দেশে প্রথমবারের মতো পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি শিল্পে বড় ধরনের নীতিগত সহায়তা দিতে যাচ্ছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ২০৩০ সাল পর্যন্ত এসব ব্যাটারি তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারেও আসবে নতুন গতি।
বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশা, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং শিল্পকারখানায় আধুনিক ব্যাটারির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তবে দেশে চাহিদা থাকলেও উচ্চমূল্য এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে লিথিয়াম ব্যাটারির ব্যবহার এখনও সীমিত। এই বাস্তবতায় সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে লিথিয়াম-আয়ন ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত শুল্ক-কর অব্যাহতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
একই সঙ্গে ২০২৮ সালের পর কিছু প্রস্তুত পণ্যে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা তুলে দিয়ে দেশীয় উৎপাদনকে আরও উৎসাহ দেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুল্ক-কর কমলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। এর ফলে বাজারে লিথিয়াম ব্যাটারির দামও কমতে পারে। এতে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ই-বাইক এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও চাপ কিছুটা কমবে।
রিকশাচালকদের মতে, বর্তমানে একটি ব্যাটারি কিনতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। কর-শুল্ক কমে দাম অর্ধেকের কাছাকাছি এলে তা তাদের জন্য বড় স্বস্তি হবে।
একজন ব্যাটারি বিক্রেতা বলেন, যারা হাইব্রিড সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে চান, তাদের জন্যও লিথিয়াম ব্যাটারি কেনা অনেক সহজ হবে।
এদিকে সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর অব্যাহতির প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় রয়েছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কের আধুনিক লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত সহায়তা কার্যকর হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং দেশের ব্যাটারি শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
লিও আইসিটি ক্যাবলস পিএলসির ম্যানেজার মো. রেজাউল হক বলেন, এসআরওতে যেসব শর্ত রাখা হয়েছে, যেমন কমিটি গঠন, সেখানে বুয়েটের প্রকৌশলী ও ভ্যাট কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি-এসব প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ। এতে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে এবং এসআরওর সুবিধা পেতে দেরি হবে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, সরকার যদি সঠিকভাবে এসআরও বাস্তবায়ন করে এবং সিপিসি কোড ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তাহলে দেশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে দেশে সবুজ জ্বালানির প্রসার ঘটবে এবং বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতেও বড় অবদান রাখা যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পেলে বাংলাদেশেও আধুনিক ব্যাটারি শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে শুল্ক-কর অব্যাহতির এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর পরিবেশবিদদের মতে, এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে শুধু অর্থনীতিই নয়, পরিবেশও উপকৃত হবে।
পরিবেশবিদ সাঈদ চৌধুরী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার বাড়াতে পারলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ, সিসা দূষণ এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও কমবে। তবে এই নীতির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কার্যকর প্রচার ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্ব যখন দ্রুত লিথিয়াম ব্যাটারিনির্ভর প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশও সেই পথে যাত্রা শুরু করেছে। শুল্ক-কর অব্যাহতির এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন শক্তিশালী হবে দেশীয় ব্যাটারি শিল্প, অন্যদিকে বাড়বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও টেকসই করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।