ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ৫ বছর বয়সী শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর নদীতে ফেলে হত্যার ঘটনায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন গ্রেপ্তার দুই যুবক। ধর্ষণের পর শিশুটি জীবিত থাকলেও প্রমাণ লোপাট করতে শিশুটিকে কংস নদে ডুবিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে অভিযুক্তরা।
মঙ্গলবার বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ময়মনসিংহের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক তনয় সাহার কাছে তারা অপরাধের দায় স্বীকার করেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
স্বীকারোক্তি দেওয়া দুই আসামি হলেন—ধোবাউড়া উপজেলার আরিফ মিয়া (১৯) ও রাকিব মিয়া (২১)। বুধবার বেলা ৩টার দিকে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ধর্ষণের পর জীবিত ছিল ভিকটিম, মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় পানিতে চুবিয়ে
পুলিশ সুপার জানান, জবানবন্দিতে আসামিরা স্বীকার করেছে যে তারা চারজন মিলে ওই শিশুকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর শিশুটি নিস্তেজ হলেও জীবিত ছিল। পরে প্রমাণ লোপাট ও মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাকে কংস নদের পানিতে চুবিয়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বিকেলে স্থানীয় বাজার থেকে চিপস কিনে বাড়ি ফিরছিল শিশুটি। পথে মাগরিবের আজানের আগে চার তরুণ কদম ফুল দেওয়ার কথা বলে তাকে কৌশলে কংস নদের পাড়ের জঙ্গলঘেরা নির্জন এলাকায় নিয়ে যায় এবং পাশবিক নির্যাতন চালায়।
গত ১৪ জুন রাত ৯টার দিকে টাঙ্গাহাটি মধ্যপাড়া গ্রাম সংলগ্ন নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে স্বাভাবিক মৃত্যু ভেবে পরিবার দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে দাফনের আগে গোসলের সময় শিশুর শরীরে ক্ষতচিহ্ন দেখে ধোবাউড়া থানায় খবর দেওয়া হয়। পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
পরে সোমবার রাতে নিহতের বাবা বাদী হয়ে ধোবাউড়া থানায় একটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলা দায়ের করেন। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তার পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত চার আসামিকেই গ্রেপ্তার করে। বাকি দুই আসামি মারুফ মিয়া (১৯) ও সিয়াম মিয়া (১৮)-কে বুধবার দুপুরে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার আশ্বাস পুলিশ সুপারের
ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদনে জোরপূর্বক নির্যাতন ও হত্যার স্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এই মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হবে।
ধোবাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বুধবার সন্ধ্যায় জানান, গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে দু’জন আদালতে দোষ স্বীকার করেছে এবং বাকি দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এক মাসের মধ্যে বিচারের দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন
এদিকে শিশুটিকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ধোবাউড়ার সর্বস্তরের মানুষ। এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও ফাঁসির দাবিতে বুধবার বিকেল ৪টায় গোয়াতলার রঘুরামপুর বাজারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রঘুরামপুর গ্রামের সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ভুক্তভোগীর বাবা ও দাদা উপস্থিত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিচার প্রার্থনা করেন। মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই নৃশংসতা সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মামলাটি অবিলম্বে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে খুনিদের ফাঁসি কার্যকরের জোর দাবি জানান।
পরিবারের পাশে প্রিন্স, আইনমন্ত্রীর আশ্বাস
এদিকে বুধবার বিকেলে নিহত শিশুর বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। পরে তিনি শিশুটির কবর জিয়ারত করেন।
এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রিন্স বলেন, ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে তিনি গতকালই আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। উৎস: সমকাল।