শিরোনাম
◈ বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ১০৯, নতুন বিনিয়োগ ৩০০ কোটি ডলার এরপরও করনীতির অনিশ্চয়তায় শিপিং খাত ◈ তাজমহল: ভালোবাসার নিদর্শনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মমতাজ মহলের বেদনার গল্প ◈ কলকাতায় ৮০০ হোটেল বন্ধ, বিপাকে বাংলাদেশি রোগী-স্বজন; চিকিৎসার পর থাকার জায়গা কোথায়? ◈ ভারতের ভিসা নিয়ে দালালদের প্রতারণা থেকে সতর্ক করল হাইকমিশন ◈ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বিকল্প পরিকল্পনা দিন: বিরোধীদলকে রিজভী ◈ প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত সেই বৃদ্ধার মৃত্যু ◈ ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ ◈ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আঁচ বাংলাদেশে, এলএনজি ভর্তুকিতে বড় চাপ ◈ দেশে ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনা, ৬ মাসে অনুমোদন মাত্র ৩টির: লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ ◈ নেপালে বন্যার ৯ দিন পর জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গ থেকে ২ শ্রমিক জীবিত উদ্ধার, আরও ৫০০ নিখোঁজ

প্রকাশিত : ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:২৫ দুপুর
আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:১৭ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ১০৯, নতুন বিনিয়োগ ৩০০ কোটি ডলার এরপরও করনীতির অনিশ্চয়তায় শিপিং খাত

দুই মাসের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও বৃহৎ ড্রাই বাল্ক শিপিং কোম্পানি ওলডেনডর্ফ থেকে কেনা আরো দুটি জাহাজ এমজিআইয়ের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তখন প্রতিষ্ঠানটির সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা বেড়ে ৩০-এ দাঁড়াবে। সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে দেশীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। বড় অংকের মূলধনি বিনিয়োগের মাধ্যমে একের পর এক নতুন জাহাজ যুক্ত হচ্ছে বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বহরে। নীতিসহায়তার সুবাদে একসময় মাত্র ৩৯টি থাকা দেশীয় পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা বেড়ে ১০৯-এ পৌঁছেছে। এ খাতে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগও এসেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, নিজস্ব জাহাজে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে একদিকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশী পণ্য পরিবহন ও নাবিকদের আয় থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। তবে এ সম্ভাবনার মধ্যেই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে নীতির ধারাবাহিকতা। ২০৩০ সাল পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা বহাল রাখার কথা থাকলেও তা বার্ষিক মেয়াদে নামিয়ে আনা এবং জাহাজ আমদানিতে বিদ্যমান বিধিনিষেধের কারণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) বহরে বর্তমানে সমুদ্রগামী জাহাজ রয়েছে ২৮টি। এর মধ্যে সম্প্রতি ৬৩ হাজার ৫৪৭ টন পণ্য পরিবহনক্ষমতার একটি নতুন জাহাজ যুক্ত হয়েছে। এমজিআই সূত্রে জানা গেছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স’-এর মাধ্যমে জাহাজটি কেনা হয়েছে। নতুন কেনা জাহাজসহ এমজিআইয়ের ২৮টি জাহাজের সম্মিলিত পণ্য পরিবহনক্ষমতা এখন বেড়ে ১৬ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।

দুই মাসের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও বৃহৎ ড্রাই বাল্ক শিপিং কোম্পানি ওলডেনডর্ফ থেকে কেনা আরো দুটি জাহাজ এমজিআইয়ের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তখন প্রতিষ্ঠানটির সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা বেড়ে ৩০-এ দাঁড়াবে। সব মিলিয়ে দেশীয় পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের পণ্য পরিবহনক্ষমতার বিচারে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে এমজিআই। প্রতিষ্ঠানটির জাহাজগুলো তুলনামূলকভাবে নতুন ও আধুনিক হওয়ায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের জন্য বিশ্ববাজারে দ্রুত ভাড়া বা চার্টার পায়। এমজিআইয়ের বহরে থাকা জাহাজগুলোর বেশির ভাগই বাল্ক ক্যারিয়ার হওয়ায় চিনি, গম, সয়াবিনবীজ, ভুট্টা এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের মতো খোলা পণ্যই বেশি পরিবহন করে। দেশের সবচেয়ে বড় নিত্যভোগ্যপণ্যের উৎপাদক ও সরবরাহকারী হওয়ার সুবাদে নিজেদের আমদানি করা পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহন করেও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে গ্রুপটি।

এ বিষয়ে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এসব জাহাজে এরই মধ্যে আমাদের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে। জার্মানির ওলডেনডর্ফ থেকে আরো দুটি জাহাজ বুক করে রেখেছি, যেগুলো নভেম্বরে বুঝে পাব। সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালনায় আমাদের পথচলা শুরু হয় ২০১১ সালে। তবে ২০১৯ সাল থেকে আমরা একের পর এক জাহাজ বহরে যুক্ত করেছি। কভিডের সময়েও চারটি সমুদ্রগামী জাহাজ বহরে যুক্ত করা হয়েছে। দেশে বছরে যে পরিমাণ আমদানি-রফতানি হয়, তার বিপরীতে ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার জাহাজ ভাড়ায় ব্যয় হচ্ছে। অথচ এ খাতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ এখনো খুবই সীমিত। ইন্দোনেশিয়ায় দুই বছর আগেই নিজস্ব পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়েছে। সেখানে আমাদের দেশে তা এখনো মাত্র শতকের ঘরে।’

দেশীয় সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালনা খাতে নীতিগত পরিবর্তন এবং কর সুবিধার মেয়াদ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজগুলো পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। পাশাপাশি এসব জাহাজে কর্মরত দেশীয় নাবিক ও কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতাও বৈদেশিক মুদ্রায় ‘ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্স’ হিসেবে সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও আয়ের এ খাতকে বিশ্বজুড়ে কর সুবিধা দেয়া হলেও বাংলাদেশে উল্টো করভার ও নীতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

দেশে নিবন্ধিত বিদেশী বা দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজ খাতকে শিল্প হিসেবে ঘোষণার পর ১ শতাংশ আয়কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশে ২০৩০ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি বা ‘ট্যাক্স হলিডে’ সুবিধা বহাল রাখার কথা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা পরিবর্তন করে বার্ষিক মেয়াদে নামিয়ে আনা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এক বছরের স্বল্পমেয়াদি সুবিধার কারণে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও জাহাজ কেনার পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া নৌ-পরিবহন নীতি অনুযায়ী ১০ বছরের বেশি পুরনো সমুদ্রগামী জাহাজ আমদানিতে বিধিনিষেধ রয়েছে, যা নতুন জাহাজ কেনার ক্ষেত্রে মূলধন ও পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশ ওশান গোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘উদ্যোক্তাদের ২০৩০ সাল পর্যন্ত ট্যাক্স হলিডে বা করমুক্ত সুবিধা দেয়ার কথা ছিল। হঠাৎ তা পরিবর্তন করে বার্ষিক মেয়াদে নামিয়ে আনায় পুরো খাত অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ফলে যে গতিতে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের বহর বড় হওয়ার কথা ছিল, তা থমকে গেছে। প্রায় সবাই এখন সমুদ্রগামী জাহাজ কেনা থেকে পিছিয়ে আসছেন।’

বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সচল রাখতে বছরে প্রায় ১৪ কোটি টন পণ্য পরিবহন হয় জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এ পণ্য পরিবহনে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার ফ্রেইট চার্জ দিতে হয়। অন্যদিকে দেশীয় উদ্যোক্তারা বহর বাড়ানোয় বর্তমানে জাহাজ পরিচালনা থেকে ফ্রেইট হিসেবে বছরে ১ বিলিয়ন ডলার এবং জাহাজে নিয়োজিত নাবিকদের ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্স থেকে আরো ১ বিলিয়ন ডলার দেশে আসছে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়কারী ও আয়কারী এ সম্ভাবনাময় খাতে আগের শুল্কমুক্ত নীতিমালা নিরবচ্ছিন্নভাবে বহাল রাখা অত্যন্ত জরুরি।’

উদ্যোক্তাদের মতে, একটি সমুদ্রগামী জাহাজ কিনতে বিশাল অংকের মূলধন প্রয়োজন হয়। তার ওপর বিশ্বজুড়েই এটি উচ্চ ঝুঁকির ব্যবসা। বিভিন্ন দেশে রফতানিমুখী বা বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী খাতে শুল্ক মওকুফের পাশাপাশি নগদ প্রণোদনা দেয়ারও নজির রয়েছে। সে তুলনায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেয়া করমুক্ত সুবিধা পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে তারা ভালো উদাহরণ হিসেবে দেখছেন না। সরকার কর অব্যাহতি ও ইনসেনটিভ ঘোষণার আগে বাংলাদেশে সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৯। নীতিসহায়তার সুবাদে অল্প সময়ের মধ্যেই তা বেড়ে ১০৯টিতে উন্নীত হয়। এ খাতে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ এসেছে, যার বড় অংশই হয়েছে নীতিসুবিধা চালুর মাত্র দেড় বছরের মধ্যে ১৪ জন উদ্যোক্তার হাত ধরে।

বেসরকারি খাতে সমুদ্রগামী শিপিং ব্যবসায় এগিয়ে থাকা চট্টগ্রামভিত্তিক কেএসআরএম গ্রুপ ২০০৯ সালে জাহাজ কেনা শুরু করে। ধাপে ধাপে বহর বাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটির জাহাজের সংখ্যা এখন ২৭-এ দাঁড়িয়েছে। এর সবই বাল্ক বা খোলা পণ্যবাহী জাহাজ। কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন ২৭টি জাহাজ রয়েছে। তবে নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা না হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। আপাতত আমাদের নতুন সমুদ্রগামী জাহাজ কেনার পরিকল্পনা নেই।’

এছাড়া কর্ণফুলী গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচআর লাইনসের বহরে বর্তমানে মোট আটটি কনটেইনার জাহাজ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে নিজেদের জাহাজের বহর সম্প্রসারণ করেছে। সর্বশেষ ‘এইচআর তুরাগ’ ও ‘এইচআর বালু’ নামের দুটি জাহাজ যুক্ত হওয়ার পর এইচআর লাইনসের বহরে কনটেইনার জাহাজের সংখ্যা আটটিতে পৌঁছেছে।

বেসরকারি মালিকানাধীন জাহাজের পাশাপাশি সরকারি খাতে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) বহরে রয়েছে সাতটি জাহাজ। এর মধ্যে চারটি বাল্ক বা খোলা পণ্যবাহী জাহাজ ও তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর ফজলার রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগই সমুদ্রপথে সম্পাদন হয় এবং সময়ের সঙ্গে এর পরিধিও বাড়ছে। অথচ এ বিশাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তুলনায় দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা অপ্রতুল। বাণিজ্যিক জাহাজের বহর বড় করা গেলে নিজস্ব পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। একই সঙ্গে বিদেশী পণ্য পরিবহনের সুযোগ নিয়ে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও করা যাবে।’ এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএসসি তার বিদ্যমান শিপিং বহর আরো আধুনিক ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আগামীতে বেশকিছু সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

  • সর্বশেষ