ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গোকুলনগর গ্রামে বাড়ির পাশের জায়গাটা বর্ষায় ডোবার মতো হয়ে গিয়েছিল। সেই কাদার ভেতর বাঁধা ছিল চারটি মহিষ। শরীরের নিচের অংশ ডোবানো, পা তোলার উপায় নেই। পথ দিয়ে কেউ গেলে প্রাণীগুলো মুখ তুলে তাকিয়ে থাকত। সেই তাকানোর ভেতর কী ছিল, ভাষায় লেখা যায় না। গ্রামের মানুষ দৃশ্যটা দেখছিলেন বহুদিন ধরে। কেউ কেউ মালিককে বলেছিলেন, মহিষগুলোকে শুকনা জায়গায় সরিয়ে নিন। কিন্তু কিছু বদলায়নি। রোজ চোখের সামনে থাকতে থাকতে অস্বাভাবিক জিনিসও এক সময় স্বাভাবিক হয়ে যায়। প্রকৃতিপ্রেমী নাজমুলের চোখে বিষয়টি পড়ে দেরিতে। তিনি আর চুপ থাকতে পারেননি।
তিনি ঘটনাস্থলে যান। কাদায় আটকে থাকা প্রাণীগুলোর ছবি তোলেন। সামাজিক মাধ্যমে সেই ছবি ছড়িয়ে দেন। উদ্দেশ্য পরিষ্কার ছিল– বিষয়টা মানুষের সামনে আনা, প্রশাসনের নজরে আনা। গ্রামের ভেতর যে কষ্টটা এতদিন কেবল কয়েকজনের চোখে ছিল, সেটি এবার অনেকের চোখে পড়ে। কাজ হয়। ছবি দেখে বিষয়টি জানতে পারেন মহেশপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন। তিনি নিজে ঘটনাস্থলে যান। মহিষ চারটিকে কাদা থেকে সরিয়ে বাড়ির পাশের উঁচু ও শুকনা জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর প্রাণীগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেয়। মালিককে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভালো ও নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা করতে বলা হয়।
মহিষ কাদাজলে গা ডোবাতে ভালোবাসে–গরম কমাতে, চামড়ার পোকা তাড়াতে। কিন্তু নিজের ইচ্ছায় নেমে আবার উঠে আসা আর দড়িতে বাঁধা থেকে দিনের পর দিন কাদায় দাঁড়িয়ে থাকা এক জিনিস নয়। ভেজা কাদায় টানা দাঁড়িয়ে থাকলে খুরে পচন ধরে, চামড়ায় ঘা হয়, প্রাণী ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এর ৬ ধারাও বিষয়টিকে হালকা চোখে দেখে না– প্রাণীকে এমনভাবে বেঁধে বা আটকে রাখার কারণে সে যদি তার স্বভাব অনুযায়ী চলাফেরা করতে না পারে, সেটি আইনে অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য। আইন আছে। গ্রামে সেই আইনের খবর পৌঁছায় না।
তবে এ গল্পে সহজ কোনো খলনায়ক নেই। মহিষগুলোর মালিক আবদুল আলিম জানান, বর্ষার বাড়তি বৃষ্টিতে বাড়ির পাশের জায়গাটা কাদা হয়ে গিয়েছিল। মাঠে ফসল থাকায় মহিষ চরাতে নেওয়ার উপায়ও ছিল না। আগে মহিষ রাখার একটা ঘর ছিল। সেটি বোনের জায়গায় হওয়ায় ছেড়ে দিতে হয়েছে। নতুন করে ঘর তোলার মতো জায়গা বাড়িতে নেই।
আলিমের কথায় উঠে আসে সংসারের টানাপোড়েনও। আগে কৃষিখামারে শ্রমিকের কাজ করতেন। এখন মহিষ পালন করে সংসার চলে। মেয়ের জামাইকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে দেনা হয়েছে। আশা, মহিষগুলো বড় করে বিক্রি করতে পারলে দেনা শোধ হবে। অর্থাৎ কাদায় বাঁধা ছিল চারটি প্রাণী, আর তাদের দড়ির অন্য প্রান্তে বাঁধা ছিল একটি পরিবারের টিকে থাকার হিসাব। প্রাণীর কষ্ট আর মানুষের অভাব এখানে আলাদা করা যায় না।
প্রশাসনের উদ্যোগের পর আলিমও উদ্যোগী হয়েছেন। বোনের জায়গাটা কিনে নিয়ে সেখানে মহিষের ঘর তোলার কাজ শুরু করেছেন। শুকনা জায়গায় রেখে খাবার দেওয়া, যত্ন নেওয়া–সবই শুরু হয়েছে। এতদিন যে চারটি মহিষকে ঘিরে কেবল কষ্টের গল্প ছিল, তার শেষটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে।
নাজমুল হোসেনের কাছে প্রাণীর প্রতি মায়া কোনো এক মুহূর্তের আবেগ নয়। তিনি দীর্ঘদিন বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি রক্ষার কাজে যুক্ত। মহেশপুর এলাকায় শতাধিক হনুমানকে নিয়মিত খাবার দেন। অসুস্থ বা আহত পাখি উদ্ধার করে চিকিৎসা করান, সুস্থ হলে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেন। ক্ষতিকর ‘চায়না দুয়ারি’ জালের ব্যবহার বন্ধেও মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।
বন্যপ্রাণীর কথা উঠলে আমরা সাধারণত দূরের জঙ্গলের কথা ভাবি। অথচ প্রাণীর প্রতি মমতার শুরুটা হতে পারে নিজের বাড়ির পাশ থেকেই–একটা আহত পাখি, একটা অভুক্ত হনুমান কিংবা কাদায় আটকে থাকা চারটি মহিষকে দেখেও।
মহিষগুলোর জন্য নতুন ঘর উঠতে দেখে ভালো লাগার কথা জানান নাজমুল। তাঁর প্রত্যাশা, প্রাণীগুলো নতুন ঘরে থাকবে। তাঁর ভাষায়, ‘এখন আর পাশ দিয়ে কেউ গেলে তারা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে না।’
এই এক বাক্যে মানুষটার পুরো চাওয়াটা ধরা পড়ে। মহিষ চারটি বলতে পারেনি, ‘আমাদের এখান থেকে সরিয়ে নিন।’ অভিযোগও করতে পারেনি। শুধু কাদায় দাঁড়িয়ে মানুষের দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রাণীরা কথা বলতে পারে না বলে তাদের হয়ে কথা বলার মানুষ দরকার। নাজমুল হোসেন সেই কাজটাই করছেন–নিজের সামর্থ্য দিয়ে, নিজের মমতা দিয়ে।
সূত্র: সমকাল