ইফতেখার আলম বিশাল, রাজশাহী প্রতিনিধি: দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারের আলোচিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’। প্রকৃত সুবিধাভোগী পরিবার শনাক্ত করতে তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ শুরুর আগেই এই কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ নিয়ে রাজশাহীতে দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক। জেলার কয়েকটি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে, রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব এবং যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। কয়েকটি উপজেলায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেছেন, কোথাও নিয়োগের ফল বাতিলের দাবি উঠেছে। আবার কোথাও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও রাজনৈতিক তদবিরের কারণে বাদ পড়ার অভিযোগ করেছেন প্রার্থীরা।
অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা বলছেন, নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকেও নিজেদের কর্মীদের ‘মূল্যায়ন’ করার দাবি ওঠায় পুরো প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রোববার গোদাগাড়ীতে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনে সমাবেশ শেষে তাঁরা ইউএনওর কার্যালয়ে গিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাই বাচাইয়ের দাবি জানান।
তানোরে ৯৬ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৯ জন সুপারভাইজার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর শুরু হয় নতুন বিতর্ক। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, নীতিমালা অনুসরণ না করে একটি পক্ষের প্রভাব ও সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সোমবার উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে তাঁরা তালিকা বাতিল ও পুনরায় স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবি জানান। একই সঙ্গে ইউএনও নাঈমা খানের অপসারণের দাবিও তোলা হয়। তবে তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করেই ফল প্রকাশ করা হয়েছে। কারও নিয়োগে অসংগতি পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাগমারাতেও একই ধরনের অভিযোগে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মঙ্গলবার মানববন্ধন করেন। এ সময় বক্তারা অভিযোগ করেন, ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ইউএনও ও সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলা হয়।
অভিযোগ অস্বীকার করে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে নীতিমালা অনুসরণ করে করা হয়েছে। এখানে পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই।
চারঘাটে নিয়োগ নিয়ে অভিযোগকারীরা প্রার্থীরা বলেন, লিখিত ও অন্যান্য ধাপ পেরিয়েও রাজনৈতিক তদবিরের কারণে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। উত্তীর্ণদের তালিকা প্রকাশের পর প্রশ্ন তোলেন পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক তদবির ছাড়া যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ও নিয়োগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি রাজশাহী মহিলা কলেজের এক অনার্স শিক্ষার্থীকে ঘিরে। তাঁকে মাদকাসক্ত আখ্যা দিয়ে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবারের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। চারঘাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাশেদুজ্জামান বলেন, গোয়েন্দা তদন্ত প্রতিবেদনে ওই শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত বলা হয়েছে।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমরা যথাযত প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নীতিমালা অনুসরন করেই নিয়োগ দিয়েছি। অবৈধভাবে কাউকে নিয়োগবঞ্চিত করা হয়নি। কেউ যদি ব্যাক্তিগত ভাবে কোনো অভিযোগ করে থাকে আমার জানা নেই। বাঘায় নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে বিতর্ক শুরু হয় পরীক্ষার সময় থেকেই। প্রার্থীদের একাংশ দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ ও সার্ভার জটিলতার অভিযোগ তোলেন। ফল প্রকাশের পর বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন। পরে ফলাফল স্থগিত ও আবেদনের সময় বাড়ানো হয় এবং ইউএনওকে বদলি করা হয়। তবে বাঘার ইউএনওকে বদলির সঙ্গে বিক্ষোভের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার। তাঁর বক্তব্য, বদলি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার ঘটনা একসঙ্গে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ এখন শুধু চাকরিপ্রার্থীদের বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। একদিকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্তদের নিয়োগের অভিযোগ করছেন, অন্যদিকে বিএনপি ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও নিজেদের কর্মীদের ‘মূল্যায়ন’ করার দাবি উঠছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগে কোনো দলের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় এলে কর্মসূচির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহীদুল ইসলাম বলেন, আমি বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি দেখেছি, আমাদের ইউএনওদেরকে নিয়োগের সম্পূর্ন নীতিমালা অনুসর করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারা সেটাই করছেন।
এখানে অনিয়ম করার সুযোগ নেই। তবে এই নিয়োগের আবেদন মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইনে করলে প্রক্রিয়াটা আরো সহজ হতো।