অপ্রচলিত বা নতুন পণ্য হিসাবে রপ্তানি বাণিজ্যে বেশ ভালোই আশা জাগিয়েছিল বাইসাইকেল। পাঁচ বছর আগে ২০২১-২২ আর্থিক বছরে পরিবেশবান্ধব এ দ্বিচক্র যান রপ্তানি করে ১৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ভবিষ্যতে আরও বাড়বে—এই আশায় এরপর বিনিয়োগ বাড়িয়েছিল দেশের সাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
কিন্তু পরের বছরেই রপ্তানিতে পতন সেই আশাকে দিয়েছিল ভেঙে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় নেমে আসে ১৪ কোটি ২২ লাখ ১৫ হাজার ডলারে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাইকেল রপ্তানি থেকে আয় আগের বছরের প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে; ৮ কোটি ২৪ লাখ ৯৬ হাজার ডলার আয় হয়।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অবশ্য কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়; ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৩৬ হাজার ডলারের বিদেশি মুদ্রা এসেছিল সাইকেল রপ্তানি থেকে। আগের আর্থিক বছরের চেয়ে বেশি এসেছিল ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ।
প্রকৌশল পণ্য খাতের এই পণ্য রপ্তানিতে এখন ফের আশার আলো দেখা দিয়েছে। এখন ইলেকট্রিক বাইসাইকেলও রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানিকারকরাও বেশ খুশি। আগামীতে রপ্তানি আরও বাড়াতে নতুন করে বিনিয়োগের ছক কষছেন তারা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, ৩০ জুন শেষ হতে চলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৪৮ হাজার ডলারের সাইকেল রপ্তানি হয়েছে।
এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৮ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই ১১ মাসে আয় হয়েছিল ১০ কোটি ৮১ লাখ ৪৪ হাজার ডলার।
সবশেষ মে মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬০ দশমিক ৫২ শতাংশ। এই মাসে সাইকেল রপ্তানি থেকে ১ কোটি ৬৪ লাখ ৯০ হাজার ডলার আয় হয়েছে। গত বছরের একই মাসে এই অঙ্ক ছিল ১ কোটি ২ লাখ ৭৩ হাজার ডলার।
বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস জুনে আগের মাস মে’র সমান আয় হলে ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে পাঁচ বছর আগের ২০২১-২২ অর্থবছরের সমান আয় হবে। আর বেশি হলে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়াবে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই খাত থেকে আয় কমেছিল ৪২ শতাংশ। তার আগের বছরে (২০২২-২৩) কমেছিল ১৫ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বাইসাইকেল রপ্তানি করে এলেও সর্বাধিক আয় এসেছিল ২০২১-২২ অর্থবছরেই। তখনকার বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২০ টাকা) হিসাবে টাকার অঙ্কে তা ছিল ২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ওই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের চেয়ে রপ্তানি আয় ২৮ শতাংশ বেড়েছিল।
তার আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল আরও বেশি ৫৮ শতাংশ; ওই অর্থবছরে ১৩ কোটি ৮ লাখ ৮৫ হাজার ডলার আয় হয়েছিল। এর আগের অর্থবছরে (২০১৯-২০) আয়ের অঙ্ক ছিল ৮ কোটি ২৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
বাড়তে থাকার পর ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে কমার জন্য রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধকে দায়ী করেছিলেন রপ্তানিকারকরা। কারণ বাংলাদেশের সাইকেল রপ্তানির মূল বাজার ইউরোপ। যুদ্ধের কারণে ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতি বেশ চাপের মুখে পড়েছিল; মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছিল; তার প্রভাব পড়েছিল সাইকেল রপ্তানিতে।
বাংলাদেশের কয়েকটি কোম্পানি এখন বাইসাইকেল রপ্তানি করে। এর মধ্যে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। বর্তমানে মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই এই শিল্পগোষ্ঠীর দখলে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রপ্তানিতে শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির মধ্যে শীর্ষ দুটিই মেঘনা গ্রুপের। সেগুলো হচ্ছে—এমঅ্যান্ডইউ সাইকেল ও হানা সিস্টেম।
এই গ্রুপের টায়ার ডিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লুৎফুল বারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেশ ভালোই চলছিল। প্রতি বছরই রপ্তানি বাড়ছিল; আমরা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছিলাম। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ সব তছনছ করে দিয়েছিল।
“রপ্তানি একেবারেই কমে গিয়েছিল। আশার কথা হচ্ছে, সেই ধাক্কা কেটে গেছে। দুই বছর ধরে ফের বাড়ছে রপ্তানি।”
আগামী দিনগুলোতে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মাঝে রপ্তানিতে ধাক্কার জন্য ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধকে দায়ী করে লুৎফুল বারী বলেন, “আমাদের সাইকেলের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপের দেশগুলো। যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় অর্থনীতি বেশ সংকটের মধ্যে পড়েছিল। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছিল; অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্য সব পণ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছিল; তার প্রভাব পড়েছিল আমাদের সাইকেল রপ্তানিতে।
“এখন সে সংকট আর নেই। মানুষ আগের মতোই সব পণ্য কিনছে। তাই সাইকেল রপ্তানিও বাড়ছে।”
এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই আশা করছেন লুৎফুল বারী।
তিনি বলেন, “আমরা প্রচুর অর্ডার পাচ্ছি। উৎপাদন বাড়িয়েছি। আশা করছি, বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে নতুন অর্থবছরে ২৫-৩০ শতাংশ বেশি রপ্তানি হবে।”
মেঘনা গ্রুপের বাইসাইকেল ও বাইসাইকেলের সরঞ্জাম তৈরির মোট কারখানার সংখ্যা ৭টি। তার মধ্যে যৌথ বিনিয়োগে রয়েছে চারটি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মেঘনা গ্রুপ ৭ কোটি ৮১ লাখ ডলারের বাইসাইকেল রপ্তানি করেছে। সেই হিসাবে মোট রপ্তানিতে তাদের হিস্যা ৬৭ শতাংশ।
এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরে মেঘনা গ্রুপের এমঅ্যান্ডইউ ৪ কোটি ডলার এবং হানা সিস্টেম ২ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের বাইসাইকেল রপ্তানি করেছে। হানা সিস্টেম নামের কারখানাটি জার্মানির একটি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে করেছে মেঘনা গ্রুপ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় পরের বছর এমঅ্যান্ডইউ সাইকেলের রপ্তানি বেড়েছে ৪২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। হানা সিস্টেমের রপ্তানি বেড়েছে ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সাইকেল রপ্তানির আলাদা তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন বিভাগের পরিচালক কামরুজ্জামান কামালও সাইকেল রপ্তানি নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন।
তিনি বলেন, “কোভিড মহামারীর মধ্যেও বেশ ভালো রপ্তানি করেছিলাম আমরা। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের টালমাটাল অবস্থায় রপ্তানি কমে গিয়েছিল। এখন আগের অবস্থা ফিরে এসেছে।”
রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের বছরে ১৫ লাখ বাইসাইকেল তৈরির সক্ষমতা আছে, যার এক-তৃতীয়াংশ ইউরোপে রপ্তানি করা হয়। বাকিটা দেশের বাজারে বিক্রি হয়।
কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রপ্তানি বাড়াতে আমরা বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়িয়েছি; পাশাপাশি নতুন বাজার খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।
“এখন আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সাইকেল রপ্তানি করছি। বেশ ভালোই সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি, আমেরিকার বাজারেও আমরা আমাদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারব।”
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন বিভাগের পরিচালক বলেন, “পাল্টা শুল্কের কারণে বাইসাইকেল রপ্তানির নতুন বাজার হিসেবে সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। আমরা গত অর্থবছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সাইকেল রপ্তানি করেছি। চলতি অর্থবছরও যাচ্ছে।
“বেশি শুল্কের কারণে অন্যান্য পণ্যের মত যুক্তরাষ্ট্রে চীনের সাইকেল রপ্তানিও কমছে। এই বাজারের খানিটাও যদি আমরা ধরতে পারি, তাহলে আমাদের রপ্তানি অনেক বাড়বে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যানবিষয়ক সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৃতীয় এবং বিশ্বে অষ্টম বাইসাইকেল রপ্তানিকারক দেশ।
বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া বাইসাইকেলের ৮০ শতাংশই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে। বাকিটা যায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে। একক দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সাইকেলের বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাজ্য ও জার্মানি।
১৯৯৯ সাল থেকে শুরু
৩০ বছর আগে ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে তাইওয়ানের কোম্পানি আলিতা বাংলাদেশ লিমিটেড স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রপ্তানি শুরু করে। পরে এই ধারায় যুক্ত হয় মেঘনা গ্রুপ। এরপর আরএফএল গ্রুপের রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজসহ আরও কয়েক কোম্পানি এখন সাইকেল রপ্তানি করে বিদেশি মুদ্রা দেশে আনছে।
১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেডে কারখানা নির্মাণ শুরু করেন তাইওয়ানের নাগরিক ইয়া চ্যাং মিন। পরের বছর তারা প্রথম বাইসাইকেল রপ্তানি করে।
ইপিবির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রথম দিকে এ খাত থেকে তেমন আয় না হলেও ২০০৮ সাল থেকে বাড়তে শুরু করে রপ্তানি।
রপ্তানিকারকরা জানান, বর্তমানে ফ্রিস্টাইল, মাউন্টেন ট্রেকিং, ফ্লোডিং, চপার, রোড রেসিং, টেন্ডমেড (দুজনে চালাতে হয়) ধরনের বাইসাইকেল রপ্তানি হচ্ছে।
এসব সাইকেল তৈরির জন্য কিছু যন্ত্রাংশ বাংলাদেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হলেও এখন বেশিরভাগ দেশেই তৈরি হচ্ছে। বিশেষত চাকা, টিউব, হুইল, প্যাডেল, হাতল, বিয়ারিং, আসন তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
১৯৯৬ সালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সরকারি বাইসাইকেল তৈরির প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেয় মেঘনা গ্রুপ। এরপর ১৯৯৯ সাল থেকে রপ্তানি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে রেড, ফেরাল ও ইনিগো- এই তিন ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ইউরোপ ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকার কঙ্গো, গ্যাবন ও আইভরি কোস্টে সাইকেল রপ্তানি করছে তারা।
১০০ থেকে শুরু করে ৫০০ ডলার মূল্যের সাইকেল রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি। গাজীপুরে অবস্থিত মেঘনা গ্রুপের বাইসাইকেল কারখানার বিভিন্ন বিভাগে ১২ হাজারের মতো কর্মী কাজ করে।
আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ বাইসাইকেল রপ্তানিকারক। বর্তমানে হবিগঞ্জ ও রংপুরে দুটি কারখানা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। রংপুরে নতুন আরেকটি কারখানা নির্মাণ করছে তারা। আগামী বছর এই কারখানায় উৎপাদন শুরু হবে। তাদের সাইকেলের দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ ডলার।
বাইসাইকেল খাতে নতুন বিনিয়োগও আসছে। দুই দশকের বেশি সময় তৈরি পোশাক রপ্তানির পর বাইসাইকেল উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে পানাম গ্রুপ। এক বছরের ব্যবধানে এই কোম্পানি শীর্ষ পাঁচ রপ্তানিকারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাইসাইকেল রপ্তানিতে তৃতীয় শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ছিল পানাম গ্রুপ।
চতুর্থ শীর্ষ রপ্তানিকারক আরএফএল গ্রুপের রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ। আর পঞ্চম শীর্ষস্থানে রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগে স্থাপিত আলিতা (বিডি) লিমিটেড।
শীর্ষ পাঁচ রপ্তানিকারক ছাড়া বাকি কোম্পানিগুলো হচ্ছে মেঘনা গ্রুপের ইউনিগ্লোরি সাইকেল কম্পোনেন্টস, মেঘনা বাংলাদেশ লিমিটেড ও করভো সাইকেল।
ইউরোপের বাজার
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যানবিষয়ক অফিস ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালে যেখানে ইউরোপের বাজারে বাইসাইকেল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল নবম, সেখানে ২০১০ সালে পঞ্চম স্থানে উঠে আসে। এখন তৃতীয় স্থানে।
ইউরোপের বাজারে রপ্তানির শীর্ষে আছে তাইওয়ান। পরের অবস্থানে আছে থাইল্যান্ড।
বাহন হিসাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাইসাইকেল এমনিতেই পছন্দ করেন অনেকে। একদিকে স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে এবং অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব—এ দুটো কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাইকেলের চাহিদা বাড়ছে।
ইউরোপের দেশগুলো একসময় বাইসাইকেল বেশি আমদানির করত চীন থেকে। কিন্তু চীন থেকে আমদানি করা বাইসাইকেলের ওপর ব্যাপকহারে শুল্ক আরোপ করে ইউরোপের দেশগুলো ১৯৯৩ সাল থেকে।
এই শুল্ক হার প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া ২০১৩ সাল থেকে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হয় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইন থেকে আমদানি করা সাইকেলের ওপর।
এর ফলে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায় বাংলাদেশের জন্য।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে প্রতিবছর ২ কোটির মতো সাইকেল বিক্রি হয়। এর মধ্যে ইউরোপ বাংলাদেশ থেকে ৮ শতাংশ সাইকেল আমদানি করেছে বলে ইউরোস্ট্যাট তথ্য দিয়েছে।
রপ্তানি আরও বাড়ার আশা
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বাইসাইকেলের নকশা (ডিজাইন) পাঠানো হয় বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোকে। তারপর সে নকশা অনুযায়ী সাইকেল বানিয়ে ইউরোপে রপ্তানি করা হয়।
ইউরোপে বর্তমানে যত সাইকেল বিক্রি হয়, তার সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে ইউরোপিয়ান সাইক্লিস্ট ফেডারেশন বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ইউরোপে প্রতি বছর ৩ কোটি সাইকেল বিক্রি হবে।
অর্থাৎ এখন যা বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে আরও এক কোটি বেশি বিক্রি হবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি আরও বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আলিতা (বিডি) লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক এ এইচ এম ফেরদৌস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাঝে খুব খারাপ ছিল। গত অর্থবছর থেকে রপ্তানি বাড়ছে। ক্রয়াদেশ আগের থেকে বেড়েছে। আশা করছি, আগামী দিনগুলোতে আমাদের সাইকেল রপ্তানি আরও বাড়বে।”
ইলেকট্রিক বাইকও রপ্তানি হচ্ছে
পানাম গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পানাম সাইকেল ইন্ডাস্ট্রিজ ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ইলেকট্রিক বাইসাইকেল রপ্তানি শুরু করে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে তাদের কারখানায় পাঁচশর মত কর্মী কাজ করছেন। বর্তমানে শুধু ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করলেও মার্কিন ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ নিয়েও কাজ শুরু করেছে কোম্পানিটি।
এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর ১ কোটি ২২ লাখ ডলারের বাইসাইকেল রপ্তানি করেছে পানাম গ্রুপ। তার আগের অর্থবছরে কোম্পানিটির রপ্তানি ছিল ৪৫ লাখ ডলারের।
হিসাব বলছে, গত অর্থবছরে পানামের বাইসাইকেল রপ্তানি বেড়েছে ১৭১ শতাংশ।
তুলনামূলক নতুন এই প্রতিষ্ঠান গত বছর থেকে ইলেকট্রিক বাইসাইকেল উৎপাদন শুরু করে। চলতি বছর তারা ডেনমার্কের একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের জন্য ইলেকট্রিক বাইসাইকেলের প্রথম চালান রপ্তানি করে। তারপর ইইউর অন্য ক্রেতাদের জন্যও ইলেকট্রিক বাইসাইকেল বানিয়েছে।
জানতে চাইলে পানাম সাইকেল ইন্ডাস্ট্রিজের মহাব্যবস্থাপক (ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস) সৈয়দ ইফতেখার আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রিক বাইসাইকেলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বে বিক্রি হওয়া মোট বাইসাইকেলের ৩০ শতাংশ ইলেকট্রিক।
“সে কারণে আমরাও ইলেকট্রিক বাইসাইকেল উৎপাদনে নজর দিয়েছি। ক্রেতাদের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি, আগামী দিনগুলোতে রপ্তানি আরও বাড়বে।”
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম