দেশের বাণিজ্যিক এভিয়েশন বা বিমান চলাচল শিল্প—এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ বহর সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঢাকা বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনালের বিশাল ধারণক্ষমতাকে কাজে লাগাতে, চারটি দেশীয় এয়ারলাইন ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের সম্মিলিত বহর ৭৮.৪ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।
এয়ারলাইন্সগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও তিনটি বেসরকারি অপারেটরের সম্মিলিত বহর বর্তমানে ৫১টি থেকে বেড়ে ২০২৭ সালের মধ্যে ৯১টিতে দাঁড়াবে। আর এই সম্প্রসারণের মূল চালিকাশক্তি হলো ইজারায় (লিজ) নেওয়া ৪০টি নতুন উড়োজাহাজ।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, এয়ার অ্যাস্ট্রা এবং নভোএয়ারের এই একযোগে সম্প্রসারণের লক্ষ্য হলো হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়নকে কাজে লাগানো। যদিও বিমানবন্দরের বিদ্যমান টার্মিনাল বার্ষিক ৮০ লাখ যাত্রী সেবা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, তবে যাত্রীচাপ বাড়ায় এটি ২০২৫ সালে ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রীকে সেবা দিয়েছে—যা ২০২৪ সালে ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৩ সালে ছিল ১.১৭ কোটি।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে উদ্বোধন হতে যাওয়া তৃতীয় টার্মিনালটি— বছরে আরও ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ অতিরিক্ত যাত্রী এবং প্রায় ৫ লাখ টন কার্গো বা পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা যোগ করবে।
ধারণক্ষমতার ঘাটতি পূরণ
বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর কাছে হারানো বাজার অংশীদারিত্ব ফিরে পেতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো এই আগ্রাসী সম্প্রসারণ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বর্তমানে দেশে ৩৮টি বিদেশি বিমান সংস্থা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও—আন্তর্জাতিক রুটের প্রায় ৬৫ শতাংশ যাত্রীবাজার তাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
এভিয়েশন বিশ্লেষক এবং বিমানের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম উল্লেখ করেন, ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ)-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে ঢাকা হয়ে যাত্রী চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে আড়াই কোটিতে পৌঁছাতে পারে। ওয়াহিদুল আলম বলেন, "এই পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজের বহর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আকারে নিয়ে যাওয়া, এখন সম্পূর্ণভাবে একটি বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তা।"
এই চাহিদা মেটাতে দেশীয় অপারেটররা বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, বোয়িং ৭৭৭, বোয়িং ৭৩৭-৮ এবং এটিআর ৭২-৬০০ টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজের সংমিশ্রণ নিয়ে আসছে। তাদের এই নেটওয়ার্ক কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো– দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের রুটগুলো।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এই সম্প্রসারণকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়লে এভিয়েশন খাতের রাজস্ব বাড়বে, প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং সেবার মান উন্নত হবে।
মেগা ক্রয়ের আগে ১০টি বিমান ইজারা নিচ্ছে বিমান
রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের বর্তমান বহর ৫২.৬ শতাংশ বাড়িয়ে ২৯টিতে উন্নীত করার জন্য ১০টি উড়োজাহাজ ইজারা বা লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
২০৩০ সালের পর নতুন তৈরি উড়োজাহাজ হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত— অন্তর্বর্তীকালীন শূন্যতা পূরণ করতে লিজের উড়োজাহাজের ওপর নির্ভর করছে বিমান। এটি ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয়ে বিমানের প্রস্তাবিত ৩৭০ কোটি ডলারের মেগা চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে—রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি ইতোমধ্যে ছয় বছরের জন্য তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ড্রাই লিজ নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক বা কনসালট্যান্ট নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে; যেখানে প্রায় ৪০টি আবেদন থেকে একটি যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করা হবে, যারা পুরো ইজারা প্রক্রিয়াটি তদারকি করবে।
প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত বলেন, "আমরা নিশ্চিত করতে চাই, বিমানের ইজারা প্রক্রিয়াটি যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন হয়। সেই লক্ষ্যে, আমরা একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছি।" বিমানের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বিমান ২২টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে এবং পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
আঞ্চলিক ও দীর্ঘ দূরত্বের রুটে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা
ইতোমধ্যেই ২৫টি উড়োজাহাজ নিয়ে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বিমান সংস্থা হিসেবে অবস্থান তৈরি করা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স লিজের মাধ্যমে আরও ২১টি বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে, যা দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম বেসরকারি বহর ক্রয়ের উদ্যোগ। এর মাধ্যমে তাদের বহর ৮৪ শতাংশ বাড়বে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১.১১ বিলিয়ন ডলার।
বোয়িংয়ের সাথে যৌথভাবে আগামী ২৯ জুলাই একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে ইউএস-বাংলার; যার লক্ষ্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে রূপান্তর করা।
ইউএস-বাংলার মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলেন, "ভবিষ্যতে এই দুটি শহর [চট্টগ্রাম ও সিলেট] থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার ইচ্ছা রয়েছে ইউএস-বাংলার, যা যাত্রীদের ঢাকার ওপর ট্রানজিট নির্ভরতা কমাবে।"
প্রাথমিকভাবে বিমান সংস্থাটি জেদ্দা, মদিনা, বাহরাইন, হংকং, কলম্বো, কাঠমান্ডু এবং জোহর বাহরুতে নতুন ফ্লাইট চালু করার পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে ইউরোপ, টরন্টো এবং সিডনি তাদের দীর্ঘমেয়াদী নেটওয়ার্ক কৌশলের অংশ হিসেবে রয়েছে।
কামরুল ইসলাম জানান, প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপ হিসেবে তাদের ইউরোপে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তারা ২০২৮ সালের মধ্যে ইতালিতে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে কানাডার টরন্টো ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ফ্লাইট চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
বর্তমানে চারটি এটিআর ৭২-৬০০ টার্বোপ্রপ পরিচালনাকারী এয়ারলাইন—এয়ার অ্যাস্ট্রা তাদের বহর ১০টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে, যা দেশীয় শিল্পের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির হার। আরও দুটি টার্বোপ্রপ যুক্ত করার পাশাপাশি এয়ারলাইনটি ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে চারটি ইজারাকৃত বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজ যুক্ত করার মাধ্যমে ওয়াইড-বডি (বড় আকৃতির) উড়োজাহাজ পরিচালনায় প্রবেশ করবে। এয়ার অ্যাস্ট্রার কর্মকর্তারা জানান– তারা নেপাল, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরে ফ্লাইট চালুর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রুটে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এয়ার অ্যাস্ট্রার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ ব্যাখ্যা করে বলেন, থার্ড টার্মিনাল এই শিল্পের প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দিয়েছে। তিনি বলেন, "আগে টার্মিনাল ও পার্কিংয়ের ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বহর সম্প্রসারণ সম্ভব হতো না। এখন যেহেতু সেই সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে অবশ্যই বহর বাড়াতে হবে। নাহলে বিদেশি সংস্থাগুলো এই বাড়তি সুবিধার সুযোগ নিয়ে, তাদের বাজারের অংশীদারিত্ব আরও বাড়িয়ে নেবে।"
এদিকে কয়েক বছর ধরে লিজের উড়োজাহাজ সংগ্রহে হিমশিম খাওয়ার পর আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরছে নভোএয়ার। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, এয়ারলাইনটি চলতি বছরের নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে লিজের দুটি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে এবং এর ছয় মাস পর তৃতীয়টি যুক্ত হবে। বর্তমানে তিনটি উড়োজাহাজ নিয়ে চলাচল করা নভোএয়ার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর) এবং মধ্যপ্রাচ্যে (দুবাই, শারজাহ, মাস্কট) আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করতে বোয়িং ও এয়ারবাসের বিকল্পগুলো মূল্যায়ন করছে।
বৈশ্বিক ইজারাদানকারীদের উচ্চ আস্থা
এভিয়েশন শিল্পের শীর্ষ নির্বাহীরা, এই বিশাল সম্প্রসারণের কৃতিত্ব দিচ্ছেন বৈশ্বিক উড়োজাহাজ ইজারাদানকারী কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত হওয়ার বিষয়টিকে। দেশের এভিয়েশন খাতের একটিও উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্ত না হওয়ার পরিচ্ছন্ন রেকর্ড, কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক তদারকি এবং কেপটাউন কনভেনশন বাস্তবায়নের ফলে – আন্তর্জাতিক লিজদাতারা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক শর্তে নতুন উড়োজাহাজ দেওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাস পেয়েছেন।
তবে দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, থার্ড টার্মিনাল হলেও দীর্ঘমেয়াদে যাত্রীদের প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত একটি মাত্র রানওয়ে যথেষ্ট হবে না। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে টেকসই করতে, চূড়ান্তভাবে সম্পূর্ণ নতুন এবং আরও বড় একটি বিমানবন্দরের প্রয়োজন হবে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা