দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে সেই ১২ উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্ত করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। গলার কাঁটা হিসেবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল্যবান অ্যাপ্রোন এলাকায় প্রায় ১০ বছর ধরে পড়ে আছে ১২টি পরিত্যক্ত বিমান (উড়োজাহাজ)। এগুলো এখন লোহালক্কড়ে পরিণত হয়েছে। বিমান হিসেবে বিক্রি করতে উপযুক্ত ক্রেতা না পাওয়ায় ওই উড়োজাহাজগুলো এখন ভাঙারি হিসেবে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেবিচক কর্তৃপক্ষ। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়
আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ভিত্তিমূল্য নির্ধারণে যা ব্যয় হবে উড়োজাহাজ বিক্রি করে তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় কোনো মূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামের অনুমোদন চেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বেবিচক। সংস্থাটির চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক গত ১৬ জুলাই চিঠিটি বিমান মন্ত্রণালয়ে পাঠান।
জানা গেছে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ৮টি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ২টি, জিএমজি এয়ারলাইন্স ও অ্যাঞ্জেল এয়ারওয়েজের একটিসহ ১২টি উড়োজাহাজ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো অ্যাপ্রোনে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। উড়োজাহাজগুলো প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট এলাকা দখল করে রেখেছে। এটি বিমানবন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল এলাকা।
এখান থেকেই কার্গো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। উড়োজাহাজ পার্কিংও করা হয়। ফলে নিয়মিত ও অনিয়মিত উড়োজাহাজ পার্কিংয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। রপ্তানি পণ্য ওঠানামাও ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি কার্গো পরিচালনায় চাপ বাড়ছে। বিমানবন্দরের সক্ষমতাও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অ্যাপ্রোনের মতো মূল্যবান জায়গা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে রপ্তানি কার্যক্রম বাড়লে এই সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করছেন বেবিচক কর্মকর্তারা।
১২ উড়োজাহাজের উড্ডয়নযোগ্যতার সনদের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে যায়। পরে প্রচলিত আইন অনুযায়ী উড়োজাহাজগুলোর নিবন্ধন বাতিল
করা হয়। নিবন্ধন বাতিলের পর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়।
ওই নোটিশে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়োজাহাজ অপসারণ না করলে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করা হবে। পরে এ বিষয়ে কোনো আপত্তি গ্রহণ করা হবে না। এরপর বিষয়টি সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত নেওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বন্ধক গ্রহণকারী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়।
সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৪ সালের ২৬ মে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করে বেবিচক। পরে জাতীয় দৈনিকে এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়। তবে বাজেয়াপ্ত করার পরও বিক্রির পথ সহজ হয়নি। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ।
বেবিচক এ কাজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সহযোগিতা চায়। কিন্তু দেশে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উড়োজাহাজ মূল্যায়নে সক্ষম কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে মূল্যায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তাতে যে ব্যয় হবে, তা সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বেবিচকের ধারণা, উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র হলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতামূলকভাবে অংশ নেবে। এতে বাজারভিত্তিক মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারের জন্য সর্বোচ্চ দর নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় উড়োজাহাজগুলোর বেশিরভাগ যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকগুলোয় মরিচা ধরেছে। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতারা এগুলো সচল উড়োজাহাজ হিসেবে নয়, বরং স্ক্র্যাপ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
বেবিচকের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিললে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হবে। নিলাম শেষে নির্বাচিত ক্রেতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দর এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান আমাদের সময়কে বলেন, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজ বিমানবন্দরের অপারেশন কাজ বাধাগ্রস্ত করছে। এগুলো ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই নিলামের জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের জন্য অনুমোদন চাওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ের কাছে। অনুমতি পেলে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এসব মূল্য নির্ধারণে যে ব্যয় হবে, বিক্রি করে সে টাকা পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। এগুলো এখন স্ক্র্যাপে (ভাঙারি) পরিণত হয়েছে।
বিমান খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল্যবান অ্যাপ্রোন দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত উড়োজাহাজে দখল হয়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে পরিচালন সক্ষমতা কমছে। ব্যাহত হচ্ছে কার্গো কার্যক্রম। একই সঙ্গে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
তাদের মতে, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে দ্রুত এ জটিলতার সমাধান করা প্রয়োজন। এতে একদিকে বিমানবন্দরের অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগানো যাবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।