আকাশে ড্রোন, জলাশয়ে হাঁস, নালা-নর্দমায় ব্যাঙ-গাপ্পি মাছ ছাড়ার পর এবার ফাঁদ পেতে মশা দমনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এই ফাঁদের নাম ‘গ্যাভিড ট্র্যাপ’। এর মাধ্যমে মশাকে একটি খাঁচায় ঢুকতে উৎসাহিত করা হবে। খাঁচায় ঢুকলে মশা আর বের হওয়ার সুযোগ পাবে না।
অবশ্য ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস বলছেন, মশক নিয়ন্ত্রণে শুধু এই ট্র্যাপের ওপরই ডিএনসিসি নির্ভর করবে না। অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি এই ট্র্যাপ মশা দমনে বাড়তি অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করবে। ডিএনসিসি দেশে প্রথম এই ট্র্যাপ ব্যবহার করে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেছে।
গ্যাভিড ট্র্যাপ কী
‘গ্যাভিড ট্র্যাপ’ ড্রাম আকৃতির ছোট একটি খাঁচা। এই খাঁচার ভেতরে পাতলা একটি কাগজ থাকবে। সেই কাগজে এমন কিছু গন্ধযুক্ত রাসায়নিক থাকবে, যা মানুষের শরীরের ঘামের সঙ্গে নিঃসৃত গন্ধের মতো। যে ধরনের গন্ধ পেয়ে মশা মানুষের সান্নিধ্যে গিয়ে শরীরে হুল ফোটায়। খাঁচার ভেতরে থাকবে কার্বন ডাইঅক্সাইড মিশ্রিত পাতলা কাগজ। মশা বরাবরই কার্বন ডাইঅক্সাইডের প্রতি দুর্বল। খাঁচার মুখে থাকবে ব্যাটারিচালিত ছোট ফ্যান। মশা ট্র্যাপের সংস্পর্শে গেলে ভেতরে ঢুকে যাবে, আর বের হওয়ার সুযোগ পাবে না। পরে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ট্র্যাপগুলো থেকে মশা সংগ্রহ করা হবে।
এরই মধ্যে ৬৫টি ‘গ্যাভিড ট্র্যাপ’ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে এগুলো ডিএনসিসির আওতাধীন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালের পাশে সুবিধাজনক স্থানে বসানো হবে। এ ছাড়া মেট্রোরেলের দিয়াবাড়ীর ডিপোতেও ট্র্যাপ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে ডিএনসিসির।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস সমকালকে বলেন, এর আগে চীন থেকে তিনটি ‘গ্যাভিড ট্র্যাপ’ এনে উত্তরার আশকোনা হজ ক্যাম্পে বসানো হয়েছিল। এতে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। পরে ডিএনসিসি এই ট্র্যাপ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান উচ্চ দাম ধরায় সেটা আর করা হয়নি। প্রতিটি ট্র্যাপ ৩০ হাজার টাকার মধ্যেই সংগ্রহ করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, আতিকুল ইসলাম মেয়র থাকার সময় সিঙ্গাপুর থেকে চারটি বড় আকারের ‘গ্যাভিড ট্র্যাপ’ সংগ্রহ করা হয়েছিল। উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে সেগুলো বসানো হয়েছিল। পরে সেগুলো তুলে ফেলা হয়।
মশক বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশার ঘনত্ব নির্ণয়ের জন্য কয়েক ধরনের ট্র্যাপ ব্যবহার করা হয়। ডিএনসিসি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে মশার ঘনত্ব জানার জন্য ওই ট্র্যাপগুলো বেশ কিছু দিন ব্যবহার করেছিল।
কীটতত্ত্ববিদ ড. ইন্দ্রানী ধর বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ভারতে বিভিন্ন ট্র্যাপ ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে এতদিন গবেষণার কাজে কয়েকটি ট্র্যাপ ব্যবহার হয়ে আসছিল। যেহেতু ঢাকায় মশা বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে, এ কারণে ট্র্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমেও মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম বাড়াতে পারে সিটি করপোরেশন।
বিভিন্ন দেশে কয়েক ধরনের ট্র্যাপ মশক দমনে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে লাইট ট্র্যাপ। এ ট্র্যাপের মাধ্যমে আলো-আঁধারি পরিবেশে মশাকে কৌশলে খাঁচায় ভরা যায়। আরেকটি স্টিকি ট্র্যাপ। এই ট্র্যাপের মাধ্যমে একটি পাত্রে পানি রেখে পাশে একটি যন্ত্রে মশা মারার ওষুধ রেখে মশা ধরা হয়। অভিট্র্যাপের মাধ্যমে একটি আঠালো পদার্থ দিয়ে মশাকে প্রথমে আকৃষ্ট করা হয়। মশা সেখানে গেলে আঠায় আটকে যায়।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মশার জরিপ ও গবেষণার কাজ ছাড়া মশক নিয়ন্ত্রণে ট্র্যাপ ব্যবহৃত হয়নি। তবে এর আগে মশা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন জলাশয়ে নোভালরুন ট্যাবলেট, বিটিআই ব্যবহার করেছিল। এ ছাড়া মশার লার্ভা নিধনের জন্য জলাশয়গুলোতে ছাড়া হয়েছিল হাঁস। নালা-নর্দমায় জমা মশার লার্ভা নিধনের জন্য ছাড়া হয়েছিল ব্যাঙাচি ও গাপ্পি মাছ। মশার উৎসস্থল জানতে ব্যবহার করা হয়েছে ড্রোন। তবে কোনো উদ্যোগেই মশা বাগে আসেনি।
সূত্র: সমকাল