শাহাজাদা এমরান, কুমিল্লা : বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির কথা উঠলেই সবার আগে যে নামটি আসে, তা হলো কুমিল্লার রসমালাই। প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহ্য বহনকারী এই মিষ্টান্ন শুধু দেশের মানুষের কাছেই নয়, বিদেশি অতিথিদের কাছেও সমাদৃত। কুমিল্লার রসমালাই ইতোমধ্যে জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ঐতিহ্যকে পুঁজি করে এখন ব্যাপক প্রতারণা চলছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ কুমিল্লার বিভিন্ন সড়ক ও বাজারে আসল রসমালাইয়ের নামে বিক্রি হচ্ছে নিম্নমানের ও নকল পণ্য। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের ১০৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রায় ৭৭টি দোকান বিভিন্ন নামে রসমালাই বিক্রি করছে। এর অধিকাংশই আসল প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করছে।
কুমিল্লার রসমালাইয়ের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৩০ সালে। নগরীর মনোহরপুর এলাকার ঘোষ সম্প্রদায় প্রথম ক্ষীর ও ছানার সমন্বয়ে এই মিষ্টি তৈরি করে। পরে মাতৃভান্ডার, শীতল ভান্ডার, ভগবতী ভান্ডারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রসমালাই উৎপাদন করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। একসময় বঙ্গভবন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এবং বিদেশি অতিথি আপ্যায়নেও কুমিল্লার রসমালাই ছিল বিশেষ আকর্ষণ।
বর্তমানে মনোহরপুরের কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ছাড়াও মুরাদনগরের যাত্রাপুর, মিয়ামি হোটেল, হাইওয়ে ইন হোটেল এবং দাউদকান্দির গৌরীপুর এলাকায় মানসম্পন্ন রসমালাই তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের খ্যাতিকে ব্যবহার করে অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল রসমালাইয়ের বাজার গড়ে তুলেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আলেখারচর এলাকায় মাত্র দুই কিলোমিটারের মধ্যে ‘আদি মাতৃভান্ডার’, ‘নিউ মাতৃভান্ডার’, ‘প্রসিদ্ধ মাতৃভান্ডার’সহ নানা নামে ডজনখানেক দোকান রয়েছে। বাহারি সাইনবোর্ড ও কম দামের প্রলোভনে অনেক ক্রেতা এসব দোকান থেকে রসমালাই কিনছেন। পরে স্বাদ ও মানের পার্থক্য বুঝতে পেরে হতাশ হচ্ছেন তারা।
ঢাকা থেকে নোয়াখালীগামী যাত্রী আজমল হক বলেন, কুমিল্লার উপর দিয়ে যাওয়ার সময় রসমালাই না কিনে যাওয়া যায় না। কিন্তু এখন মহাসড়কের পাশে আসল রসমালাই পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। আসল রসমালাইয়ের স্বাদ একেবারেই ভিন্ন।
কুমিল্লার প্রকৃত মাতৃভান্ডারের ব্যবস্থাপক তমাল সাহার বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোনো রীতি ও মান বজায় রেখে সীমিত পরিসরে রসমালাই উৎপাদন করছে। গুণগত মানের কারণেই ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে বাজারে মাতৃভান্ডারের নাম ব্যবহার করে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ রসমালাই নকল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নকল রসমালাইয়ের এই বিস্তার শুধু ক্রেতাদের প্রতারণার শিকার করছে না, বরং কুমিল্লার শত বছরের ঐতিহ্য ও সুনামকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। মানহীন পণ্যের কারণে আসল রসমালাইয়ের স্বাদ ও পরিচিতি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, কুমিল্লার রসমালাইয়ের গুণগত মান ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসন কাজ করছে। নকল রসমালাই উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর মতে, এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে প্রশাসন, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে নাগরিক অধিকার ফোরাম কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক শাহাজাদা এমরান বলেন, “কুমিল্লার রসমালাই শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি জেলার ঐতিহ্য ও সুনামের প্রতীক। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে আজ এই ঐতিহ্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মহাসড়কের পাশে ও বিভিন্ন বাজারে নকল রসমালাই বিক্রি করে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা হচ্ছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে আসল উৎপাদকদের স্বার্থ ও কুমিল্লার ঐতিহ্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
কুমিল্লার রসমালাই শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি জেলার ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। তাই নকলের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে আসল রসমালাইয়ের মান ও সুনাম রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।