রাজধানীর মহাখালী বাসটার্মিনাল ও আশপাশের এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে পূর্বাচলের অস্থায়ী বাস ডিপো। মহাখালীতে অলস পড়ে থাকা দূরপাল্লার বাসগুলো এখন স্বেচ্ছায় পূর্বাচল উপশহরের গুতিয়াব এলাকার ৩ নম্বর সেক্টরের এই ডিপোতে নেওয়া হচ্ছে। পরিবহন মালিক ও চালকদের ব্যাপক সাড়ার ফলে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে সরকারের এই উদ্যোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহাখালী আন্তঃজেলা বাসটার্মিনাল ঢাকার তিনটি প্রধান আন্তঃজেলা বাসটার্মিনালের একটি। এটি ১৯৮৪ সালে চালু হয়। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর বাস চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই টার্মিনাল। টার্মিনালের ধারণক্ষমতা প্রায় ২০০টি বাস। কিন্তু এর বাইরে আরও শত শত বাস টার্মিনালের সামনের রাস্তায় পার্কিং করে রাখা হয়। ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।
রাজধানীর মহাখালী বাসটার্মিনালের দীর্ঘদিনের এই যানজট কমাতে চলতি বছরের ১৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে টার্মিনাল স্থানান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। মহাখালী থেকে বাসগুলো সরিয়ে নেওয়া হয় পূর্বাচলের ৩ নম্বর সেক্টরের অস্থায়ী ডিপোতে। প্রত্যাশা নিয়ে চালু করা হয় পূর্বাচলের অস্থায়ী বাস ডিপো।
পরিকল্পনা করা হয়, দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসগুলো নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে পূর্বাচলের এই ডিপোতে অবস্থান করবে। পরে সিরিয়াল অনুযায়ী মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওয়ানা হবে। এতে মহাখালী এলাকায় অপ্রয়োজনীয় বাসের অবস্থান কমবে। ফলে যানজটও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
কিন্তু উদ্বোধনের পর প্রায় এক থেকে দেড়মাস পর্যন্ত দৃশ্যমান তেমন কোনো সুফল মেলেনি। এরই মধ্যে কর্তৃপক্ষ পূর্বাচল ডিপোতে গাড়ির স্টাফদের জন্য বিশ্রামাগার, গোসল, টয়লেট, খাবারের সুব্যবস্থা, নিরাপত্তা জোরদারসহ ডিপোটি সচল রাখতে ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি করে। ফলে গতমাস থেকে ডিপোতে গাড়ির যাতায়াত বাড়তে থাকে। এখন প্রতিদিন গড়ে ১৫০-২০০টি গাড়ি এই ডিপোতে আসছে।
পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপো ঘুরে দেখা যায়, দেশের প্রত্যন্ত জনপদ ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরে চলাচলকারী গাড়ি সাথী এন্টারপ্রাইজ, জমজম ট্রাভলস, শাহ ফতেআলী, এনা, কাজী পরিবহন, শ্যামলী বাংলা, পাহাড়ি ট্রাভেলস, বিলাস এসি, নাহিদ এন্টারপ্রাইজ, বিনিময়, ইকবাল পরিবহন, সাভার পরিবহন লিমিটেড, দিশারী পরিবহন সার্ভিস, সৌখিন সিটিং সার্ভিস, গ্রীন বাংলা এসি সার্ভিস, হাজী ট্রাভেল, পিংকি পরিবহনসহ বিভিন্ন পরিবহনের শতাধিক বাস সেখানে অবস্থান করছে।
ডিপোর ভেতরে কর্মচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। পূর্বদিকে রয়েছে বডিমিস্ত্রি, ইঞ্জিন মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, ওয়্যারিং মিস্ত্রি, পাত মিস্ত্রিসহ প্রয়োজনীয় সব ওয়ার্কশপ। এখানে পুরোদমে চলছে কর্মযজ্ঞ। কোনো গাড়ির ইঞ্জিনের কাজ করা হচ্ছে, কোনোটার বডি মেরামত হচ্ছে আবার রং করা হচ্ছে কোনো কোনো গাড়িতে। কোনোটির ভাঙা গ্লাস খুলে নতুন গ্লাস স্থাপন করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চায়ের দোকানি হিরণ মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিপোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় আমার বাড়ি। এটি উদ্বোধনের সময় থেকেই এখানে আমি দোকানদারি করছি। প্রথম দিকে এক থেকে দেড়মাস অল্প কিছু গাড়ি এখানে আসতো। তবে সেপ্টেম্বরে গাড়ি যাতায়াতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন ডিপো পুরোদমে জমজমাট। আমার বেচাবিক্রিও ভালো হচ্ছে।’
শাহ ফতেআলী এন্টারপ্রাইজের চালক রানু হোসেন বলেন, ‘প্রথমদিকে এখানে এসে ভালো লাগতো না। গোসলখানা, টয়লেটসহ খাবারের সমস্যা ছিল। বর্তমানে এ সমস্যা প্রায়ই সমাধান হয়ে গেছে। মহাখালীতে আমাদের কোনো বিশ্রামাগার ছিল না। এখানে আমাদের স্টাফদের জন্য বিশ্রামাগার রয়েছে। পূর্বাচল বাস ডিপোতে এসে আমরা বেশ সুবিধা পাচ্ছি।’
লিটন মন্ডল নামে আরেক চালক বলেন, ‘মহাখালী বাসটার্মিনালে নানামুখী সমস্যা। ওখানে ঢুকতে সমস্যা। জায়গা কম কিন্তু গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি। রাস্তায় জ্যাম বেধে যায়। পুলিশ নাজেহাল করে। গাড়িতে কোনো জিনিসপত্র ঠিকমতো রাখতে পারি না। কয়েকদিন আগে গ্লাস খুলে ভেতরে ডুকে সুপারভাইজার আর আমার মিলে বেশ কিছু টাকা ও মোবাইলসহ চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু পূর্বাচল ডিপোতে অনেক ভালো ও সুন্দর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে গতকালকের নাইটে এসেছি, এখন পর্যন্ত একবারও গাড়ি স্টার্ট করতে হয়নি। এটা মহাখালী টার্মিনাল হলে অন্তত ৫০ বার গাড়ি এদিক সেদিক নেওয়া লাগতো।’
শাহ ফতেআলী এন্টারপ্রাইজের সুপারভাইজার খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে যাত্রী নামিয়ে আমরা পূর্বাচল ডিপোতে চলে আসি। এখানে যানজট নেই, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাও রয়েছে। কোনো অতিরিক্ত খরচ নেই। প্রশাসন আমাদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা দিচ্ছে। এখানে টয়লেট এবং গোসল করতে কোনো টাকা লাগে না।’
তবে এখনো কিছু সমস্যা রয়ে গেছে বলে জানান তিনি। খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেলে বিশ্রামাগারের স্টাফদের সংকুলান হয় না। টয়লেট ও গোসলখানার সংখ্যা তুলনামূলক কম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার একটু সমস্যা রয়েছে। এসব দিকে আরেকটু নজর দিলে গাড়ির সংখ্যা আরও বাড়বে।’
ঢাকা জেলা বাস মিনিবাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সহসভাপতি ইউসুফ মির্জা। আলাপকালে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মহাখালী বাসটার্মিনাল এলাকায় রাস্তায় কোনো গাড়ি না থাকার লক্ষ্যে সরকার পূর্বাচলে বাস ডিপো তৈরি করে দিয়েছে। প্রথম দিকে কিছু সমস্যা ছিল। কিন্তু গতমাস থেকে মহাখালীর বেশিরভাগ গাড়ি পূর্বাচল ডিপোতে যাতায়াত করছে। বর্তমানে প্রতিদিন দেড়শ থেকে দুশো গাড়ি পূর্বাচলে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘মহাখালী এলাকায়ও আমরা এর সুফল লক্ষ্য করছি। এখানে যানবাহনের গিরিঞ্জি (জট) পরিবেশটা অনেকটাই কমেছে। পূর্বাচলে সবসময় ৮০-৯০টি গাড়ি থাকে। যে গাড়িগুলো সকালে আসে আবার বিকেলে ট্রিপ নিয়ে যায়, ওই গাড়িগুলো আমরা পূর্বাচল ডিপোতে পাঠিয়ে দেই। এখন আমরা রাস্তায় কোনো গাড়ি রাখতে দেই না। মহাখালী টার্মিনাল এখন ফাঁকা।’
‘যে গাড়িগুলো দুই থেকে তিন ঘণ্টার ভেতরে ট্রিপে চলে যাবে, সেই গাড়িগুলো শুধু মহাখালী টার্মিনালে থাকবে। অপেক্ষমাণ গাড়িগুলো বর্তমানে পূর্বাচল ডিপোতে রাখা হচ্ছে।’
ডিপোতে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের টিএসআই নুর আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আজ ১৫১টি গাড়ি এসেছে। এছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্কশপের কাজে আসা ও ডাম্পিংসহ দুই শতাধিক গাড়ি ছিল। বেশ কিছু গাড়ি ট্রিপে যাওয়ার পরও এখনো এখানে ৭৬টি গাড়ি রয়েছে।’
পূর্বাচল ডিপোর দায়িত্বরত পুলিশ ইনচার্জ এসআই মাসুদ রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘গতমাস থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫০-২০০ গাড়ি এখানে যাতায়াত করছে। আশা করছি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির সংখ্যা আরও বাড়বে।পুলিশ এখানে আসা গাড়ি এবং স্টাফসহ ডিপোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে।’
সূত্র: জাগো নিউস ২৪