ঘাসে পা রাখতেই নরম এক অনুভূতি। পাশে টলটলে পানির লেকে মাছের ছোটাছুটি। বাতাসে দুলছে গাছের পাতা। দেখে মনে হয়, যেন শহরে কংক্রিটের জঙ্গলে এক টুকরো গ্রাম। এই দৃশ্য চোখে পড়ল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় বৃক্ষমেলায়।
শহরে সবুজায়নের এই কারিগরের নাম মো. রকিবুল আমিন। তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তা নন; প্রকৃতিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলার কাজ করে আসছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’। ছাদ, বারান্দা, অফিস, দেয়াল কিংবা ছোট্ট একটি ঘরের কোণ– যেখানে সামান্য জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই প্রকৃতির ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে তাঁর প্রতিষ্ঠান।
কুষ্টিয়ায় বেড়ে ওঠা রকিবুলের শৈশব কেটেছে গাছপালা আর ফুলবাগানের মধ্যে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই নিজের বাড়ির আঙিনায় গোলাপসহ নানা ফুলের বাগান করেছিলেন। আশপাশের মানুষ তাঁর বাগান দেখতে আসতেন। ২০০১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন। ঢাকা কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।
রকিবুল বলেন, ‘ঢাকায় এসে দেখি, শহরের মানুষ চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ। সবুজ বলে তেমন কিছু নেই। সবুজের এই অভাব আমাকে নাড়া দেয়। তখনই মনে হয়, মানুষের ঘরে যদি প্রকৃতির স্পর্শ ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে শহরও কিছুটা প্রাণ ফিরে পাবে।’
রকিবুলের উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ছাত্রাবস্থায় ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ উপলক্ষে ১৪ হাজার টাকার গোলাপ কিনে শাহবাগে বিক্রি শুরু করেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রি জমে ওঠে। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি নেমে সব ফুল নষ্ট হয়ে যায়। তখন বেশ লোকসান হয় তাঁর। তিনি সেখানেই থামেননি।
২০০৮ সালে বসুন্ধরা সিটিতে ছোট্ট একটি দোকান ভাড়া নেন। নাম দেন ‘একেশিয়া’। শুরুতে ব্যবসা খুব একটা ভালো চলেনি। একদিন ইনডোর প্লান্ট বিক্রি করে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা আয় করেন। সেই দিনই বুঝতে পারেন, শুধু ফুল বিক্রি নয়, মানুষের ঘরে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার মধ্যেই ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। এক পর্যায়ে সেই দোকানটি তাঁকে ছেড়ে দিতে হয়। পরে গড়ে তোলেন নতুন প্রতিষ্ঠান, নাম দেন গার্ডেনিং বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে সেটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বছরে সাত-আট কোটি টাকার ব্যবসা করছে।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, রিসোর্ট, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা, আবাসন প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইকোপার্ক, লেক ও বাড়িতে সবুজায়নের কাজ করছে রকিবুলের প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে শতাধিক ছোট-বড় প্রাকৃতিক দৃশ্য (ল্যান্ডস্কেপ) প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে তারা।
রকিবুল বলেন, ‘সবুজটা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ গাছের পাতা ছুঁয়ে দেখার অভ্যাসও হারিয়ে ফেলছে। আমি চাই প্রত্যেক মানুষ প্রতিদিন অন্তত একবার গাছের সঙ্গে সময় কাটাক। গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না, মানুষের মনও ভালো রাখে। সবুজ দেখলে চোখের ক্লান্তি দূর হয়, মন শান্ত হয়।’
রকিবুল এখন ‘জিরো সয়েল’ বা উন্মুক্ত মাটিবিহীন অবস্থা-বিষয়ক ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, কোনো খোলা মাটি অনাবৃত রাখা উচিত নয়। ঘাস, লতা কিংবা অন্য কোনো উদ্ভিদ দিয়ে প্রতিটি ফাঁকা জায়গা ঢেকে দেওয়া সম্ভব। এতে যেমন শহর সবুজ হবে, তেমনি তাপপ্রবাহ কমানো, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যাবে। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আগামী প্রজন্ম এমন একটি বাংলাদেশ পাক, যেখানে গাছের জন্য আলাদা করে জায়গা খুঁজতে হবে না। প্রতিটি ছাদ, বারান্দা, স্কুল, অফিস– সব জায়গায় অন্তত কিছুটা সবুজ থাকবে।’
দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে এবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার পেয়েছেন রকিবুল আমিন।
সূত্র: সমকাল