের গল্প আরো বিস্ময়ের। নেদারল্যান্ডসের এ শহরের বড় অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত। অর্থাৎ চট্টগ্রামের তুলনায় তাদের প্রাকৃতিক ঝুঁকি অনেক গুণ বেশি। তবুও বিশ্বের অন্যতম সেরা বন্দরনগরী হিসেবে গড়ে উঠেছে এ শহর। বাঁধ, খাল, পাম্পিং স্টেশন, কৃত্রিম জলাধার এবং স্মার্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে রটারডাম সবসময়ই বিশ্বের সেরা ১০ বন্দর নগরীর একটি হিসেবে জায়গা করে নেয়।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। শহরটি এখনো মৌলিক নগর ব্যবস্থাপনার সংকটই কাটিয়ে উঠতে পারেনি। জলাবদ্ধতা, যানজট, খাল দখল, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত আবাসন, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়হীন উন্নয়ন প্রকল্প এ শহরের সম্ভাবনাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন নগরবাসী।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার কারণ শুধু অতিবৃষ্টি নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাল ভরাট, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা ও সংকুচিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে শহরের পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, যেখানে রাস্তার উচ্চতা বাড়ানো হলেও পাশের ড্রেন ও বসতবাড়ির উচ্চতা সমন্বয় করা হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে যায়। বিশ্বের উন্নত উপকূলীয় শহরগুলো যেখানে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, সেখানে চট্টগ্রামে বহু সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব বিভক্ত হলেও সমন্বিত কার্যক্রম ও জবাবদিহি এখনো দুর্বল।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য মো. জাফর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটি শহরের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; এর ভিত্তি হলো সুশাসন, প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা। বিশ্বের সমুদ্রপাড়ের সফল শহরগুলো নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল গড়ে তুলেছে। চট্টগ্রাম এখনো সেই কৌশলগত সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারেনি। তবে সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, ব্লু ইকোনমি, আঞ্চলিক যোগাযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং শিল্পায়নের নতুন উদ্যোগ চট্টগ্রামের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পাবে তখনই যখন নগর ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা যাবে।’
সিঙ্গাপুর আগামী পাঁচ বছরও বিশ্বের সেরা বন্দরনগরী হিসেবে অবস্থান ধরে রাখবে বলে বিভিন্ন র্যাংকিংয়ে বলা হয়েছে। শহরটি ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনার কারণেই এমন স্থায়ী অবস্থান তৈরি সম্ভব হয়েছে। বিপরীতে চট্টগ্রামে প্রায়ই প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনা ও ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। খাল পুনরুদ্ধারের প্রকল্প নেয়া হয়েছে, কিন্তু দখলমুক্ত রাখা যায়নি; ড্রেন নির্মাণ হয়েছে, কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো কার্যকারিতা হারিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের সামনে দুটি পথ খোলা। একদিকে সিঙ্গাপুর, রটারডাম, সাংহাইয়ের মতো স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক বন্দরনগরী হওয়ার সুযোগ; অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনার চক্রে আটকে থাকার ঝুঁকি। প্রকৃতি চট্টগ্রামকে আদর্শ বন্দরনগরী হয়ে ওঠার সুযোগ দিলেও পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা এখনো কাজে লাগানো যায়নি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘এটা মানতেই হবে যে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম এখনো জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সমন্বয়হীনতার মতো নানা সমস্যায় জর্জরিত। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, গ্যাস বিভাগ, ট্রাফিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে সিডিএ।
এমন একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নাগরিক সেবা সহজলভ্য হবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। বৈজ্ঞানিক ও যুগোপযোগী পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্দরনগরীকে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর বিলম্বের সুযোগ নেই। নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন করা হবে।’ সূত্র: বণিক বার্তা