আজিজুল হক, বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি: যশোরের বেনাপোলে বিদ্যুৎ বিভাগের দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে অক্সিজেন সংকটে প্রায় ১৫ কোটি টাকার পাবদা মাছ মরে। এতে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। একই সঙ্গে আমকর মৎস্য খামারের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারীও কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
সোমবার কান্নাজড়িত কন্ঠে কথা একথা বলেন বেনাপোলের মৎস্যচাষি আলফাজ হোসেন। তিনি আরও বলেন, “এক রাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে আমার বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। মাছগুলো বাঁচাতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় সেই ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে শনিবার রাতে বেনাপোল সীমান্তের রায়পুর মাঠ এলাকায় প্রায় ২০০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা বিশাল মাছের ঘেরে এ ঘটনা ঘটে। রাতভর বিদ্যুৎ না থাকায় ঘেরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
এতে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিলে একে একে মাছ মরে ভেসে ওঠে। সকালে ঘেরের পানিতে লক্ষ লক্ষ মৃত পাবদা মাছ ভেসে থাকতে দেখে মৎস্যচাষি ও কর্মচারীদের মধ্যে নেমে আসে চরম হতাশা।
মৎস্যচাষির দাবি, দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, বিপুল বিনিয়োগ এবং ধার-দেনা করে গড়ে তোলা এ খামারের মাছ এক রাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন।
ব্যাংক, মাছের খাদ্য সরবরাহকারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে তার কোটি কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। মাছ বিক্রি করে এসব ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের ব্যয় নির্বাহের পরিকল্পনা থাকলেও মাছের ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনায় সেই সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও খামার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রায়পুর মাঠের প্রায় ২০০ বিঘা জমির বিশাল ঘেরে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে পাবদা মাছ চাষ করা হচ্ছিল। মাছের পরিচর্যা, খাবার দেওয়া, পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, অক্সিজেন সরবরাহ ও নিরাপত্তার কাজে প্রতিদিন শতাধিক মানুষ যুক্ত ছিলেন। মাছ মারা যাওয়ার পর খামারের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারাও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, কর্মচারীদের কীভাবে বেতন দেবেন—তা নিয়েই চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
এখন আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। ব্যাংক ও বিভিন্ন জায়গায় কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। সরকার যদি সহযোগিতা না করে, তাহলে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ অবস্থায় তিনি মাছের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে মৎস্য অধিদপ্তর ও বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বিত তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মৎস্যচাষির অভিযোগ, এত বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত মৎস্য অধিদপ্তর কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে খোঁজখবর নেননি। এতে আরও হতাশ হয়ে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত চাষি ও তার সঙ্গে কাজ করা শ্রমিকরা।
স্থানীয় মৎস্যচাষিরা বলছেন, আধুনিক পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক মাছ চাষে বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ মাছের ঘেরে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহের জন্য বৈদ্যুতিক এয়ারেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালু রাখতে হয়।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন দ্রুত কমে গিয়ে মাছের ব্যাপক মৃত্যু ঘটতে পারে। ফলে বড় আকারের মৎস্য খামারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
এদিকে বিপুল পরিমাণ মাছ মরে যাওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকির আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা। দ্রুত মৃত মাছ অপসারণ করে যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ঘেরের পানির গুণগত মান পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে।
একটি রাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয় যে একটি বিশাল মৎস্য প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগকে কীভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে, বেনাপোলের রায়পুর মাঠের এই ঘটনা তারই বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষি ও শ্রমিকদের দৃষ্টি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর দ্রুত পদক্ষেপের দিকে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে শার্শা পল্লি বিদ্যুৎ অফিসের লাইন ম্যান অকিউল জানান, ঐ মাস ব্যবসায়ী তাদেরকে জানিয়েছিলেন কিন্তু লোড শেডিং থাকায় তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতেরপারেনি।।