শিরোনাম
◈ ভারতের কা‌ছে হেরে নারী এশিয়া কা‌পের ফাইনা‌লে খেলার স্বপ্নভঙ্গ বাংলাদেশের ◈ দীর্ঘসময় শুক্রবার বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায় ◈ দায়িত্ব বাড়ল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর ◈ ভারতে পাচারের শিকার ৪৭ বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন ◈ শিশুর পেটে ইয়াবা, আড়ালে পাচারচক্র: মাদক কারবারিদের নতুন বাহন শিশুরা! ◈ আন্তদেশীয় ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি, ভারতের প্রস্তাব এলে পরীক্ষা করবে বাংলাদেশ ◈ ইংল্যান্ডে আশ্রয়প্রার্থী ভেবে পাকিস্তান ‌ক্রিকেট টিম হোটেলের সামনে বিক্ষোভ ◈ ব্রিকস সম্মেলনে ডলারের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা, কতটা সফল হবে জোট? ◈ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলা‌দে‌শের আপাতত জায়গা হচ্ছে না, বুঝিয়ে দিল পাকিস্তান! ◈ তারেক রহমান ভারত সফরে আগ্রহী, তবে আগে চূড়ান্ত করতে হবে এজেন্ডা: দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন

প্রকাশিত : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৮ রাত
আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শিশুর পেটে ইয়াবা, আড়ালে পাচারচক্র: মাদক কারবারিদের নতুন বাহন শিশুরা!

মাদক কারবারিদের কাছে এখন শিশুদের শরীরও হয়ে উঠছে ইয়াবা পাচারের বাহন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে শিশুদের দিয়ে ছোট ছোট চালান বহন করানো হচ্ছে। এমনকি তাদের পাকস্থলীতে ইয়াবার প্যাকেট ঢুকিয়ে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পাঠানো হচ্ছে। বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে সামান্য টাকা কিংবা পরিবারের খরচ চালানোর প্রলোভন। এতে মরণনেশা ইয়াবা পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ বাহক হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময় প্রতিবেদন

সর্বশেষ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দুই শিশুর পাকস্থলী থেকে ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে তৈলার দ্বীপ সেতু এলাকায় একটি সিএনজি অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে দুই শিশু ও তাদের সঙ্গে থাকা এক নারীকে হেফাজতে নেয় র‌্যাব। পরে ওই দুই শিশুর পাকস্থলীতে ইয়াবা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ৯ ও ১২ বছর বয়সী শিশু দুটিকে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে চট্টগ্রামে আনা হচ্ছিল। তাদের পরিবারের খরচ দেওয়ার পাশাপাশি ৮ হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। এ ঘটনায় শারমিন আক্তার নামে এক নারীকে আটক করা হয়।

র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের চান্দগাঁও ক্যাম্পের লে. কমান্ডার তাওহীদুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, তল্লাশির পর জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী শিশু দুটির পেটে ইয়াবা থাকার কথা জানান। পরদিন তাদের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক্স-রে পরীক্ষায় পাকস্থলীতে ইয়াবার প্যাকেট থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন চিকিৎসকরা। পরে মলত্যাগের মাধ্যমে ৯ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে ৬৭টি এবং ১২ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে ৬৬টি প্যাকেট বের করা হয়। এসব প্যাকেটে মোট ৬ হাজার ৬১৫টি ইয়াবা ছিল।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী জানান, এর আগেও একই দুই শিশুকে দিয়ে উখিয়া থেকে চট্টগ্রামে অন্তত তিন দফা ইয়াবার চালান পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; শিশুদের ব্যবহার করে মাদক পরিবহনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত মিলছে।

শিশুদের পাকস্থলীতে ইয়াবা থাকায় তাদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এভাবে পাকস্থলীতে মাদক বহন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্যাকেট ছিঁড়ে গেলে গুরুতর বিষক্রিয়া এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

র‌্যাব কর্মকর্তা তাওহীদুল ইসলাম বলেন, তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন, ইয়াবা পাচারকারীরা কক্সবাজারের দরিদ্র পরিবারের শিশুদের টার্গেট করছে। এ প্রক্রিয়ায় জড়িত কয়েকজন পাচারকারীর নামও পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, কোনো শিশু অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত হলে শুধু শিশুটিকে কেন্দ্র করে তদন্ত করলে হবে না। কে তাকে নিয়োগ করেছে, কীভাবে প্রভাবিত করেছে এবং কোন পরিস্থিতিতে সে ওই চক্রে জড়িয়েছে— এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও সীমান্তে নজরদারির পাশাপাশি স্কুল ও পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনাও জরুরি। এসব ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে কার্যকর না হলে মাদক কারবারিদের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা কঠিন হবে।

তবে শিশু-কিশোরদের মাদক বহনে ব্যবহারের ঘটনা শুধু কক্সবাজার বা চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২২ সালে ঢাকার গুলিস্তান এলাকা থেকে এক শিশুকে গ্রেপ্তারের পর তার পাকস্থলী থেকে ১ হাজার ২৫০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই কিশোর নিয়মিত পাকস্থলীতে ইয়াবা বহনের কথা স্বীকার করেছিল।

২০২৩ সালে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক রোহিঙ্গা নারী ও এক কিশোরসহ তিনজনের পাকস্থলী থেকে ৬ হাজার ২৭৫টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ তাদের হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে পাকস্থলী থেকে ইয়াবার প্যাকেট বের করা হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন মোল্লা আমাদের সময়কে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতেই শিশুদের মাদক বহনে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বা নারীর ক্ষেত্রে সন্দেহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু শিশুদের সঙ্গে কোনো নারী বা পরিবারের সদস্যসদৃশ কাউকে রাখলে সেটিকে স্বাভাবিক যাত্রা বলে মনে হতে পারে। তিনি বলেন, পাচারকারীরা সাধারণত এমন বাহক বেছে নেয়, যাদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহ কম হতে পারে। এ কারণেই শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসকারী শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করার তথ্য তাদের অনুসন্ধানে এসেছে। এ কারণে কক্সবাজার অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দরিদ্র পরিবারের শিশু, পথশিশু এবং পরিবারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কিশোর-কিশোরীরা সহজেই পাচারকারীদের প্রলোভনের শিকার হতে পারে। কোথাও চাকরি বা কাজ দেওয়ার কথা বলে, কোথাও পরিবারের আর্থিক সংকটের সুযোগ নিয়ে তাদের মাদক বহনে যুক্ত করা হচ্ছে।

শিশুদের সরাসরি ইয়াবার বাহক হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বড় চালান পরিবহনের সময়ও তাদের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করছে মাদকচক্র। গত ১৬ এপ্রিল নোয়াখালীতে ১৫ মাস বয়সী এক শিশুকে সঙ্গে নিয়ে ইয়াবা পাচারের সময় কক্সবাজারের দুই নারীকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, র‌্যাব ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যৌথ দল। তাদের কাছ থেকে ৩ হাজার ৭১৫টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর ওই দুই নারী জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার থেকে নোয়াখালীতে ইয়াবা পাচার করে আসছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহ এড়াতে তারা ১৫ মাস বয়সী শিশুটিকে সঙ্গে রাখতেন। প্রতি চালানে তারা ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেতেন বলেও জানান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পাচারে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। এসব বাহককে অনেক সময় ভুয়া নিবন্ধনের সিমসহ মোবাইল ফোন দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে তারা ফোনে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করে ইয়াবা হস্তান্তর করে। ফলে বহনকারী শিশু-কিশোরের সঙ্গে পাচারচক্রের অন্য সদস্যদের সরাসরি পরিচয়ও থাকে না।

ইয়াবার প্রধান প্রবেশপথগুলোর একটি কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত। সীমান্ত এলাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পৌঁছানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক অভিযানেও টেকনাফ-কক্সবাজার রুটে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে পৃথক অভিযানে ২ লাখ ৯৪ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। এসব ঘটনায় নৌকা ও পর্যটকবাহী গাড়িও পাচারে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

বড় চালানের পাশাপাশি ছোট চালান পরিবহনে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে র‌্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক দল নজরদারি শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শিশু সুরক্ষার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ইউনিসেফের বাংলাদেশবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের লাখ লাখ শিশু সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে রাস্তায় বসবাস বা কাজ করা শিশুদের বড় অংশ পরিবার ও আনুষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বাংলাদেশে এমন শিশুর সংখ্যা ৩৪ লাখের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউনিসেফের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কিশোরদের মধ্যে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঘটনা বাড়ছে। মাদক ব্যবহার ও পাচার তাদের যেমন অপরাধের শিকার করতে পারে, তেমনি অপরাধে জড়িয়েও ফেলতে পারে।

ফলে মাদক পাচারে শিশুদের ব্যবহার শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি শিশু সুরক্ষা ও মানবাধিকারেরও গুরুতর সংকেত। পাচারকারীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত, পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা না গেলে এই ভয়ংকর চক্র ভাঙা কঠিন হবে।

  • সর্বশেষ