এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার বাগেরহাট : বাবার মৃত্যুর শোক তখনও বুকের ভেতর তাজা। কবরের মাটিও শুকায়নি। স্বজনদের কান্না তখনও থামেনি। অথচ জীবনের নির্মম বাস্তবতা তাকে বসে থাকার সুযোগ দেয়নি। বাবার দাফন শেষ করে সেদিন রাতেই ছুটতে হয়েছে কর্মস্থলে। রাতভর দায়িত্ব পালন করেছেন ব্যাংকের এটিএম বুথে। পরদিন সকালে বসেছেন এইচএসসি পরীক্ষার হলে।
এ যেন কোনো চলচ্চিত্রের কাহিনি নয়; বাস্তব জীবনের এক হৃদয়স্পর্শী, বেদনাময় অথচ অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।
বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ এলাকার তরুণ ইসমাইল ইকন আজ দেশজুড়ে পরিচিত এক নাম। দায়িত্ববোধ, আত্মসম্মান, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নের প্রতি অটুট বিশ্বাসের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি।
বাবাকে হারানোর গভীর শোক বুকে নিয়েও তিনি থেমে যাননি। জীবনের কঠিনতম বাস্তবতার সামনে মাথা নত না করে পালন করেছেন কর্মস্থলের দায়িত্ব, আবার ভবিষ্যতের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে অংশ নিয়েছেন এইচএসসি পরীক্ষায়। তার এই সংগ্রামের গল্প প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আলোড়ন। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তার পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছেন।
হৃদরোগে বাবার মৃত্যু, শুরু হয় জীবনের কঠিন অধ্যায়
গত মঙ্গলবার সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ইসমাইল ইকনের বাবা ইসরাফিল দাড়িয়া। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মুহূর্তেই অনিশ্চয়তার অন্ধকার নেমে আসে পুরো পরিবারে।
একজন সন্তানের জন্য বাবার মৃত্যু জীবনের সবচেয়ে বড় শোকগুলোর একটি। কিন্তু সেই শোক প্রকাশেরও যেন সময় পাননি ইকন। বিকেলে বাবার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর রাতেই তাকে যেতে হয় কর্মস্থলে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথে কর্মরত ইকন সারারাত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ভোরের আলো ফুটতেই চলে যান সরকারি পিসি কলেজ কেন্দ্রে। সেখানে তিনি অংশ নেন চলমান এইচএসসি পরীক্ষায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সংগ্রামের গল্প
একজন তরুণের এই অসাধারণ সংগ্রামের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা।
অনেকে লিখেছেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও দায়িত্ব পালন করার এমন উদাহরণ বিরল। কেউ বলেছেন, ইসমাইল ইকনের গল্প বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক অনন্য শিক্ষা—প্রতিকূলতার মাঝেও স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা।
অসংখ্য মানুষ তার জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে উঠেছে সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার বার্তায়।
শিক্ষামন্ত্রীর নজরে আসে ইকনের গল্প
ইসমাইল ইকনের সংগ্রামের খবর পৌঁছে যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও।
বাগেরহাটের এই শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম ড. এহছানুল হক মিলন।
বুধবার রাতে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ফারহান ইশতিয়াক ইকনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, চলমান এইচএসসি পরীক্ষার সময় যাতে ইকনকে আর রাতের দায়িত্ব পালন করতে না হয়, সেজন্য শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় দ্রুত জরুরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
শুধু তা-ই নয়, এইচএসসি পরীক্ষা শেষে তার উচ্চশিক্ষার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
এই ঘোষণা যেন সংগ্রামী তরুণটির ভবিষ্যতের পথে নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে।
জেলা প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগ
বৃহস্পতিবার দুপুরে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন ইসমাইল ইকনকে নিজ কার্যালয়ে ডেকে নেন।
তিনি ইকনের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন, আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন এবং ভবিষ্যতেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মেজবাহ উদ্দিন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুন এবং ইকনের মামা উপস্থিত ছিলেন।
প্রশাসনের এই মানবিক উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।
কর্মীর পাশে দাঁড়ালো কৃষি ব্যাংক
ইকনের কর্মস্থল বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকও তার পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তরিকভাবে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ব্যাংকের বাগেরহাট আঞ্চলিক কার্যালয়ে তার হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে পূর্ণ বেতনে এক মাসের ছুটিও দেওয়া হয়েছে, যাতে তিনি পারিবারিক শোক কাটিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিতে পারেন।
খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. আবু হাশেম মিয়া বলেন, ইকনের বাবার মৃত্যুতে ব্যাংক পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলীর পক্ষ থেকে তাকে এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতেও কৃষি ব্যাংক ইকনের পাশে থাকবে।
দেশ-বিদেশ থেকে বাড়ছে সহযোগিতার হাত
শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, দেশ-বিদেশের বহু ব্যক্তি ও সংগঠনও ইসমাইল ইকনের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক সংগঠন তার শিক্ষা অব্যাহত রাখতে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেও তার খোঁজ নিয়েছেন এবং সহায়তার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
এই ভালোবাসা যেন প্রমাণ করেছে—মানবিকতা এখনো মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
‘আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ’
সহায়তা পাওয়ার পর আবেগঘন কণ্ঠে ইসমাইল ইকন বলেন,“বাবা মারা যাওয়ার পরে জীবনটা আরও কঠিন হয়ে গেছে। বাবার শোক, চাকরি ও পরীক্ষা—সব একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে। তবে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং দেশের অনেক বড় মানুষ আমার খোঁজ নিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন,“শিক্ষামন্ত্রীর পিএ আমাকে ফোন দিয়েছেন। জেলা প্রশাসক ডেকে নিয়ে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা দিয়েছেন, আবার এক মাসের পূর্ণ বেতনের ছুটিও দিয়েছেন। লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশনও পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। আমি সবার প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।”
এক তরুণ, এক সংগ্রাম, এক অনুপ্রেরণা
জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে অধিকাংশ মানুষ ভেঙে পড়ে। কিন্তু ইসমাইল ইকন ভেঙে পড়েননি। তিনি শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন, দায়িত্বকে সম্মান করেছেন এবং স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
তার গল্প কেবল একজন শিক্ষার্থীর গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের হাজারো সংগ্রামী তরুণের প্রতিচ্ছবি। এটি আত্মসম্মানের গল্প, দায়িত্ববোধের গল্প, পরিবারকে আগলে রাখার গল্প এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অবিচল লড়াইয়ের গল্প।
আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়েছে। কারণ মানুষ বুঝেছে—এ ধরনের স্বপ্নবান ও সংগ্রামী তরুণদের হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।
বাবার কবরের মাটি শুকানোর আগেই যে তরুণ কর্মস্থলে দাঁড়াতে পারে, পরীক্ষার হলে বসতে পারে, সে নিশ্চয়ই জীবনের আরও বড় বড় পরীক্ষাও জয় করবে।
আর সেই বিশ্বাস থেকেই আজ একটি দেশ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।