অনুজ দেব বাপু, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটের অজুহাতে বিভিন্ন রুটের গণপরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ফলে চরম দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। নির্ধারিত ভাড়ার বেশি দিতে অস্বীকৃতি জানালে যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও সহকারীদের প্রতিদিন বিভিন্ন রুটে বাকবিতন্ডা এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে নগরের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ লাইন। গ্যাস না পেয়ে অনেক সিএনজি অটোরিকশা ও হিউম্যান হলার সড়কে চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চালকরা।
যাত্রীদের অভিযোগ, গাড়িতে উঠানামা এখন ৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন দিনে-দুপুরে আমাদের পকেট কাটা হচ্ছে। বহদ্দারহাট থেকে নিউ মার্কেট ১০ টাকার ভাড়ার পথকে ৩ ভাগে ভাগ করে ৩০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। চকবাজার থেকে বারেক বিল্ডিং রুটের হিউম্যান হলারে ১২ টাকার ভাড়া ১৫ থেকে ২০ টাকা এবং মুরাদপুর থেকে প্রবর্তক মোড়ের ৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের দাবি ও বিরোধের জেরে নিউমার্কেট-ফতেহাবাদসহ (৩ নম্বর রুট) বিভিন্ন রুটে মিনিবাস ও পরিবহন চলাচল বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে। বিআরটিএ নির্ধারিত চার্ট অনুযায়ী ভাড়া কার্যকরের পাশাপাশি সিএনজিচালিত যানবাহনের সুনির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা ও নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ যাত্রী ও ভোক্তা অধিকার কর্মীরা।
এদিকে বিভাগীয় শহরে প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব চললেও দেখার কেউ নেই বলে দাবি করেছেন যাত্রীরা। বাড়তি ভাড়া ও যাত্রী হয়রানি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনেকে। সাইফুল ইসলাম নামের একজন লিখেছেন, এই গাড়িগুলোর মালিকদের মধ্যে প্রশাসনের লোক বেশি, সেজন্য ড্রাইভাররা এরকম করতে পারে। এগুলোর প্রতিবাদ পুলিশ করে না, কারণ গাড়িগুলোর মালিকের মধ্যে পুলিশও আছেন। আবদুল মোমেন লিখেন, আন্দরকিল্লা থেকে আমতলের ভাড়া ১০ টাকা নিচ্ছে। কেফায়ত উল্লাহ নামের এক যাত্রী লিখেন, সিএনজি টেক্সির ভাড়া অনেক বেশি। আগে ১২০ টাকার ভাড়া এখন ২০০ টাকা। প্রশাসন এসব দিকে নজর দেওয়ার খুবই দরকার। ওয়াজিহা আক্তার লিখেন, জামাল খান থেকে আসকার দিঘী আমার থেকে ১০ টাকা নিয়েছে। দিলিপ চৌধুরী লিখেন, ৩ নং গাড়ি উঠানামা পাঁচ টাকার বদলে এখন সাত টাকা নিচ্ছে। নজরুল ইসলাম লিখেন, চট্টগ্রামে বিআরটিএ, জেলা পরিষদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সিটি করপোরেশন ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে এইসব বাস, মিনিবাস, টেম্পুর অতিরিক্ত ভাড়ার বিপক্ষে অভিযান চাই।
যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য, গণপরিবহন ব্যয় বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো দ্বিগুণ বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ আদায় সাধারণ যাত্রীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, নিম্ন আয়ের মানুষ ও নিয়মিত গণপরিবহন ব্যবহারকারীরা এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়ছে। এছাড়া নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে মাঝপথে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি যাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনাও ঘটছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেও কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে বহদ্দারহাট আমতলগামী টেম্পো ও লেগুনাগুলো দুপুর পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে চলাচল বন্ধ রাখে বলে অভিযোগ করেন যাত্রীরা। এর ফলে এ রুটে যাতায়তে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। সরকার যেখানে কোনো ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়নি, সেখানে পরিবহন শ্রমিকরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে, রাস্তায় দুর্ভোগ সৃষ্টি করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় কীভাবে- এ প্রশ্ন তোলেন যাত্রীরা। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই, প্রশাসন এসব দেখেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগও করেন তারা। প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করে চলাচল করেন। ভাড়া বৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে বলে দাবি জানান যাত্রীরা।
এদিকে গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা, ভাড়া নৈরাজ্য ও হয়রানির প্রতিবাদে এরমেধ্যেই নগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন যাত্রীরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম নগর ও বিভাগ এবং যুব ক্যাব চট্টগ্রামের উদ্যোগে বাস, মিনিবাস, টেম্পু ও হিউম্যান হলারসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধ এবং যাত্রী হয়রানি রোধের দাবিতে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট চত্বরে প্রতিবাদী র্যালি ও অবস্থান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয় গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর)।
ক্যাব কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আমাদেরসময়ডটকমকে বলেন, জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংকটের অজুহাতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ নৈরাজ্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নির্ধারিত ভাড়া দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ গ্রহণ এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বা পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয় থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভাড়া পুননির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু ভাড়া নির্ধারণের পর গণপরিবহন মালিক বা শ্রমিকদের ইচ্ছামতো যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। চট্টগ্রামের গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি বিআরটিসির বাস নামানোও প্রয়োজন বলে মনে করি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমনিতেই নগরীতে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। বাস-মিনিবাসের মধ্যে বেশিরভাগই লক্কর-ঝক্কর, ফিটনেস-পারমিটবিহীন। সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির ৭২টি বাস থাকলেও বেশিরভাগ বাস চলছে লাভজনক রুটে চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। কল-কারখানায় শ্রমিক আনা-নেওয়াসহ রিজার্ভ ভাড়ার কাজে ব্যবহৃত হয় বেশ কিছু পরিবহন। গণপরিবহনের স্বল্পতায় সকালে অফিসগামী এবং অফিস শেষে গন্তব্যে ফেরার সময় যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে যাতায়াত। গত কিছুদিন ধরে গ্যাস সংকটের কারণে গণপরিবহনের স্বল্পতায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে বাস-মিনিবাস চলাচলের জন্য রুট নির্ধারণ করা আছে ১৭টি। বাস-মিনিবাসের রুট পারমিট আছে ২ হাজার ৯০০টি। তার মধ্যে ফিটনেসবিহীন বাসের সংখ্যা ৮০৩টি। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি।
এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্র জানিয়েছে, যাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন রুটে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত এই ধরনের ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে শুধু অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নয়, গাড়ির ফিটনেস, রুট পারমিট, চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও যাচাই করা হচ্ছে।
বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো-২ ও জেলা সার্কেল কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা মুস্তফা জানান, গ্যাস সংকটের অজুহাতে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া যাবে না। মালিকপক্ষ ও চালকেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিষযটির সমাধান করতে পারেন। কিন্তু এর চাপ কোনোভাবেই যাত্রীদের ওপর দেওয়া যাবে না। সরকারি পর্যায় থেকেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও জানান, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে বিআরটিএর অভিযান অব্যাহত থাকবে। পরিবহন মালিক ও চালকদের নির্ধারিত ভাড়া, ফিটনেস ও রুট পারমিটসহ সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে।