শিরোনাম
◈ হরমুজের পর বাব-আল-মান্দেবও হাতছাড়া, নতুন সংকটে ট্রাম্প ◈ ঢাকাসহ ১৩ সিটিতে জামায়াতের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী যারা ◈ পর্যটক ভিসায় এসে অপরাধের সাম্রাজ্য, বিদেশিদের নতুন হটজোন বাংলাদেশ ◈ কম ট্যারিফে রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় ◈ জাকির নায়েককে ভারতের হাতে তুলে দিতে আলোচনা চলছে: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ◈ রেমিট্যান্সের প্রবাহে ডলারের বাজারে স্বস্তি, দুই বছরে রিজার্ভ বেড়েছে ১১.৫৮ বিলিয়ন ডলার ◈ বাংলাদেশে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করবে সরকার ◈ মাউশির বিশেষ বিজ্ঞপ্তি এমপিও শিক্ষকদের বদলি আবেদন নিয়ে ◈ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগ সভা-সমাবেশ করলেই কঠোর ব্যবস্থা: রিজভী ◈ সাময়িক জরুরি ব্যয়ে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ চালুর নির্দেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের

প্রকাশিত : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৪৬ সকাল
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:২০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বরুদ্ধ হওয়ার পথে লোহিত সাগর

ইয়েমেনের যুদ্ধপরিস্থিতিতে এক বড় ধরনের সামরিক মোড় ঘুরেছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের বাব আল-মানদাব প্রণালী অঞ্চল এবং দেশের পুরো পশ্চিম উপকূল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠী। শুক্রবার কৌশলগত এই প্রণালীর ভেতরে অবস্থিত মায়ুন দ্বীপ (পেরিম দ্বীপ) দখল করে নেওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলীয় লাহজ প্রদেশের দিকে আক্রমণ জোরদার করেছে তারা। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনী পিছু হটার সময় লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও চালিয়েছে হুথিরা।

সরকারি ও সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে, এর আগে বৃহস্পতিবার লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী আল-মোখা দখল করে হুথি যোদ্ধারা। এরপরই তারা বাব আল-মানদাব অঞ্চল এবং আশেপাশের উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। পিছু হটা সরকারি বাহিনী এখন ইয়েমেনের অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী এডেন থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে লাহজের খোর ওমাইরা এলাকায় গিয়ে অবস্থান নিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মরিয়া হয়ে পিছু হটার সময় সামরিক বাহিনীর ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। বহু সেনা পোশাক ফেলে এবং কম দামে অস্ত্র বিক্রি করে এডেনের দিকে পালিয়ে যাচ্ছেন। হুথিদের অগ্রযাত্রার মুখে এডেন শহরের পশ্চিম প্রবেশপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে আল-মাসিরা টিভিতে এক বিবৃতিতে জানান, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে তারা পশ্চিম ইয়েমেনের প্রায় ৫,৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। পাশাপাশি সউদী যুদ্ধবিমানের সঙ্গে ৩২ বার মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং ৯টি বিমান গুলি করে নামানোর দাবিও করেছেন তিনি। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বাব আল-মান্দেবের গুরুত্বই হুথিদের এই অগ্রযাত্রাকে এতটা তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ইয়েমেন ও আফ্রিকার জিবুতি-ইরিত্রিয়ার মাঝের সরু এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ পথ দিয়েই এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সুয়েজ খালমুখী হয়। ফলে এখানে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে। এরই মধ্যে হুথিরা জানিয়েছে, সউদী পতাকাবাহী জাহাজ ছাড়া অন্য কোম্পানির জাহাজের জন্য লোহিত সাগরের নৌপথ নিরাপদ থাকবে। অর্থাৎ, পুরো নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার বদলে সউদী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকিই আপাতত তাদের ঘোষিত অবস্থানের অংশ। হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, ইয়েমেনের ওপর অবরোধ ও সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে তারাও পাল্টা ব্যবস্থা চালিয়ে যাবে।

তবে হুথিদের পক্ষে লোহিত সাগর পুরোপুরি অবরুদ্ধ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা তাদের নৌপথে হুমকি তৈরির ক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে বাব আল-মান্দেব অবরোধ ধরে রাখার মতো প্রশাসনিক ও সামরিক সক্ষমতা হুথিদের নাও থাকতে পারে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিশ্লেষক সালেহের মতে, হুথিদের পুরো বাব আল-মান্দেব বা পুরো লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজনও নেই। নৌপথকে এতটা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারলেই যথেষ্ট, যাতে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানিগুলো ওই পথ এড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়। ২০২৩ সাল থেকেই হুথিদের হামলার কারণে বহু জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়েছে, এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় বেড়েছে।

সউদী আরবের প্রধান তেল পাইপলাইন বন্ধ : ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত একটি ভয়াবহ ড্রোন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন’ সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে সউদী আরব। ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করা পাইপলাইনটির বেশ কয়েকটি স্থানে ড্রোন আঘাত হানে। এতে পাইপলাইনের পরিচালনকারী সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তা ও ক্ষতির পরিমাণ পর্যালোচনার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সউদী আরামকো পরিচালিত এই পাইপলাইনটির কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। এই পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা হতো, যা বৈশ্বিক তেলের মোট সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ। আগে থেকেই হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরে চলাচলের ওপর নানা সীমাবদ্ধতা চলায় এই পাইপলাইনটিই ছিল সউদী আরবের তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথ। এর কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে ইতিমধ্যেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দ্রুত এটি সচল করা না গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

জর্ডানে ইরানের প্রাণঘাতী হামলায় সহায়তা করেছে চীন : জর্ডানের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের চালানো প্রাণঘাতী হামলায় চীনা স্যাটেলাইটের উচ্চমানের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ জুলাই জর্ডানের মোফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ওই হামলায় ৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং অন্তত ৪ জন আহত হন। মার্কিন গোয়েন্দাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলার আগেই ঘাঁটিটির নিখুঁত ও উচ্চমানের স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করেছিল তেহরান, যা হামলার নিখুঁত লক্ষ্য নির্ধারণে সরাসরি সাহায্য করেছে। তবে এই ছবি সরবরাহে চীন সরকারের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা ছিল কিনা, তার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাননি মার্কিন কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে বেইজিংয়ের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলে চীন সব অভিযোগ অস্বীকার করে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দাবি করেছে।

চরম সংকটে পাকিস্তান, ইরানের মাধ্যমে ইয়েমেনে মধ্যস্থতার চেষ্টা : মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী ও সউদী আরবের মধ্যকার সামরিক সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করার পর এক জটিল কূটনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে পাকিস্তান। একদিকে সউদী আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের মাধ্যমে আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানোর জোর চেষ্টা চালাচ্ছে ইসলামাবাদ।

সম্প্রতি হুথি বাহিনীর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সউদী আরবের প্রধান তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ ৭৩ জন আহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে ইয়েমেনের রেড সি (লোহিত সাগর) উপকূলের দখল নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে হুথিরা, যা বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং স্ট্রেইট অব হরমুজ দুই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটকেই চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনীর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে একাধিকবার আলোচনা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ থেকে সামরিক সহায়তার জন্য চাপ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে কূটনীতির পথ বেছে নিয়েছে। ওংষধসধনধফ মূলত সউদী আরবের নিরাপত্তা সতর্কতা ইরানের মাধ্যমে হুথিদের কাছে পৌঁছানোর এবং সংঘাত কমানোর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০১৫ সালের মতোই পাকিস্তান আবারও নিরপেক্ষ থেকে মধ্যস্থতার ভূমিকা রাখতে চায়। তবে সউদী আরবের ওপর হামলা বাড়তে থাকলে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তানের ওপর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ দিনে দিনে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

সূত্র : ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল, আল-জাজিরা, রয়টার্স।

  • সর্বশেষ