শিরোনাম
◈ নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামির ডেথ রেফারেন্সের রায় আজ ◈ দুপুরের মধ্যে ঢাকাসহ ৮ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস ◈ দ্বিতীয় পদ্মা-যমুনা সেতুসহ পাঁচ বছরে ৫০০ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের ◈ তারেক রহমানের সফর অনিশ্চিত, কোন পথে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক? ◈ বাংলা কিউআরে দৈনিক লেনদেনে বড় লাফ ◈ ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি বিক্রির বিজ্ঞাপন হ্যাকারদের, ডলার দাবি ◈ হাদি হত্যাকাণ্ড: পরিকল্পনা থেকে দেশত্যাগ, তদন্তে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য ◈ অতিরিক্ত আইজিপি হলেন পাঁচ কর্মকর্তা ◈ জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ◈ চিনিতে লোকসান গুনেও অ্যালকোহলে ১৬৫ কোটি টাকা মুনাফা কেরুর

প্রকাশিত : ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:৪৭ সকাল
আপডেট : ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০৩ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সুগন্ধা থেকে কলাতলী, ৬৩ কোটি টাকায় কক্সবাজারে হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন নতুন সড়ক

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার। দেশের প্রধান পর্যটন নগরী হিসেবে প্রতিবছরই এখানে বাড়ছে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন। পর্যটকের চাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। ফলে বিশেষ করে কলাতলী ও পর্যটন জোনে তীব্র যানজট এখন পর্যটকদের ভোগান্তির অন্যতম কারণ।

এই পরিস্থিতি থেকে স্থায়ীভাবে উত্তরণের লক্ষ্যে সৈকত লাগোয়া নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী বেইলি হ্যাচারি পর্যন্ত প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। এর প্রথম ধাপে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী মোড় পর্যন্ত ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৪ মিটার প্রশস্ত সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।

প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য সড়কটি হবে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি এটি কক্সবাজার শহরের সুরক্ষাবাঁধ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কটি চালু হলে পুরো পর্যটন জোনে ওয়ান-ওয়ে যোগাযোগব্যবস্থা চালুর সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে কলাতলী প্রধান সড়কের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি যানজটও অনেকাংশে নিরসন হবে।

থাকবে ওয়াকওয়ে, স্ট্রিট লাইট ও পার্কিং

কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’-এর আওতায় সড়কটি নির্মাণ করছে কক্সবাজার পৌরসভা। প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। ২০২৫ সালের ১৭ জুন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)।

২০২৭ সালের ৫ অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক দিন ধরে সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পের নকশায় সড়ক লাগোয়া দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে, আধুনিক স্ট্রিট লাইট, পর্যটকদের জন্য পরিচ্ছন্নতা সুবিধা, পার্কিং ব্যবস্থা এবং সৈকতে নামার জন্য সিঁড়ি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

কমবে কলাতলীর যানজট

হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবু কাশেম সিকদার বলেন, পর্যটকের তুলনায় কক্সবাজার শহর এখনো অনেক ছোট। পর্যটন জোনে চলাচলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রধান সড়কের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও যানবাহন এ সড়ক দিয়ে চলাচল করে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের যানবাহনও এ সড়ক ব্যবহার করে। ফলে বছরের অধিকাংশ সময় পর্যটন জোনে যানজট লেগেই থাকে।

তিনি বলেন, ‘পর্যটন জোনের জন্য বিকল্প সড়কের প্রয়োজন অনেক আগেই দেখা দিয়েছিল। সৈকত লাগোয়া সুগন্ধা থেকে বেইলি হ্যাচারি পর্যন্ত সড়কটি নির্মিত হলে পর্যটন শহরের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কলাতলী সড়ক ও নতুন সৈকত সড়কে পৃথকভাবে একমুখী যান চলাচল করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মেরিন ড্রাইভগামী যানবাহনগুলো মূল শহর এড়িয়ে চলাচল করতে পারবে। এতে যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।’

মেরিন ড্রাইভের পর্যটন সম্ভাবনা বাড়বে

মেরিন ড্রাইভ হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, মেরিন ড্রাইভ ঘিরে ইতোমধ্যে পর্যটনের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। সেখানে তারকা মানের হোটেলসহ অসংখ্য হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু বেইলি হ্যাচারি পয়েন্টে সড়কের ভাঙন এবং যোগাযোগ সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকার সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, কলাতলী মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভের দিকে যে অভ্যন্তরীণ সড়ক রয়েছে, সেটিও পর্যাপ্ত নয়। ফলে মেরিন ড্রাইভের বিস্তীর্ণ পর্যটন সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সুগন্ধা থেকে নির্মিতব্য সৈকত লাগোয়া সড়কটি মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে যুক্ত হলে কক্সবাজারের পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

অবকাঠামো ঘাটতি পূরণের সুযোগ

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুস শুক্কুর সিআইপি বলেন, সময়ের সঙ্গে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের অবকাঠামো যেভাবে গড়ে ওঠার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। ফলে সম্ভাবনার একটি বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘এই সড়ক নির্মিত হলে পর্যটন অবকাঠামোর একটি বড় ঘাটতি পূরণ হবে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি হবে। এতে কক্সবাজারে নতুন করে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

পরিবেশ নিয়ে বিতর্ক

তবে সৈকতের বালিয়াড়ি এলাকায় সড়ক নির্মাণ নিয়ে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীদের একটি অংশ। তাদের দাবি, বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শহরের নাগরিকদের একটি অংশ এ আপত্তির সমালোচনা করেছেন। 

কক্সবাজার জেলা রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ ইকবাল বলেন, ‘কক্সবাজারে রেললাইন, বিদ্যুৎ প্রকল্প, বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পসহ বহু উন্নয়নকাজ হয়েছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠেনি। অথচ একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণ করতে গেলেই পরিবেশের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে।’

তবে পরিবেশের ক্ষতির অভিযোগের পাশাপাশি কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন—এমন মতও রয়েছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন মহলে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় করে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।

কক্সবাজার পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘এই সড়ক নিয়ে পরিবেশের নামে নানা ধরনের প্রচারণা চলছে। প্রকল্পের পরিবেশগত দিকগুলো যাচাই করে তথ্যভিত্তিক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগত স্বার্থে কোনো পক্ষ যেন জনগণকে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

‘সব ধরনের অনুমোদন রয়েছে’

সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া বলেন, ‘এ এলাকায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিবিধান অমান্য করে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা গড়ে উঠেছে। অথচ শহরের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য একটি পরিকল্পিত সড়ক নির্মাণে পরিবেশের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি একনেকের মাধ্যমে অনুমোদিত। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ সংশ্লিষ্ট অনুমোদন রয়েছে।’

নাগরিক সমাজের সভা

এদিকে সড়ক নির্মাণকাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগের প্রতিবাদে রবিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার প্রেসক্লাবে নাগরিক সমাজের উদ্যোগে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারীর সভাপতিত্বে সভায় প্রেসক্লাবের সহসভাপতি কামাল হোসেন আযাদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী, পর্যটন উদ্যোক্তা মুফিজুর রহমান মুফিজ, মুকিম খান, হোসাইনুল ইসলাম বাহাদুর, আনোয়ার, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ও ক্রীড়াবিদ সরওয়ার রোমন, রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ ইকবাল, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিমুর রহমান, জুলাই যোদ্ধা রবিউল হোসেন, রিয়াদ মনি, মোহাম্মদ হাশিম, কামরুল হাসান, মুহাম্মদ আলী, আলী আকবর, আজম হুদা, সাংবাদিক শামসুল হক শারেক, ইকরাম চৌধুরী টিপু, এম আর মাহবুব, এম আর খোকনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, অতীতে পরিবেশের দোহাই দিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশের নামে কোনো ধরনের অনিয়ম, চাঁদাবাজি বা ব্যক্তিস্বার্থের কর্মকাণ্ড থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

বক্তারা বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে পরিবেশ সংরক্ষণ ও আধুনিক অবকাঠামো—দুটিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। তবে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে আইনগত ও পরিবেশগত শর্ত পূরণ হয়ে থাকলে অযথা বাধা না দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

নগরবাসীর প্রত্যাশা, সুগন্ধা-কলাতলী সৈকত সড়কটি শুধু যানজট নিরসনের বিকল্প পথ নয়, বরং পরিকল্পিত পর্যটন নগরী গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে গড়ে উঠবে। দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে, আলোকসজ্জা, পার্কিং ও সৈকতে প্রবেশের সুবিধা যুক্ত হলে নতুন এ সড়ক কক্সবাজারের পর্যটন আকর্ষণেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

সূত্র: ইনকিলাব

  • সর্বশেষ