সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি ও তথ্য দিয়ে প্রকাশ করা হারানো বিজ্ঞপ্তি দেখে তার পরিবারের সদস্যদের ফোন করত একটি প্রতারক চক্র। এরপর নিখোঁজ ব্যক্তিকে অপহরণের দাবি করে মুক্তিপণ চাইত তারা। পরিবারের সদস্যরা স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে চক্রের সদস্যরা তার কণ্ঠ নকল করে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা শোনাতেন। এভাবে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের মূল হোতা ফয়সাল আহমেদ ও তার সহযোগী আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাতে ঢাকা মহানগরীর যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিজিটাল আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) বিকেলে এসআরবি-৩-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড মিডিয়া কর্মকর্তা মো. মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গাজীপুর মহানগরীর কালিয়াকৈর থানায় করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত অভিযোগের সূত্র ধরে চক্রটির প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে। হৃদয় আনসারী নামে এক তরুণ গাজীপুর থেকে রাজধানীর মগবাজারে যাওয়ার পথে অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে তার পরিবারকে ফোন করে জানানো হয়। অজ্ঞাত একটি নম্বর থেকে ফোন করে দাবি করা হয়, হৃদয় অপহরণকারীদের জিম্মায় রয়েছেন। তাকে মুক্তি দিতে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়।
ভয় পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন বিকাশ ও নগদ নম্বরে মোট ৪০ হাজার টাকা পাঠান। তবে টাকা দেওয়ার পরও হৃদয়ের কোনো সন্ধান না পেয়ে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হন।
অভিযোগের পর বিকাশ ও নগদ নম্বরের সূত্র ধরে ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি-৩। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৮ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিকাশের একটি দোকান এবং মুক্তিপণের টাকা দাবিতে ব্যবহৃত নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, যে নম্বর থেকে মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল, সেই মোবাইল ফোনের মালিকের ফোনটি গত ৫ অক্টোবর হারিয়ে যায়।
পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রতারক চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। একপর্যায়ে যাত্রাবাড়ী থেকে চক্রের মূল হোতা মো. ফয়সাল আহমেদ এবং ডেমরা থেকে তার সহযোগী মো. আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা এ ধরনের প্রতারণা করে আসছিলেন। প্রথমে ফেসবুকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ও তথ্য দিয়ে প্রকাশ করা হারানো বিজ্ঞপ্তি খুঁজতেন। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের ফোন করে অপহরণের কথা জানিয়ে মুক্তিপণ দাবি করতেন। টাকা আদায় করা হতো বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে।
তবে বাস্তবে কাউকে জিম্মি করে রাখা হতো না। পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজ স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে চক্রের সদস্য আল-আমিন তার কণ্ঠ নকল করে কথা বলতেন। এ সময় তাকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে বলে পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস করানো হতো। এভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের কথা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তারা।
এসআরবি-৩ জানায়, প্রতারকদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) হিসাবের লেনদেন পর্যালোচনা করেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও সতর্ক করে বলা হয়, মোবাইল ফোন হারিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট সিম বন্ধ না করলে প্রতারক চক্র সেটি ব্যবহার করে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব খুলে অপরাধে জড়াতে পারে। এতে ফোনের প্রকৃত মালিক সরাসরি জড়িত না থাকলেও ওই সিম ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এসআরবি-৩।
সূত্র : ইত্তেফাক