টানা ভারী বৃষ্টিতে কুমিল্লা নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বাসাবাড়ি ও হাসপাতাল চত্বরে পানি ঢুকে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। অনেককে নৌকায় চড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হয়েছে।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুমিল্লা জেনারেল (সদর) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের নিচতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। জরুরি বিভাগ এবং রোগীদের শয্যার নিচেও পানি জমে রয়েছে। কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নুর মোহাম্মদ বশির আহমেদ জানান, বাইরে থেকে বিপুল পরিমাণ পানি হাসপাতাল চত্বরে ঢুকেছে। তবে বিকল্প ব্যবস্থায় জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেলে পানি নেমে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মনোহরপুর, মহিলা কলেজ রোড, বাগানবাড়ি, দক্ষিণ চর্থা, জিলা স্কুল সড়ক, পুলিশ লাইনস, রেসকোর্স, উত্তর রেসকোর্স, ঠাকুরপাড়া, বিসিক শিল্পনগরী, গোবিন্দপুর, মুরাদপুর এবং শহরতলীর ছায়াবিতান এলাকা। বিভিন্ন বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নিচু স্থাপনায় পানি ঢুকে পড়েছে। ড্রেন উপচে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি সড়কে ছড়িয়ে পড়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
টানা বর্ষণে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি ছিল সবচেয়ে বেশি। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেকেই সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভেতরে পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে নৌকার ব্যবস্থা করা হয়। অনেক শিক্ষার্থীকে নৌকায় করে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা গেছে।
মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী তাছলিমা আক্তার বলেন, এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরীক্ষা স্থগিত রাখা উচিত ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে এবং জলাবদ্ধতার মধ্যে কষ্ট করে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। অনেক পরীক্ষার্থী ভেজা কাপড়ে পরীক্ষা দিয়েছে, কেউ কেউ পানিতে ডুবে থাকা সড়কে পড়ে গেছেন বলেও জানান তিনি।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আহসান পারভেজ বলেন, বোর্ডের অধীন ছয় জেলায় ভারী বর্ষণের কারণে বিভিন্ন কেন্দ্রের সামনে ও সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে কোনো কেন্দ্রের পরীক্ষার কক্ষে পানি ঢোকেনি। জলাবদ্ধতার কারণে বিলম্বে কেন্দ্রে পৌঁছানো পরীক্ষার্থীদের বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে কেন্দ্রসচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল বাসার জানান, এ কেন্দ্রে আটটি কলেজের প্রায় ২ হাজার ১০০ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। মাঠে পানি জমলেও পরীক্ষার কক্ষের ভেতর পানি ঢোকেনি। দেরিতে আসা পরীক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দেওয়ার নির্দেশনা বোর্ড থেকে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে জলাবদ্ধতার সুযোগে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভাড়া দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন চালকেরা। অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।
কুমিল্লা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় মোট ১৩৮ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় হয়েছে ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি। দিনভর আরও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু জানান, পরীক্ষা শুরুর আগ থেকেই তিনি সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে অবস্থান করে পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে প্রবেশ নিশ্চিত করার কাজ তদারকি করেছেন। একই সঙ্গে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কাজ করছেন বলেও তিনি জানান।