উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাত নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতায় দেশের মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ছে। ব্যাংকে টাকা রেখেও অনেক গ্রাহক সময়মতো আমানত তুলতে না পারা, কিছু ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণের বাড়বাড়ন্ত সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। ফলে নিশ্চিত আয় ও মূলধনের নিরাপত্তার বিবেচনায় অনেকে ঝুঁকছেন সরকারি সঞ্চয়পত্রে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ এমন একটি বিনিয়োগ খুঁজছে, যেখানে ঝুঁকি কম, আয় নিশ্চিত এবং টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে। সেই জায়গায় এখনও সবচেয়ে বেশি আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের বিভিন্ন সঞ্চয়পত্র।
বর্তমানে দেশে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে—পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এর মধ্যে পরিবার সঞ্চয়পত্র শুধু নারীদের জন্য হলেও অন্য তিনটি স্কিমে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই বিনিয়োগ করতে পারে।
কেন বাড়ছে সঞ্চয়পত্রের জনপ্রিয়তা
মূলধন হারানোর ঝুঁকি নেই
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো মূলধনের নিরাপত্তা। কারণ, এটি সরাসরি সরকারের দায়। অর্থাৎ বিনিয়োগের অর্থ ফেরত না পাওয়ার ঝুঁকি কার্যত নেই। শেয়ারবাজারের মতো দাম ওঠানামার ঝুঁকিও নেই। ফলে নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে থাকা মানুষের কাছে এটি এখনো অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
ব্যাংকের চেয়ে বেশি মুনাফা
বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকে আমানতের গড় সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে ১১ থেকে প্রায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যায়। বিশেষ করে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা মিলছে, যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি।
ব্যাংক খাতে উচ্চ সুদের প্রলোভন দিলেও অনেক সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকে। ফলে বেশি সুদের চেয়ে নিশ্চিত নিরাপত্তাকে এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।
নিয়মিত নগদ আয়ের সুবিধা
সঞ্চয়পত্রের আরেকটি বড় সুবিধা হলো নিয়মিত মুনাফা তোলার সুযোগ। পরিবার সঞ্চয়পত্রে মাসিক ভিত্তিতে এবং পেনশনার ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুনাফা পাওয়া যায়। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, গৃহিণী কিংবা নির্দিষ্ট আয়ের বাইরে থাকা পরিবারের জন্য এটি নিয়মিত নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করে।
অনেক পরিবার এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকায় সংসারের বাড়তি খরচ সামলাচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এই অতিরিক্ত আয় বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর চেষ্টা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। বাজারে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। মজুরি বৃদ্ধি সেই হারে না হওয়ায় মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের সক্ষমতাও কমছে।
এ অবস্থায় অনেকেই মনে করছেন, ব্যাংকে কম সুদে টাকা ফেলে রাখার চেয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে অন্তত মূল্যস্ফীতির একটি অংশ সামাল দেওয়া সম্ভব।
সহজ বিনিয়োগ ও কর সুবিধা
ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে এখন ব্যাংক, ডাকঘর কিংবা জেলা সঞ্চয় অফিসের মাধ্যমে সহজেই সঞ্চয়পত্র কেনা যাচ্ছে। মুনাফার টাকাও সরাসরি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। ফলে আগের তুলনায় ঝামেলা অনেক কমেছে।
এ ছাড়া উৎসে কর কেটে নেওয়ায় কর ব্যবস্থাপনাও তুলনামূলক সহজ। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এনবিআরের করছাড় সুবিধা পাওয়া নয়টি খাতের মধ্যেও সঞ্চয়পত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত।
কোন সঞ্চয়পত্রে কত বিনিয়োগ করা যায়
সরকার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ দিয়েছে। বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রে নারীরা সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারেন। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে একক নামে ৩০ লাখ এবং যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যায়।
অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য চালু পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
সর্বোচ্চ মুনাফা
পেনশনার সঞ্চয়পত্রে পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হলে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যায়। তবে এই হার প্রযোজ্য সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। এর বেশি বিনিয়োগ করলে মুনাফার হার কিছুটা কমে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ হয়।
এই সঞ্চয়পত্রের আরেকটি বড় সুবিধা হলো—ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুনাফার টাকা তোলা যায়। অর্থাৎ প্রতি তিন মাস পরপর বিনিয়োগকারীরা মুনাফা হাতে পান। ২০০৪ সালে চালু হওয়া এই স্কিম দুই দশকের বেশি সময় ধরে অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে জনপ্রিয় বিনিয়োগমাধ্যম হিসেবে পরিচিত। এই স্কিমে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা বিনিয়োগ করতে পারেন। মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগীরাও নির্দিষ্ট শর্তে এ সুবিধা পান।
কত টাকা বিনিয়োগ করা যায়
পেনশনার সঞ্চয়পত্র ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা মূল্যমানের কেনা যায়। এছাড়া এক লাখ, দুই লাখ ও পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রও রয়েছে।
তবে একজন ব্যক্তি তার প্রাপ্ত আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি) ও ভবিষ্য তহবিলের (প্রভিডেন্ট ফান্ড) অর্থ মিলিয়ে একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবেন।
কোথায় পাওয়া যায়
জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো কার্যালয়, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ডাকঘর থেকে পেনশনার সঞ্চয়পত্র কেনা ও নগদায়ন করা যায়।
কারা কিনতে পারবেন
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগী স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানেরাও এই সুবিধা পাবেন।
মেয়াদ ও আগাম ভাঙানোর নিয়ম
এই সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে মেয়াদপূর্তির আগে নগদায়ন করলে নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত মুনাফা পরিশোধিত হয়ে থাকলে তা মূল টাকা থেকে সমন্বয় করা হবে।
কর সুবিধা
পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সর্বমোট পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার ওপর কোনো উৎসে কর কাটা হয় না। তবে পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ হলে মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হবে।
নমিনি সুবিধা
এই সঞ্চয়পত্রে নমিনি নিয়োগ করা যায়। বিনিয়োগকারীর মৃত্যুর পর নমিনি তাৎক্ষণিকভাবে অথবা মেয়াদ শেষে সঞ্চয়পত্র নগদায়ন করতে পারবেন। নিরাপদ বিনিয়োগ, তুলনামূলক বেশি মুনাফা এবং নিয়মিত আয়ের সুযোগ থাকায় অবসরপ্রাপ্তদের কাছে পেনশনার সঞ্চয়পত্র এখনো সবচেয়ে আকর্ষণীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবু কেন কমছে নিট বিক্রি
নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে জনপ্রিয়তা বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণগ্রহণ ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে এসেছে। এ সময়ে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, নতুন করে যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, মেয়াদপূর্তি ও আগাম ভাঙানোর বিপরীতে সরকারকে তার চেয়ে ৫৫৫ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার কোনো অর্থ সংগ্রহ করতে পারেনি; বরং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বিনিয়োগকারীদের টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক পরিবার আগের সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাচ্ছে। ফলে নিট বিক্রি কমে যাচ্ছে।
তবে সামগ্রিকভাবে অনিশ্চয়তার অর্থনীতিতে এখনও সঞ্চয়পত্রকে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে নিরাপদ ও নিশ্চিত বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করছে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুরোপুরি ফিরতে না পারা পর্যন্ত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন