ইরান যুদ্ধের কারণে দীর্ঘদিন অচল থাকার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নেমে এসেছে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের কাছাকাছি পর্যায়ে।
বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৪৮ ডলারের নিচে নেমে যায়, যা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার আগের দিনের দামেরও নিচে। পরে কিছুটা বেড়ে তা ৭৩ দশমিক ২৩ ডলারে ওঠে।
হামলার জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়।
তবে গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হওয়ার পর থেকে তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে। ওই সমঝোতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুদ্ধ বন্ধে প্রয়োজনীয় অন্যান্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক প্রতিভা থাকেরের মতে, তেলের দাম সংঘাত-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে এলেও ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি। বাজার এখনো মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে সতর্ক নজর রাখছে। নতুন করে কোনো উত্তেজনা তৈরি হলে তেলের দাম আবারও দ্রুত বাড়তে পারে।
বাড়ছে জাহাজ চলাচল: যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার অংশ হিসেবে গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে বৈঠক করেন। এর পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রফতানির ওপর থেকে আংশিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য বলছে, ১৮ জুন থেকে এখন পর্যন্ত ২৮৪টি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে। যদিও এই সংখ্যা এখনো সংঘাত-পূর্ববর্তী সময়ের দৈনিক গড় প্রায় ১৩৮টি জাহাজ চলাচলের তুলনায় কম।
কেপলার জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে এই পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর মধ্যে অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার এবং অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে।
সোমবার কাতার ও পাকিস্তান এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করেছে।
সামুদ্রিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মারিস্কসের প্রধান নির্বাহী দিমিত্রিস মানিয়াটিস বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সীমিত সংখ্যক জাহাজ উত্তরের পথ ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীও জাহাজগুলোকে দক্ষিণের একটি নিরাপদ পথ ব্যবহার করার নির্দেশনা দিয়েছে, যা যুদ্ধের পর থেকে মাইন ও অন্যান্য ঝুঁকি থেকে তুলনামূলক নিরাপদ রয়েছে।
তবে এখনো জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত।
জ্বালানির দামে স্বস্তির আশা: মূলত ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এখন বাজারের নজর তেলের দাম কমার প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে কত দ্রুত পৌঁছায়, সেদিকে। যুক্তরাজ্যের মোটরগাড়ি সংস্থা আরএসি'র নীতি বিভাগের প্রধান সাইমন উইলিয়ামস বলেন, তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় আগামী সপ্তাহে পেট্রোলের গড় দাম প্রতি লিটারে ১৫০ পেন্সের নিচে নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে ডিজেলের দামও আবার ১৬০ পেন্সের নিচে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরএসি'র তথ্য অনুযায়ী, ২৮ মে পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে ১৫৯ দশমিক ৫৩ পেন্সে উঠেছিল। অন্যদিকে ডিজেলের দাম ১৫ এপ্রিলের সর্বোচ্চ ১৯১ দশমিক ৫৪ পেন্স থেকে কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এপ্রিল মাসে সাধারণ পেট্রোলের গড় দাম গ্যালন প্রতি ৪ ডলারে পৌঁছেছিল, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ ছিল। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৩ দশমিক ৯৩ ডলারে নেমে এসেছে। তবে এটি এখনো যুদ্ধের আগের দামের তুলনায় বেশি।
জ্বালানির দাম নিয়ে বিতর্ক: তেলের দাম কমলেও অনেক দেশে পাম্প পর্যায়ে জ্বালানির দাম দ্রুত কমছে না। এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার শেল, এক্সনমোবিলসহ বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তার অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও এসব প্রতিষ্ঠান সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে না।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তেলের দাম অনেক কমে গেছে। কিন্তু পাম্পে তার প্রতিফলন তেমন দেখা যাচ্ছে না, যতটা থাকা উচিত ছিল।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউট বলেছে, জ্বালানির খুচরা দাম সবসময় অপরিশোধিত তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি ও তাৎক্ষণিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।
একই ধরনের অভিযোগ যুক্তরাজ্যের জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও উঠেছে। তবে দেশটির প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত মাসে জানিয়েছে, এ ধরনের অনিয়মের ব্যাপক কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। সংস্থাটির মতে, ফেব্রুয়ারি ও মার্চের মধ্যে গড় মুনাফার হার মোটামুটি অপরিবর্তিত ছিল। সূত্র-বিবিসি