শিরোনাম
◈ হবিগঞ্জ উত্তেজনা: ছাত্রদল সভাপতিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এনসিপির অভিযোগ ◈ জুলাইয়ের ২৮ দিনেই দেশে এলো ২৬২ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স ◈ সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া গ্রেপ্তার না দেখানোর নির্দেশ স্থগিত করল আপিল বিভাগ ◈ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর নিয়ে অধীর অপেক্ষায় ভারত: দীনেশ ত্রিবেদী ◈ জিম্বাবুয়ের কাছে হারের পর টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবনমন ◈ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ভূমিকম্প বিষয়ক প্রস্তুতি সভা ◈ ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ বোনকে হারানো তাহসিনের জীবনে আশার আলো, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হৃদয়ছোঁয়া সাক্ষাৎ ◈ সা‌কিব আল হাসা‌নের বি‌শ্লেষণ:  বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বলেই অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণশক্তির দল ◈ সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী গ্রেপ্তার ◈ শেষ ওভারে হৃদ‌য়ের ব‌্যা‌টিং ঝড়, জয় পেয়েছে সাকিবদের জাফনা কিংস

প্রকাশিত : ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৯:০৫ রাত
আপডেট : ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সুন্দরবনের বাঘ এখন নতুন হুমকিতে : শিকারির বন্দুক থেকে জীবাণুর আক্রমণ—অর্ধশতাব্দীর লড়াইয়ে বদলে গেছে সংকটের ধরন

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : একসময় সুন্দরবনের বাঘ ছিল শিকারিদের গৌরবের প্রতীক। বন্দুক কাঁধে নিয়ে বনে ঢুকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যা করে ফিরতেন তারা বীরের বেশে। বাঘের চামড়া, দাঁত ও নখ ছিল ট্রফি; আর শিকারিরা পেতেন সামাজিক মর্যাদা। সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য হলো—আজ আর বাঘের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু শিকারির গুলি নয়, বরং অদৃশ্য জীবাণু, পরিবেশ দূষণ, পরজীবী সংক্রমণ ও বাস্তুতান্ত্রিক সংকট।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে ঘিরে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা। গবেষণায় বাঘের শরীরে ১৫ ধরনের পরজীবী এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী চার ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু বাঘ নয়, পুরো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্যও সতর্কবার্তা।

বাঘ শিকারের গৌরব থেকে সংরক্ষণের যুগ

আড়াই দশকে ৯১ বাঘের মৃত্যু

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে।

এর মধ্যে—

  • চোরাশিকারি ও পাচারকারীদের হাতে নিহত ২৬টি
  • বনদস্যুদের হাতে নিহত ১৮টি
  • গ্রামবাসীর পিটুনিতে মারা গেছে ১৪টি
  • বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে ২১টির
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে ৩টি

বন কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

অন্যদিকে একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন ৪২৫ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৯৫ জন।

তবে আশার খবর হলো, ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে একটি বাঘও হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড হয়নি।

ফাঁদে ধরা বাঘিনী, ছয় মাস চিকিৎসা

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খাল এলাকায় শিকারিদের পেতে রাখা ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী।

গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বন বিভাগ। প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার পর গত ১২ জুলাই বাঘিনীটিকে আবারও বনে অবমুক্ত করা হয়।

অবমুক্তির পর তার চলাচল পর্যবেক্ষণে বনের প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপ ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

নতুন বিপদ: বাঘের শরীরে ১৫ ধরনের পরজীবী

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

‘সুন্দরবনের বাঘের পরজীবী সংক্রমণ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ’ শীর্ষক দুই বছরব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, বাঘের মলের ৮৫.৩ শতাংশ নমুনায় কোনো না কোনো পরজীবীর উপস্থিতি রয়েছে।

গবেষকরা বাঘের শরীরে ১৫ ধরনের পরজীবী শনাক্ত করেছেন।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে—

  • স্পিরোমেট্রা ম্যানসোনি (ফিতাকৃমি) — ৬০.৩%
  • টক্সোকারা ক্যাটি (গোলকৃমি) — ৪৩.৫%
  • ব্যালানটিডিয়াম কোলাই — ২৬.৭%
  • ইকাইনোককাস গ্রানুলোসাস — ১৬.৪%

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরজীবী বাঘের পরিপাকতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, চোখ, মস্তিষ্ক এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

ভয়ংকর তথ্য: অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ করছে না জীবাণু

গবেষণায় আরও শনাক্ত হয়েছে চার ধরনের ব্যাকটেরিয়া—

  • ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি
  • এসেরিচিয়া কোলাই (ই-কোলাই)
  • এন্টারোকক্কাস ফেকালিস
  • স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস

উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ব্যাকটেরিয়ার অনেকগুলোই প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী।

গবেষকদের মতে, বন্যপ্রাণী চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম বলেন, “টক্সোকারা ক্যাটি শাবক বাঘের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে কিছু পরজীবী প্রাণীর মস্তিষ্ক, চোখ ও মেরুদণ্ডেও আক্রমণ করতে পারে।”

গত শতাব্দীর পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত সুন্দরবনে বাঘ শিকার ছিল এক ধরনের বীরত্বের পরিচয়। বনজীবীদের নিরাপত্তার অজুহাতে বহু বাঘ হত্যা করা হয়েছে। তখন বাঘকে ‘মানুষখেকো’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তার প্রকৃত সংখ্যা বা বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা ছিল সীমিত।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন জারির মাধ্যমে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালের সংশোধিত আইনে বাঘ হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়। এরপর থেকে বন বিভাগ বাঘ সংরক্ষণে নিয়মিত অভিযান, নজরদারি ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করে।

মানুষ-বাঘ সংঘাতের রক্তাক্ত ইতিহাস

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে গত প্রায় আড়াই দশকে সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে চোরাশিকারি ও পাচারকারীদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যজনিত কারণে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা গেছে।

অন্যদিকে একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন ৪২৫ জন মানুষ এবং আহত হয়েছেন আরও ৯৫ জন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন এলাকায় মানুষ ও বাঘের সহাবস্থান ছিল সংঘাতপূর্ণ।

তবে আশার খবর হলো, ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যার ঘটনা বা মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। বন বিভাগ এটিকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে।

ফাঁদে ধরা বাঘিনী, ফিরে গেল বনে

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খাল এলাকায় শিকারিদের পেতে রাখা ছিটকা ফাঁদে একটি বাঘিনী আটকা পড়ে। বন বিভাগের সদস্যরা সেটিকে উদ্ধার করে দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রাখেন। পরে গত ১২ জুলাই বাঘিনীটিকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।

তার চলাচল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপ ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

অদৃশ্য শত্রুর সন্ধান

বাঘ সংরক্ষণে সবচেয়ে বড় নতুন উদ্বেগ এসেছে ‘সুন্দরবনের বাঘের পরজীবী সংক্রমণ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ, রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু ও সংক্রমণের ব্যাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা থেকে।

দুই বছরব্যাপী এই গবেষণার ফল গত মার্চে প্রকাশিত হয়। এতে দেখা গেছে, সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা বাঘের মলের ৮৫ দশমিক ৩ শতাংশ নমুনায় অন্তত একটি পরজীবীর উপস্থিতি রয়েছে।

শুধু বাঘ নয়, হরিণের ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ, বানরের ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বন্য শূকরের ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ নমুনাতেও পরজীবী শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, এটি সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাণিজগতের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

বাঘের শরীরে ১৫ ধরনের পরজীবী

গবেষণায় বাঘের শরীরে ১৫ প্রজাতির পরজীবী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে স্পিরোমেট্রা ম্যানসোনি নামের এক ধরনের ফিতাকৃমি, যার সংক্রমণের হার ৬০ দশমিক ৩ শতাংশ।

এ ছাড়া টক্সোকারা ক্যাটি নামের গোলকৃমি পাওয়া গেছে ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায়। ব্যালানটিডিয়াম কোলাই, ইকাইনোককাস গ্রানুলোসাস ও অ্যানসিলোস্টোমা প্রজাতির কৃমিও শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরজীবী প্রাণীর অন্ত্র, মস্তিষ্ক, চোখ ও মেরুদণ্ডে ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে বাঘশাবকদের জন্য কিছু সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিকেও কাজ হচ্ছে না

গবেষণায় আরও শনাক্ত হয়েছে ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি, এন্টারোকক্কাস ফেকালিস, এসেরিশিয়া কোলাই এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস নামের চার ধরনের ব্যাকটেরিয়া।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ব্যাকটেরিয়ার অনেকগুলোই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো বাঘ অসুস্থ হলে প্রচলিত ওষুধে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়তে পারে।

গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী গবেষণায় এ ধরনের তথ্য প্রথমবারের মতো উঠে এসেছে এবং এটি ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।

দূষিত পানির পথ ধরে বনে প্রবেশ

গবেষকদের মতে, নদী ও খালের মাধ্যমে বনের ভেতরে প্রবেশ করছে দূষণ ও জীবাণু।

হাসপাতালের বর্জ্য, মানুষের মল, অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ, নৌযান থেকে নির্গত বর্জ্য এবং বনসংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন দূষণ নদীপথে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে পৌঁছায়। এসব দূষিত উপাদান প্রথমে মাছ, হরিণ, বানর ও অন্যান্য প্রাণীর শরীরে সংক্রমিত হয়। পরে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা বাঘের শরীরে পৌঁছে যায়।
বন বিভাগের নজরদারি জোরদার, আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এ ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে বাঘের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা এবং বন অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে।

সম্প্রতি শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়া আহত একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে চিকিৎসা শেষে আবারও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুন্দরবনে অবমুক্ত করে দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নতুন ইতিহাস গড়েছে বন বিভাগ।

সুন্দরবন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান ভাণ্ডার এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শেষ নিরাপদ আবাসস্থল। এক সময় চোরাশিকার, বনভূমিতে মানুষের চাপ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং মানুষ-বাঘের সংঘাতের কারণে বাঘের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও গত কয়েক বছরে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি, চোরাশিকার প্রতিরোধে অভিযান, বনজীবীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আহত বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও চিকিৎসাসহ নানা উদ্যোগের ইতিবাচক ফল মিলতে শুরু করেছে।

এর প্রতিফলন দেখা গেছে সর্বশেষ বাঘ গণনায়। ২০১৮ সালের জরিপে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে ১১৪টি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৪ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপভিত্তিক সর্বশেষ জরিপে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫টিতে।

বন সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রমাণ নয়, বরং সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বাঘ সংরক্ষণে সরকার বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগের ফলে সুন্দরবনে বাঘের নিরাপত্তা আরও জোরদার হয়েছে।

তিনি জানান, সম্প্রতি শিকারিদের ফাঁদে আটকা পড়া আহত একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ করে আবারও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে চিকিৎসা শেষে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবন সুরক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ইতোমধ্যেই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত টহল এবং কঠোর নজরদারির ফলে সুন্দরবনের নিরাপত্তা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। এর ফলে মানুষ ও বাঘের মধ্যকার সংঘাতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে বাঘ মারা যাওয়া এবং পাচারের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বাঘের উপস্থিতি ও বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি বাঘের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত হওয়ার ইতিবাচক লক্ষণ।

বন বিশেষজ্ঞদের মতে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়; এটি সুন্দরবনের পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাঘ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত থাকবে।

বন বিভাগের ধারাবাহিক উদ্যোগ, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা ভবিষ্যতের জন্যও আশার বার্তা বহন করছে।

সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলার কাইনমারিতে বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে বনজীবী সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বক্তারা আরও বলেন, সুন্দরবন এবং তার প্রধান অলংকার বাঘকে রক্ষা করা আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। সুন্দরবনের সন্নিকটে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং খালে বিষ প্রয়োগের ফলে বাঘসহ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। বাঙালির প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের স্মারক বাঘকে আমরা কোনোভাবেই বিলুপ্ত হতে দিতে পারি না।

বনজীবী সমাবেশ ও মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন সুন্দরবনের জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সদস্য আব্দুর রশিদ হাওলাদার। সমাবেশ ও মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক পশুর রিভার ওয়াটারকিপার মো. নূর আলম শেখ।

এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সুন্দরবনের বনজীবী মো. জাহিদ, মো. শাহাদত, পশুর রিভার ওয়াটারকিপার ভলান্টিয়ার হেনা বেগম প্রমুখ।

সভাপতির বক্তব্যে জেলে সমিতির নেতা আব্দুর রশিদ হাওলাদার বলেন, বাঘ রক্ষায় বন বিভাগের ঘন ঘন টহল এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে চোরা শিকার কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ছাড়া বাঘের বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মনিটরিং এবং বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনের কার্যক্রম জোরদার করার দাবি জানান তিনি।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সালাউদ্দিনের মতে, সুন্দরবনের নদী-খালের দূষণ নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।

কুকুর থেকে ছড়াতে পারে নতুন মহামারি

গবেষণায় আশার বিষয় হলো, কোনো বাঘের শরীরে ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাস (সিডিভি) পাওয়া যায়নি। তবে বনসংলগ্ন গ্রামের ৫৬ শতাংশ কুকুরের শরীরে এই ভাইরাসের অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই ভাইরাস বাঘের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই বনসংলগ্ন এলাকার কুকুরকে টিকাদানের সুপারিশ করা হয়েছে।

বাঘ বাঁচাতে হরিণ বাঁচানো জরুরি

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, “বাঘ রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো হরিণ সংরক্ষণ। কারণ হরিণই বাঘের প্রধান খাদ্য। হরিণ শিকার বন্ধ না হলে বাঘের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।”

তার মতে, চোরাশিকার বন্ধ এবং খাদ্যশৃঙ্খল অক্ষুণ্ন রাখাই বাঘ সংরক্ষণের মূল চ্যালেঞ্জ।

বন বিভাগের উদ্যোগ

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকার বাঘ সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট প্যাট্রোলিং, ড্রোন নজরদারি, ফুট পেট্রোলিং এবং ট্র্যাপ ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে জাতীয় চিড়িয়াখানায় আয়োজিত র‍্যালি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বাঘ পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী এবং জীববৈচিত্র্যের অপরিহার্য অংশ। প্রায় ১০০ বছর আগে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় পাঁচ হাজারে নেমে এসেছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, বাঘের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এবং মানুষকে সচেতন করতে না পারলে ভবিষ্যতে এ প্রজাতি আরও সংকটে পড়বে।

তিনি জানান, বর্তমানে সুন্দরবনে ১২৪টি বাঘ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রায় ১৫টি এবং দেশের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় মিলিয়ে প্রায় ৫০টি বাঘ রয়েছে।

আন্দারমানিক টহল ফাঁড়িতে দেখা গেলো বাঘ

বাঘকে জাতীয় সম্পদ উল্লেখ করে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, এ প্রাণী সংরক্ষণে সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে বাঘ সম্পর্কে জানতে পারে এবং এর সংরক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে, সে লক্ষ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

বাঘ গণনায় বরাদ্দ বাজেট ও এ-সংক্রান্ত স্বচ্ছতা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাঘ গণনার বিষয়টি বন বিভাগের আওতাধীন। এটি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। বন বিভাগ তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার সঙ্গে এ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

অনুষ্ঠান শেষে প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার স্যুভেনির শপ উদ্বোধন করেন।

এ সময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ডা. মো. শাহীনুর আলম, কিউরেটর ডা. মো. হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া লোকালয়সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৭৫ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ, সুপেয় পানির পুকুর খনন, আশ্রয়স্থল উন্নয়ন এবং ভরাট নদী পুনঃখননের মতো কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপে সুন্দরবনে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে।

সামনে যে লড়াই

একসময় সুন্দরবনের বাঘকে বাঁচাতে লড়াই করতে হতো শিকারির বন্দুকের বিরুদ্ধে। আজ সেই লড়াই আরও জটিল। কারণ শত্রু এখন অদৃশ্য—জীবাণু, পরজীবী, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্যশৃঙ্খলের অবক্ষয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টহল বাড়িয়ে নয়, বরং দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং বনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করেই সুন্দরবনের বাঘকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।

কারণ সুন্দরবনের বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি পুরো বনজ বাস্তুতন্ত্রের রক্ষক, বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তার প্রতীক এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতিনিধি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়