শিরোনাম
◈ নির্বাচনী লড়াইয়ে চাপে নেতানিয়াহু, পাশে নেই ট্রাম্প ◈ ছাত্রদলের শীর্ষ পদে আলোচনায় একাধিক নাম, শেষ মুহূর্তে কারা এগিয়ে? ◈ সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণ: নিহতদের প্রতি পরিবারকে ১০ লাখ টাকা দেবে বিএসবিআরএ ◈ দিল্লি হাইকোর্ট-বিমানবন্দরসহ সরকারি দপ্তরে বোমা হামলার হুমকি ◈ জুমার আজান শোনা যায়নি কলকাতার বহু মসজিদে, আতঙ্কে মুসলিমরা   ◈ অ‌স্ট্রেলিয়ার বিরু‌দ্ধে করা টেস্ট সেঞ্চু‌রি বাবা-মাকে উৎসর্গ কর‌লেন তান‌জিদ হাসান তামিম  ◈ মোহাম্মদপুরে কোনো ‘কিশোর গ্যাং’ সক্রিয় নেই, দাবি র‌্যাবের ◈ মির্জা ফখরুল থেকে মান্নান ভূঁইয়া : বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন যারা ◈ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে দুই বিদেশি জাহাজের সংঘর্ষ ◈ সরকারের ৬ মাসে মোটামুটি সব লক্ষ্যই পূরণ হয়েছে: রিজভী

প্রকাশিত : ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:০৮ রাত
আপডেট : ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৩০ বছরে কমেছে ২২% ফসলি জমি, অনাবাদি জমি বেড়েছে ৭%

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিষে বদলে যাচ্ছে উপকূলের জীবন

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়—এটি লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন। নদী, খাল, মাছ, কাঁকড়া, মধু, গোলপাতা ও কৃষিকে ঘিরেই যুগের পর যুগ গড়ে উঠেছে উপকূলের মানুষের জীবন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা সেই চিরচেনা জীবনযাত্রায় এনেছে ভয়াবহ পরিবর্তন।

গত ৩০ বছরে সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ফসলি জমি কমেছে ২২ শতাংশ, আর অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৭ শতাংশ। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট। বিকল্প জীবিকার বড় সুযোগ না থাকায় কেউ পেশা বদল করছেন, কেউ শহরমুখী হচ্ছেন, আবার কেউ জীবিকার আশায় বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরছেন।

লবণাক্ততার কাছে হার মানছে কৃষি

একসময় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে ছিল ধানের ক্ষেত। কৃষকের গোলা থাকত ধানে পরিপূর্ণ। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত।

ঘূর্ণিঝড় আইলা, আম্পান, রেমালসহ একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর উপকূলের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। অনেক এলাকায় জমিতে লোনা পানি ঢুকে পড়ায় আগের মতো ধান বা অন্যান্য ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

যে জমিতে একসময় বছরে একাধিক ফসল উৎপাদিত হতো, সেখানে এখন দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানি জমে থাকে। ফলে কৃষক বাধ্য হচ্ছেন চাষাবাদ ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে।

ধানের জমিতে চিংড়ির ঘের, কমছে কর্মসংস্থান

লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে অনেক কৃষক ধান চাষের পরিবর্তে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে ঝুঁকেছেন। অর্থনৈতিকভাবে চিংড়ি লাভজনক হলেও এর সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট।

এক বিঘা জমিতে ধান চাষে যে সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, চিংড়ি ঘেরে তার তুলনায় অনেক কম শ্রমিক লাগে। ফলে কৃষিজমি ঘেরে পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপুলসংখ্যক কৃষিশ্রমিকের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে।

অল্প জমির প্রান্তিক কৃষকদের অনেকেই লবণাক্ততার কারণে চাষাবাদ করতে না পেরে জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ নিজের জমিতেই অন্যের ঘেরে শ্রমিক বা পাহারাদার হিসেবে কাজ করছেন।

সুন্দরবনও এখন আর আগের মতো ভরসার জায়গা নয়

সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জীবনও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা সংগ্রহ করে যে আয় একসময় একটি পরিবারকে মোটামুটি স্বচ্ছলভাবে চালাতে পারত, এখন তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল।

২০১৭ সালে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকা বাড়িয়ে ৫২ শতাংশ করা হয়। বন সংরক্ষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও বনজ সম্পদ আহরণের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বননির্ভর অনেক মানুষের আয় কমেছে। ফলে বিকল্প জীবিকার অভাবে কেউ ঋণের জালে জড়িয়েছেন, কেউ পেশা বদল করেছেন।

দাদনের জালে বন্দি জেলেরা

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার অনেক জেলে মাছ ধরতে যাওয়ার আগেই মহাজন বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা ধার নেন। পরে মাছ বিক্রির অর্থের বড় অংশ চলে যায় ঋণ ও কিস্তি পরিশোধে।

কয়রার মঠবাড়ি গ্রামের বনজীবী রমেন মণ্ডল বলেন, “পাসের টাকা, অন্যান্য খরচ, নানা খরচ দিয়ে গভীরে গিয়ে যে মাছ পাই, তাতে সংসার চলে না। তাই এ বছর আর জঙ্গলে যাইনি। মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে সংসার চালাচ্ছি।”

৬ নম্বর কয়রা গ্রামের জেলে রজব আলী বলেন, “সরকার যদি সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করত, তাহলে আমরা দাদনের ফাঁদ থেকে বাঁচতে পারতাম।”

আরেক জেলে আবু তালেব সরদারের ভাষ্য, আগের তুলনায় নদীতে মাছ কমেছে। বন বন্ধ থাকলে আয় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ঋণের ওপর নির্ভর করেই সংসার চালাতে হচ্ছে।

নারীরাও নামছেন জীবিকার কঠিন সংগ্রামে

পুরুষদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় উপকূলীয় নারীরাও ঘরের বাইরে এসে জীবিকার সংগ্রামে যুক্ত হচ্ছেন। কোথাও চিংড়ির পোনা সংগ্রহ, কোথাও হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা দিনমজুরির কাজ করছেন তারা।

লোনা পানিতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক নারী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। কিন্তু অভাবের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকেও তাদের সরে আসার সুযোগ নেই।

জীবিকার সন্ধানে বিদেশ, ফিরছেন সর্বস্বান্ত হয়ে

কৃষি ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের সংকট অনেক মানুষকে বিদেশমুখী করছে। সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হাফিজ ইসলাম সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে অবৈধভাবে ওমানে গিয়েছিলেন। সেখানে কাজ না পেয়ে জেল খেটে আট মাস পর তাকে দেশে ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে।

একই এলাকার মোজাহিদ ধারদেনা করে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। তিন মাসের মধ্যেই প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরে এখন কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম—ওকাপের তথ্য অনুযায়ী, লবণাক্ততার কারণে কৃষি ও স্থানীয় কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় উপকূলীয় মানুষের একটি বড় অংশ জীবিকার জন্য বিদেশে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।

বাড়ছে জলবায়ু উদ্বাস্তু

স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে মানুষ শেষ পর্যন্ত এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। গত দুই দশকে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে মানুষের অভিবাসন বেড়েছে।

গ্রামের দক্ষ কৃষক শহরে গিয়ে অনেক সময় তার কৃষিজ্ঞান কাজে লাগাতে পারেন না। বাধ্য হয়ে রিকশা চালানো, নির্মাণশ্রমিক কিংবা কম মজুরির বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। ফলে লবণাক্ততা শুধু জমি নয়, মানুষের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানও বদলে দিচ্ছে।

বন রক্ষা যেমন জরুরি, বনজীবীদের বাঁচানোও জরুরি

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, “সুন্দরবন যেমন আমাদের রক্ষা করা প্রয়োজন, তেমনি এত মানুষের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন। বনজীবীদের বিকল্প আয়ের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিকল্প পেশায় যুক্ত করার উদ্যোগ চলছে।”

সুন্দরবনকেন্দ্রিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের (আইসিডি) প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামান বলেন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, কাঁকড়া ও মাছ চাষ, মৌচাষসহ নানা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে একদিকে বনজীবীদের জীবনমান উন্নত হবে, অন্যদিকে সুন্দরবনের ওপর মানুষের চাপও কমবে।

সমাধান কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা।

লবণসহিষ্ণু ধান ও অন্যান্য ফসলের আবাদ বাড়ানো, চিংড়ি চাষের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ, মিঠা পানির সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, উপকূলীয় যুবকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, পরিবেশবান্ধব পর্যটন সম্প্রসারণ এবং বনজীবীদের জন্য সহজ শর্তে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

একই সঙ্গে সুন্দরবন সংরক্ষণ ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকা—এই দুই বিষয়কে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।

শেষ কথা

লবণাক্ততা আজ শুধু মাটির সংকট নয়—এটি একটি জীবিকার সংকট, খাদ্য নিরাপত্তার সংকট এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সংকট।

উপকূলের কৃষকের জমি যদি অনাবাদি হয়ে যায়, জেলের নদী যদি মাছশূন্য হয়ে পড়ে, বনজীবীর সুন্দরবনে যাওয়ার সুযোগ যদি সংকুচিত হয় আর স্থানীয়ভাবে যদি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়—তাহলে মানুষের সামনে পেশা বদল, শহরমুখী হওয়া কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন ছাড়া আর কী পথ থাকবে?

সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে সুন্দরবনের কোলঘেঁষে বসবাসকারী মানুষকেও বাঁচাতে হবে। কারণ বন ও মানুষ—দুজনের অস্তিত্বই পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। উপকূলের মানুষের জীবিকা রক্ষা মানেই শুধু একটি জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়