শিরোনাম
◈ অনলাইন বিজ্ঞাপনের আড়ালে ইসরায়েলের বিশ্বজুড়ে নজরদারি, বাদ যায়নি পেন্টাগন-ন্যাটো-জাতিসংঘও ◈ ল্যাবে তৈরি ভয়ংকর মাদক ‘কুশের’ ভয়ংকর বিস্তার, আসক্ত হচ্ছে শিক্ষিত তরুণরা ◈ সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী, পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের নির্দেশ ◈ দেশভাগের ৭৯ বছর পর ব্রহ্মপুত্র দিয়ে বাংলাদেশে পণ্য পাঠাল ভারত ◈ জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হতে যাচ্ছে ভারত: আইএমএফ ◈ ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড, হাসপাতালে ভর্তি ১,৯৪৩ ◈ মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী বিনা খরচে নিয়োগ, অনুমোদন পাচ্ছে ৩৩৮ এজেন ◈ সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচন: শুক্রবার থেকে মনোনয়ন ফরম বিতরণ করবে বিএনপি ◈ কৃষিকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে হবে, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের আহ্বান রাষ্ট্রপতির ◈ গাজীপুরে স্বামীকে পাশের ঘরে আটকে গার্মেন্টসকর্মীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ

প্রকাশিত : ০৭ জুন, ২০২৬, ০৭:৪৯ বিকাল
আপডেট : ২২ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দুই যুগ পর প্রাণ ফিরে পেল সুন্দরবনের আড়ুয়াবেড় ও খড়মা খাল, জোয়ার-ভাটার স্রোতে উচ্ছ্বসিত জেলে-মৎস্যজীবী

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন-এর পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পর আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া আড়ুয়াবেড় ও খড়মা খাল পুনঃখননের ফলে সেখানে আবার শুরু হয়েছে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ। খালের বুকে ফিরেছে পানির স্পন্দন, আর সেই সঙ্গে নতুন আশার আলো দেখছেন সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজারো জেলে, মৎস্যজীবী ও বনজীবী মানুষ।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা উপজেলার ধানসাগর ইউনিয়নের রাজাপুর সংলগ্ন এই খাল দুটি একসময় ছিল খরস্রোতা জলপথ। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে সেগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে সরু নালায় পরিণত হয়। ফলে বন্ধ হয়ে যায় নৌযান চলাচল, ব্যাহত হয় জেলে-মৎস্যজীবীদের যাতায়াত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশগত ভারসাম্য।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নে ‘সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প’-এর আওতায় প্রায় এক বছরব্যাপী খননকাজ শেষে খাল দুটি নতুন জীবন পেয়েছে। প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন হওয়া এই প্রকল্প এখন স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবিদদের কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই দশক আগে পলি জমে ভরাট হয়ে যায় সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর ফরেস্ট স্টেশন সংলগ্ন আড়ুয়াবেড় খাল এবং সংযোগকারী খড়মা খাল। জোয়ার-ভাটার প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাল দুটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ফলে জেলে ও মৎস্যজীবীদের শেলা নদীতে মাছ ধরতে যেতে নৌপথের পরিবর্তে বনভূমির ভেতর দিয়ে ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হতো।

Advertisement

স্থানীয় জেলে রুবেল হাওলাদার, মালেক ব্যাপারী, আব্দুস সোবহান ও মৌয়ালী খলিল হাওলাদার জানান, একসময় এই খাল দিয়েই তারা সহজে মাছ ধরতে যেতেন। কিন্তু খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার পর বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হতো।

তারা বলেন, “খাল দুটি পুনঃখননের ফলে আবার জোয়ার-ভাটার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এখন আমরা আগের মতো সহজেই নৌকা ও ট্রলার নিয়ে নদী-খালে মাছ ধরতে যেতে পারব। এতে সময়, শ্রম ও ঝুঁকি—সবই কমবে।”

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বাগেরহাটের নবাগত নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল জানান, সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় পূর্ব সুন্দরবনের ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আড়ুয়াবেড় খাল এবং ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ খড়মা খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। আড়ুয়াবেড় খাল ধানসাগর স্টেশন এলাকা থেকে শুরু হয়ে শেলা নদীতে মিশেছে এবং খড়মা খাল জিউধারার বড়ইতলা এলাকা থেকে শেলা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে।

তিনি বলেন, “খাল দুটি পুনঃখননে প্রায় এক বছর সময় লেগেছে এবং এতে মোট ১২ কোটি ৭৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবনের অভ্যন্তরে জলপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা।”

পরিবেশবিদদের মতে, এই পুনঃখনন শুধু জেলে-মৎস্যজীবীদের জন্যই নয়, বরং পুরো সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। খালগুলোতে সার্বক্ষণিক পানি প্রবাহ থাকলে শুষ্ক মৌসুমে বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে পানির তীব্র স্রোতের কারণে বাঘ, বন্য শূকরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে প্রবেশের প্রবণতাও হ্রাস পাবে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “দুই যুগ ধরে ভরাট হয়ে থাকা আড়ুয়াবেড় ও খড়মা খালের মুখ গত ৯ মে খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে প্রবল বেগে জোয়ার-ভাটার স্রোত বইছে। এতে একদিকে যেমন জেলে-মৎস্যজীবীদের দুর্ভোগ কমেছে, অন্যদিকে বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে প্রবেশের পথও অনেকাংশে রুদ্ধ হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “নদী ও খালে সার্বক্ষণিক পানি থাকার কারণে সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে। দীর্ঘদিন পর সুন্দরবনের এই অংশে প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে এসেছে।”

প্রকৃতি, মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের সহাবস্থানের অনন্য উদাহরণ সুন্দরবনে আড়ুয়াবেড় ও খড়মা খালের পুনর্জাগরণ কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা নয়; এটি পরিবেশ সংরক্ষণ, জীবিকা রক্ষা এবং বনাঞ্চলের টেকসই ব্যবস্থাপনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর খাল দুটির বুকজুড়ে আবার বইতে শুরু করেছে জোয়ার-ভাটার প্রাণস্পন্দন, আর সেই স্রোতের সঙ্গে ফিরেছে সুন্দরবনের এক হারিয়ে যাওয়া জীবনধারা।

  • সর্বশেষ