হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: একটি ঘর। কারও কাছে চার দেয়াল, আর কারো কাছে মাথার ওপর একটি ছাদ। আবার কারও কাছে সংসার গুছিয়ে নেওয়ার স্বাভাবিক জায়গা। কিন্তু ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর গ্রামের সোহেলের কাছে একটি ঘর মানে এর চেয়েও অনেক বেশি—নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা, সন্তানদের ভবিষ্যতের ঠিকানা এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির একটি স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটুকুও এখনো পূরণ হয়নি সোহেলের।
নিজের নামে নেই এক শতাংশ জমি। নেই বসতভিটা কিংবা স্থায়ী কোনো ঘর। অন্যের গরু রাখার জন্য তৈরি ছোট্ট একটি গোয়ালঘরসদৃশ কক্ষেই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। যে ঘরে মানুষের বসবাসের কথা নয়, সেই ঘরটিই এখন চার সদস্যের পরিবারের রাত কাটানোর আশ্রয়।
শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আটঘর গ্রামে সোহেলের সেই ঘরে গিয়ে দেখা যায়, অল্প জায়গার মধ্যেই গাদাগাদি করে রাখা সংসারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। ঘরের একটি অংশে কোনো রকমে পরিবারের সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা। চারপাশের পরিবেশে নেই স্বাভাবিক বসবাসের সুযোগ-সুবিধা। তবুও অভাবের কাছে হার মেনে এই ঘরেই দিন-রাত কাটছে তাঁদের।
সোহেলের নিজের শরীরও ভালো নয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসারে নেই স্থায়ী কোনো আয়। পরিবারের আরেকটি বড় সংকট তাঁর স্ত্রীকে ঘিরে। দুই কিডনি নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ তিনি। একসময় ভিক্ষা করে সংসারে সামান্য সহযোগিতা করতেন। কিন্তু অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় এখন সেটিও আর সম্ভব হয় না।
ফলে একদিকে চিকিৎসার প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রতিদিনের খাবারের ব্যবস্থা—দুইয়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত টানাপোড়েন চলছে পরিবারটিতে। আয় নেই, চিকিৎসার সামর্থ্য নেই; আবার অসুস্থতার কারণে কাজ করাও সম্ভব নয়। এমন বাস্তবতায় কখনো খাবার জোটে, কখনো অভাবের কারণে চুলা জ্বলে না।
অভাব শুধু সোহেল ও তাঁর স্ত্রীর জীবনকেই থামিয়ে দেয়নি, এর ছাপ পড়েছে সন্তানদের জীবনেও।
১৩ বছর বয়সী বড় ছেলের হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা। কাঁধে স্কুলব্যাগ নিয়ে তার বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা আর খেলাধুলায় কাটার কথা ছিল। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে সেই বয়সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
পড়াশোনা ছেড়ে এখন একটি দোকানে কাজ করে সে। বয়স কম হলেও পরিবারের প্রয়োজনের কথা ভেবে উপার্জনের চেষ্টা করছে। যে বয়সে তার স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই তাকে পরিবারের অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে সাত বছরের ছোট ছেলে এখনো প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। বড় ভাইয়ের মতো তাকেও যেন অভাবের কারণে পড়াশোনা ছাড়তে না হয়—এটাই পরিবারের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। ছোট্ট শিশুটি বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, বই-খাতা নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতিতে তার পড়াশোনা কতদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, সেটিও এক ধরনের অনিশ্চয়তা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি রাজিয়া বেগম বলেন, পরিবারটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সোহেলের নিজের কোনো জায়গা-জমি নেই। পরিবারটির জন্য সবার আগে একটি স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা দরকার।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে পরিবারটি অন্তত মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ জায়গা পাবে। পাশাপাশি অসুস্থ সোহেল ও তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল মাতুব্বর বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা পরিবারটির এমন দুরবস্থা দেখে আসছেন। অসুস্থতার কারণে সোহেল কাজ করতে পারেন না। তাঁর স্ত্রীও গুরুতর অসুস্থ। ফলে সংসার চালানো তাঁদের জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, শুধু একটি ঘর নয়, পরিবারটির স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য আয়ের একটি ব্যবস্থাও দরকার। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এবং প্রশাসন পাশে দাঁড়ালে পরিবারটি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
সোহেলের পরিবারের মানবেতর জীবনযাপনের খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেলে তাঁদের বাড়িতে ছুটে যান সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন।
তিনি সরেজমিনে গিয়ে সোহেলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। ঘরের ভেতরের পরিবেশ দেখেন এবং তাঁদের জীবনযাপনের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে জানতে পারেন।
পরিবারটির অবস্থা দেখে ইউএনও দবির উদ্দিন বলেন, সোহেলের পরিবারের অবস্থা অত্যন্ত মানবেতর। তাঁদের মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই। একই সঙ্গে পরিবারের আয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
তিনি জানান, সালথা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সোহেলের পরিবারের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ঘর তৈরির কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।
ইউএনওর এই উদ্যোগে নতুন আশার আলো দেখছে পরিবারটি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে যে পরিবারটির কাছে একটি ঘর ছিল অধরা স্বপ্ন, প্রশাসনের উদ্যোগে সেটিই এখন বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সোহেলের পরিবারের গল্পটি কেবল একটি অসহায় পরিবারের গল্প নয়। এটি গ্রামবাংলার এমন বহু পরিবারের প্রতিচ্ছবি, যাদের কাছে নিরাপদ একটি ঘর, চিকিৎসার সুযোগ কিংবা নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা এখনো বিলাসিতা। একটি ছোট ঘর আর একটি ছোট দোকান হয়তো তাদের জীবনকে রাতারাতি বদলে দেবে না। কিন্তু সেটিই হতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম সিঁড়ি।
গোয়ালঘরসদৃশ ছোট্ট ঘরটির অন্ধকারে তাই এখন অপেক্ষা—কবে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত ঘর, কবে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাবে পরিবারটি, আর কবে সাত বছরের শিশুটির ভবিষ্যৎ দারিদ্র্যের কাছে হার না মেনে নিজের মতো করে এগিয়ে যাবে।