এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন উপকূলে পশুর নদের পাড়ে গড়ে ওঠা বানিয়াশান্তা যৌনপল্লির বাসিন্দাদের জীবনে এখন অনিশ্চয়তার ছায়া। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, জীবিকার সংকট ও সামাজিক বঞ্চনা—সব মিলিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন লড়াইয়ে দিন কাটছে তাঁদের। খুলনার দাকোপ উপজেলার বাজুয়া ইউনিয়নের এই জনপদে বসবাসকারী প্রায় ৪২০ মানুষের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—নদী যদি কেড়ে নেয় শেষ আশ্রয়টুকুও, তাহলে তাঁরা কোথায় যাবেন?
স্থানীয় সূত্রের হিসাবে, এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে নারী প্রায় ১২০ জন। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বসবাস করা মানুষগুলোর অনেকেই চান নিরাপদ আশ্রয়, বিকল্প জীবিকা ও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ। বিশেষ করে যৌন পেশা ছেড়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখেন অনেক নারী। কিন্তু আর্থিক অনটন, প্রশিক্ষণের অভাব, বিকল্প কর্মসংস্থানের সংকট এবং সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের সেই পথকে কঠিন করে তুলেছে।
এরই মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে পশুর নদের ভাঙন। নদীর পাড়ঘেঁষা বসতিগুলো ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকায় আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের। তাঁদের দাবি, দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
অতীতের ক্ষত পেরিয়ে নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষা
বানিয়াশান্তার অনেক নারীর জীবনেই রয়েছে প্রতারণা, অসহায়ত্ব ও ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের গল্প। কেউ সম্পর্কের সূত্রে প্রতারিত হয়েছেন, কেউ ভালো চাকরি কিংবা উন্নত জীবনের আশায় এসে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। কারও জীবনে আপনজনের বিশ্বাসঘাতকতা তাঁকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চিত পথে।
তবু অতীত পেছনে ফেলে নতুনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে ফেলেননি তাঁরা। কেউ ছোট একটি দোকান দিতে চান, কেউ সেলাই বা অন্য কোনো কারিগরি কাজ শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। আবার অনেকের স্বপ্ন সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
কিন্তু নতুন করে জীবন শুরু করতে প্রয়োজন পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সহযোগিতা। এসব সুযোগের অভাবে পেশা পরিবর্তনের ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবে এগোনো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের মতে, প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে অনেক নারী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবেন।
দুবেলা খাবার জোগাড় করাই দায়
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আগের তুলনায় ক্রেতা কমে যাওয়ায় অনেকের আয় কমেছে। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। অভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা।
এ অবস্থায় নদীভাঙন তাঁদের কাছে শুধু বসতভিটা হারানোর ভয় নয়; জীবিকার শেষ অবলম্বন হারানোর আশঙ্কাও। ঘরবাড়ি বিলীন হলে কোথায় যাবেন, কীভাবে সন্তানদের নিয়ে বাঁচবেন—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকে।
নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব তাঁদের সংকটকে আরও গভীর করেছে। নদীর পাড়ে বসবাস করায় প্রতিনিয়ত ভাঙনের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাই স্থায়ী বাঁধের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থাও জরুরি বলে মনে করছেন বাসিন্দারা।
তিন দশকেও স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষা
বানিয়াশান্তায় প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাস করা এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, এত বছরেও নদীভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে তাঁদের শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করতে হবে।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ প্রবীণদের দুশ্চিন্তাও কম নয়। জীবনের ৬০ বছরের বেশি সময় স্বামীর সঙ্গে এই এলাকায় কাটিয়েছেন এমন এক নারী জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর এখন আমড়া ও শসা বিক্রি করে কোনোমতে দিন চালান তিনি।
দীর্ঘদিনের বসবাসের কারণে এই জায়গার সঙ্গে তাঁর জীবিকা ও স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। নদী যদি শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নেয়, তাহলে জীবনের শেষ বয়সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন—সেই চিন্তাই তাঁকে তাড়া করে।
বাঁধ, পুনর্বাসন ও সুপেয় পানির দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা মো. খাইরুল হোসেন অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসন এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থাও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
বাসিন্দাদের মতে, শুধু নদীভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা করলেই তাঁদের সব সমস্যার সমাধান হবে না। পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের শিক্ষার সুযোগ, নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিকল্প কর্মসংস্থান। বিশেষ করে যৌন পেশা ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে আগ্রহী নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও সম্মানজনক কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, সামাজিক বঞ্চনা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর না হলে বিকল্প জীবিকা গড়ে তোলার উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, বানিয়াশান্তা যৌনপল্লির বাসিন্দাদের বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং তাঁদের নিয়ে কাজ চলছে। পশুর নদের ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে বাসিন্দাদের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি আশ্বাসের বাস্তবায়ন। নদীভাঙনের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর উদ্যোগ, নিরাপদ পুনর্বাসন এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, তার ওপর নির্ভর করছে তাঁদের ভবিষ্যৎ।
শেষ আশ্রয়টুকু বাঁচানোর লড়াই
বানিয়াশান্তার সংকট কেবল নদীভাঙনের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা, অনিশ্চিত জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রশ্ন। এখানকার অনেক নারী অতীতের পরিচয় পেছনে ফেলে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চান। তাঁদের সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা।
পশুর নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে তাঁদের দাবি তাই শুধু একটি বাঁধের নয়—নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার, সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ এবং নতুন করে জীবন গড়ার সম্ভাবনার। এখন দেখার বিষয়, তাঁদের এই আকুতি কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নেয়।