এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : সুন্দরবনের উপকূলেবনের গভীরতা পেরিয়ে আবারও লোকালয়ের জনপদে বাঘের উপস্থিতি! বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের সুন্দরবনসংলগ্ন সোনাতলা গ্রামে বাঘের বিচরণ ঘিরে দেখা দিয়েছে নতুন করে আতঙ্ক। বাড়ির আঙিনা, বাগান, ধানক্ষেত ও নদীর চরে মিলেছে বাঘের অসংখ্য পায়ের ছাপ। স্থানীয়দের দাবি, গত শনিবার রাতে এক ব্যক্তি বাঘটি দেখতে পাওয়ার পর থেকে এলাকাজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন রোববার সকালে বিভিন্ন স্থানে পায়ের ছাপ দেখতে পেয়ে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
বাঘটি এখনো লোকালয়ে লুকিয়ে আছে, নাকি ইতোমধ্যে সুন্দরবনে ফিরে গেছে—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে বাঘের অবস্থান শনাক্ত করতে ড্রোন উড়িয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে বন বিভাগ। বনরক্ষী, ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (ভিটিআরটি) ও কমিউনিটি প্যাট্রল গ্রুপের (সিপিজি) সদস্যরা এলাকায় সতর্ক পাহারায় রয়েছেন।
পাঁচ গ্রামের মানুষের চোখেমুখে বাঘ আতঙ্ক
সাউথখালী ইউনিয়নের পূর্ব সোনাতলা, পশ্চিম সোনাতলা, পানিরঘাট, মডেল বাজার ও বকুলতলাসহ সুন্দরবনসংলগ্ন পাঁচ গ্রামের মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। বাঘের ভয়ে অনেকে রাতে ঘর থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছেন না। দিনের বেলায়ও ধানক্ষেত, বাগান ও ফসলের জমিতে কাজ করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা।
বনসংলগ্ন এসব গ্রামের মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন মাঠে-ঘাটে যেতে হয় তাঁদের। কিন্তু লোকালয়ে বাঘের উপস্থিতির খবর তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
টর্চলাইটের আলোয় বাঘ দেখার দাবি
সোমবার বিকেলে সিপিজি সদস্য মো. খলিল জমাদ্দার জানান, শনিবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে পশ্চিম সোনাতলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রব হাওলাদার বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় টর্চলাইটের আলোয় তিনি একটি বাঘ দেখতে পান বলে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, আলো পড়ার পর বাঘটি দ্রুত ধানক্ষেতের দিকে চলে যায়।
পরদিন রোববার সকালে সরোয়ার হাওলাদার নামে এক কৃষক ধানক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ করতে গিয়ে বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পান। আতঙ্কিত হয়ে তিনি কাজ না করেই বাড়ি ফিরে যান। পরে বিষয়টি গ্রামবাসী, ভিটিআরটি ও সিপিজি সদস্যদের জানানো হয়।
খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ধানক্ষেত, বাড়ির আঙিনা ও নদীর চরে বাঘের অসংখ্য পায়ের ছাপ দেখতে পান। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম সোনাতলার আবু রাজ্জাক আকনের বাড়িসংলগ্ন ভোলা নদী পার হয়ে বাঘটি লোকালয়ে প্রবেশ করে থাকতে পারে। এরপর পানিরঘাট, মডেল বাজার ও পূর্ব সোনাতলা এলাকার প্রায় আড়াই থেকে তিন কিলোমিটারজুড়ে বিভিন্ন স্থানে পায়ের ছাপ পাওয়া যায়।
পায়ের ছাপের অবস্থান দেখে স্থানীয়দের ধারণা, বাঘটি ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করেছে। বিষয়টি পরে বন বিভাগকে জানানো হয়।
বাড়ির আঙিনা ও গোয়ালঘরের আশপাশেও পায়ের ছাপ
পশ্চিম সোনাতলা গ্রামের বাসিন্দা মো. রতন খান জানান, রাতের বেলায় গ্রামের শাহ আলম হাওলাদারের বাড়ির গোয়ালঘরের চারপাশে বাঘের বিচরণের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পানিরঘাট এলাকার আসাদুল হাওলাদারের বাড়ির রান্নাঘরের পেছনেও বাঘের পায়ের ছাপ দেখা গেছে বলে তিনি জানান।
এসব ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বাঘটি হয়তো এখনো লোকালয়ের কোনো স্থানে অবস্থান করছে। তবে বাঘের সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও বাঘের উপস্থিতি
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর সকালে একই গ্রামে ভোলা নদী সাঁতরে একটি বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করেছিল। এর কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও বাঘের উপস্থিতির খবরে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসীর ধারণা, খাবারের সন্ধানে বাঘটি বারবার লোকালয়ের দিকে চলে আসতে পারে। তবে একই বাঘ বারবার গ্রামে প্রবেশ করছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঘের আবাসস্থল। বনের আশপাশের জনপদে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এমন মুখোমুখি অবস্থান স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা এবং বাঘ সংরক্ষণ—উভয় ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
ড্রোনে তল্লাশি, ১০ কিলোমিটার এলাকায় সতর্কতা
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, এলাকায় ধানক্ষেতে বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। ছাপের ধরন ও অবস্থান দেখে বাঘটি বিভিন্ন স্থানে চলাচল করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বাঘের অবস্থান নিশ্চিত করতে বনরক্ষী, ভিটিআরটি ও সিপিজি সদস্যরা কাজ করছেন। ড্রোন উড়িয়ে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। বনসংলগ্ন প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিশেষ সতর্কতা জারি রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের রাতে একা চলাচল না করা, শিশুদের নিরাপদে রাখা এবং গবাদিপশুর সুরক্ষায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাঘটি লোকালয়ে আছে, নাকি বনে ফিরে গেছে, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সতর্কতা ও সমন্বিত উদ্যোগ
সুন্দরবনসংলগ্ন মানুষের কাছে বাঘের উপস্থিতি নতুন নয়। তবে লোকালয়ে বাঘের বিচরণ মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে বাঘের কাছে যাওয়া, তাড়া করা কিংবা নিজ উদ্যোগে ধরার চেষ্টা করা বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, বাঘের উপস্থিতি দেখা গেলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দ্রুত বন বিভাগকে জানানো জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও গ্রামবাসীর সমন্বিত উদ্যোগে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শরণখোলার পাঁচ গ্রামের মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত বাঘটির অবস্থান শনাক্ত হোক, লোকালয়ের মানুষ নিরাপদ থাকুক এবং বন্যপ্রাণীটিরও কোনো ক্ষতি না হোক।
বন ও মানুষের সহাবস্থান রক্ষা করে নিরাপদ জনপদ নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট সবার সামনে বড় দায়িত্ব।