গুরুতর অপরাধ করে দেশ ছেড়ে পালানো কিংবা বিদেশ থেকে অপরাধ করে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে অপরাধীদের জন্য পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে থাকা কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত করা হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ক্যামেরার মাধ্যমে বিমানবন্দরে তার উপস্থিতি শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে সতর্কবার্তাও পাঠানো যাবে।
শুধু অপরাধী শনাক্ত করাই নয়, অবৈধ মালামাল, স্বর্ণ চোরাচালান এবং বিমানবন্দরে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড ঠেকাতেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারে এআই-চালিত সিসিটিভি, মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, ই-গেট, বডি স্ক্যানারসহ বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এর মধ্যে শাহজালাল দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়ায় এর নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিমানবন্দরের আগমন ও বহির্গমন টার্মিনাল, ইমিগ্রেশন কাউন্টার, বোর্ডিং ব্রিজ, কার্গো এলাকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপিত আধুনিক ক্যামেরাগুলো যাত্রীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করছে। মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্যামেরায় ধারণ করা মুখচ্ছবি সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে। কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে মিল পাওয়া গেলে দ্রুত নিরাপত্তাকর্মীদের বিষয়টি জানানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন নয়। বিমানবন্দরের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং ই-গেট ব্যবস্থাতেও জীবমিতিক তথ্য যাচাইয়ের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে যাত্রীর পরিচয় যাচাইয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে।
এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করা। কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ সময় সন্দেহজনকভাবে একই স্থানে অবস্থান করলে, অস্বাভাবিক গতিবিধি দেখা গেলে কিংবা বিমানবন্দরে পরিত্যক্ত কোনো বস্তু পড়ে থাকলে তা শনাক্ত করে নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক করার সক্ষমতা রয়েছে আধুনিক ভিডিও বিশ্লেষণ ব্যবস্থার। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচলের মধ্যেও সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়গুলো দ্রুত আলাদা করে নজরে আনা সম্ভব।
স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকাতেও বিমানবন্দরে প্রযুক্তিনির্ভর তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। চোরাকারবারিরা বিভিন্ন সময় লাগেজ, পোশাক কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশে স্বর্ণ লুকিয়ে পাচারের চেষ্টা করে। এ ধরনের চোরাচালান শনাক্তে বডি স্ক্যানারসহ বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ধাতব ও অন্যান্য সন্দেহজনক বস্তু শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী তল্লাশি চালানো সম্ভব।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বৈধভাবে স্বর্ণ বহনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। যাত্রীর সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার বা স্বর্ণবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিমালা অনুসরণ করতে হয়। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর তল্লাশি ও শুল্ক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৈধ বহন এবং চোরাচালানের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এভসেক নিরাপত্তা, বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত নজরদারির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে বিমানবন্দরের প্রবেশপথ, সংরক্ষিত এলাকা, টার্মিনাল ও অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থানে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
বেবিচকের নিরাপত্তা বিভাগের সদস্য এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল বলেন, বিমানবন্দরে কর্মরত সরকারি সংস্থাগুলো নিজস্ব অর্থায়নে আধুনিক প্রযুক্তি সংগ্রহ করে ব্যবহার করছে। পাশাপাশি বেবিচকের নিজস্ব এভসেক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সতর্ক রয়েছে। প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে গত দুই থেকে আড়াই বছরে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেন, অপরাধী ও চোরাকারবারিদের শনাক্ত করতে বিমানবন্দরে নিয়োজিত সংস্থাগুলো আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান ও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সূত্র: ইনকিলাব