এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনঘেঁষা উপকূল এখন শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের ভূখণ্ড নয়—এটি হয়ে উঠেছে নারীর নীরব জীবনসংগ্রামের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ উপকূলে সংসারের অভাব ঘোচাতে প্রতিদিন নদীর লবণাক্ত পানিতে নামছেন হাজার হাজার নারী। কেউ জাল টেনে বাগদার পোনা ধরছেন, কেউ চিংড়ি ঘেরে শ্রম দিচ্ছেন, কেউ আবার মাইলের পর মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করছেন। পেটের দায়ে প্রতিদিনের এই সংগ্রাম তাদের টেনে নিচ্ছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে।খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা—এই তিন জেলার ভবিষ্যৎ এখন রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করছে। জলবায়ু পরিবর্তন একটি বাস্তবতা—তবে এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে বাজেট ও নীতিতে পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। নয়তো উপকূল শুধু ভাঙবে না, ভেঙে পড়বে মানুষের আশা, অর্থনীতি ও জীবন।
নদীর লবণাক্ত পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে জাল টানছেন তারা। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে জীবিকার লড়াই। কিন্তু এই পানির লবণাক্ততা তাদের শরীর ও প্রজননস্বাস্থ্যে কী প্রভাব ফেলছে—সংসারের অভাবের কাছে সেই প্রশ্ন যেন বারবার চাপা পড়ে যাচ্ছে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালি বাজারসংলগ্ন কপোতাক্ষ নদের তীরে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে বসবাস করেন ৫০ বছর বয়সী আমিরন বিবি। ঘরটিই তার কাছে রাজপ্রাসাদ। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে একমাত্র মেয়ে ববিতাকে নিয়ে এখানেই বসবাস করছেন তিনি। একের পর এক দুর্যোগে ঘর ভেঙেছে, আবার মেরামত করেছেন। স্বামী ২০ বছর আগে চলে যাওয়ার পর নদীই হয়ে উঠেছে তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
আমিরন বিবির ভাষায়, “নদীতে জাল টেনে বাগদার পোনা ধরে বাজারে বিক্রি করি। সারাদিন নদীতে জাল টেনে কোনো দিন ২০০-৩০০ টাকা পাই, কোনো দিন তাও হয় না। একশ বাগদার পোনা বিক্রি হয় মাত্র ৪০ টাকায়।”
সরকারি সহায়তা পেয়েছেন কি না—প্রশ্ন করতেই চোখে পানি চলে আসে তার। বলেন, “এত বছর নদীর তীরে আছি, আজ পর্যন্ত কেউ এক টাকাও সাহায্য করেনি। ১০ টাকা কেজি চালের কার্ডও পাইনি। সরকার ঘর দেয়, সেটাও জোটেনি। নদীর কূল-কিনারা আছে, আমার নাই।”
শুধু আমিরন বিবি নন, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের নদের তীরে বসবাসকারী প্রায় অর্ধশত পরিবারের জীবনও একই চক্রে বন্দি। মনজিলা খাতুন চার ছেলেকে নিয়ে একটি এনজিওর দেওয়া ঘরে থাকেন। স্বামী বৃদ্ধ ও অচল। তাই সংসারের ভার এখন তার কাঁধে। নদীতে জাল টেনে বাগদার পোনা ধরে দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করেন। সেই আয়েই চলে সংসার।
শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকাতেও একই চিত্র। নারীরা নদীতে জাল টেনে মাছ ধরছেন, পুরুষরা কখনো ইটভাটায়, কখনো দিনমজুরির কাজে ছুটছেন। দুর্যোগের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই নদীর তীরে ছোট ছোট কুঁড়েঘরে বসবাস করছে পরিবারগুলো।
লবণাক্ত পানির নীরব বিষ
উপকূলের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি এখন সুপেয় পানির অভাব। লবণাক্ততার বিস্তার, জোয়ারের পানি, চিংড়ি চাষ এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বহু এলাকায় নিরাপদ পানির উৎস সংকুচিত হয়ে পড়েছে। খাবার পানির জন্য নারীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না মিষ্টি পানি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত লবণযুক্ত পানি দীর্ঘদিন পান করলে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে কাজ করা নারীদের ত্বক, প্রজননস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে জীবিকা রক্ষার জন্য নদীতে নামা নারীরাই আবার সেই লবণাক্ততার স্বাস্থ্যঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন।
পুরুষের চেয়ে কম মজুরি, শ্রম বেশি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলের কৃষি ও অন্যান্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় পুরুষদের একটি অংশ কাজের সন্ধানে দূর-দূরান্তে চলে যাচ্ছেন। সুন্দরবনে প্রবেশ ও মৎস্য আহরণে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় অনেক বনজীবী কর্মহীন হয়ে পড়েন। তখন সংসারের চাকা সচল রাখার দায়িত্ব এসে পড়ে নারীদের ওপর।
শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ এলাকার সাবিনা খাতুন বলেন, বন বন্ধ থাকলে তার স্বামী কাজ পান না। কিন্তু সংসারের খরচ ও ঋণের কিস্তি বন্ধ থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে তাকে চিংড়ি ঘেরে শ্রম দিতে হয়।
তার ভাষায়, “বন বন্ধ থাকলে স্বামী কাজ পায় না। কিন্তু সংসারের খরচ আর ঋণের কিস্তি ঠিকই চালাতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে আমাকেই রোদে পুড়ে, জলে ভিজে ঘেরে কাজ করতে হয়।”
এখানেই শেষ নয় বৈষম্য। স্থানীয় নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, যে কাজের জন্য একজন পুরুষ শ্রমিক দিনে ৪০০-৫০০ টাকা পান, একই ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করেও নারী পান মাত্র ২৫০-৩০০ টাকা। কম মজুরির কারণে ঘের মালিকরাও অনেক সময় নারী শ্রমিক নিতে আগ্রহী হন।
নিষেধাজ্ঞায় বনজীবী পরিবারে নেমে আসে নীরব দুর্ভিক্ষ
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রজনন রক্ষায় নির্দিষ্ট সময়ে বন ও সাগরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকে। বন বন্ধ, সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ কিংবা দুর্যোগের সময় কাজ বন্ধ—প্রতিটি পরিস্থিতিতেই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে দরিদ্র বনজীবী পরিবারগুলো।
নেপাল সানা নামে এক বনজীবীর ভাষায়, “ছোটবেলা থেকে শুধু সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরি। অন্য কোনো কাজের দক্ষতা নেই। বন বন্ধ থাকলে কাজ থাকে না। বাধ্য হয়ে পরিবারের নারীদের দিনমজুরি দিতে পাঠাতে হয়।”
সরকারি হিসাবে সাতক্ষীরায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ হাজার। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৮৯ জন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেন। শ্যামনগর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৭ হাজার ৩৫৫ জন। মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের একটি অংশ ভিজিএফ সহায়তা পান। কিন্তু স্থানীয় জেলে ও ট্রলার মালিকদের দাবি, প্রকৃত জেলের সংখ্যা সরকারি তালিকার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে পরিবার সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বাঁধ ভাঙে, লোনা পানি ঢোকে, হারিয়ে যায় কৃষি
উপকূলের কৃষিও লবণাক্ততার ভয়াবহ চাপে। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, ফণী, বুলবুলসহ একের পর এক দুর্যোগে বহু এলাকার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও বাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকেছে, কোথাও চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ কেটে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানো হয়েছে।
একসময় যে জমিতে ধান হতো, সেই জমির অনেকটাই এখন লবণাক্ত পানির চিংড়ি ঘের। ফলে কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানও কমেছে। আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে গিয়ে নারীরা ঝুঁকছেন দিনমজুরি, ঘেরের কাজ ও নদীতে পোনা ধরার মতো কষ্টসাধ্য পেশায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার বিস্তার যুক্ত হয়ে উপকূলের মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন নারী ও কিশোরীরা।
ঘর নেই, জমি নেই—তবু নদীর তীরেই জীবন
শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, নদীর তীরে প্রায় ৫০টি পরিবার বসবাস করছে। তাদের অনেকেই নদীতে জাল টেনে জীবিকা নির্বাহ করেন। অসহায়দের ভিজিডি, ভিজিএফ ও অন্যান্য সরকারি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির মালিকানা একটি বড় বাধা।
গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জি এম মাসুদুল আলম জানান, নদীর তীরে বসবাসকারী অসহায় পরিবারগুলোর ঘরের জন্য তালিকা উপজেলা পরিষদে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক পরিবার ঘর বরাদ্দ পায়নি।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রনি খাতুন বলেন, উপকূলের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে প্রশাসন কাজ করছে। সরকারি ঘরের ক্ষেত্রে নিজস্ব জমি থাকার শর্ত রয়েছে। ভূমিহীনদের তালিকা তৈরি করে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী জমি দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। পাশাপাশি বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকা রক্ষায় শুধু ত্রাণ বা ভিজিএফ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা, বড় জলাধার ও পুকুর খনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কার্যকর বেড়িবাঁধ, স্লুইস গেট, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, কৃষিতে লবণসহিষ্ণু জাতের সম্প্রসারণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ ও ন্যায্য মজুরির কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নদী ও ঘেরে দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে কাজ করা নারীদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রজননস্বাস্থ্য সেবা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহীর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লোনা পানির আগ্রাসনে উপকূলের আবাদি জমি ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। পুরুষরা কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেলে পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঢাল হয়ে দাঁড়ান নারীরাই।
জলবায়ু ন্যায়বিচার চান উপকূলের নারীরা
যে নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নন, তারাই কেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন—এই প্রশ্ন এখন উপকূলের মানুষের।
আমিরন বিবির মতো নারীদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আলোচনার বিষয় নয়। তাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন মানে—ভেঙে যাওয়া ঘর, লবণাক্ত পানি, নষ্ট হয়ে যাওয়া জমি, নদীতে নেমে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া, কম মজুরি, অনিশ্চিত আয় আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিনের দুশ্চিন্তা।
সুন্দরবনের নদীতে যখন একজন নারী জাল টানেন, তখন তিনি শুধু কয়েকটি বাগদার পোনা ধরেন না—তিনি টেনে তোলেন একটি পরিবারের বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকু। কিন্তু সেই আশার মূল্য যদি হয় তার নিজের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ, তবে রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে প্রশ্ন থেকেই যায়—উপকূলের এই নারীদের বাঁচাতে আর কতদিন অপেক্ষা?
সুপেয় পানি, নিরাপদ বাসস্থান, ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা ও বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এখন আর উন্নয়ন পরিকল্পনার অতিরিক্ত কোনো বিষয় নয়; এটি উপকূলের নারীদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সুন্দরবন উপকূলের এই নীরব সংকট একদিন আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।