শিরোনাম
◈ শহীদ জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা,ঢাকা ১৬ টি স্থানে বস্ত্র বিতরনে অংশ নিবেন ◈ ট্রাম্পের গলফ প্রকল্পে ভাঙছে কবরস্থান, জমি ছাড়তে নারাজ কৃষকেরা, ক্ষোভে ফুঁসছে ভিয়েতনামের গ্রামবাসী ◈ ট্রাম্পের দেওয়া যে ২ শর্তে ঝুলে আছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ◈ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছে ৬ হাজার ৪৭৩টি ইসরায়েলি বাড়ি: জেরুজালেম পোস্ট ◈ আজ রা‌তে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে আর্সেনাল ও পিএস‌জি মু‌খোমু‌খি ◈ বর্ষায় গো-খাদ্যের ভরসা যমুনার চর, ঘাসের হাটে মিলছে কৃষকের স্বস্তি ◈ পথ দেখাচ্ছে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের তরুণীরা : প্যারিসে অধ্যাপক ইউনূস ◈ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার প্রশংসা জাতিসংঘের ◈ বিশ্বকা‌পের গ্রুপ প‌র্বে বেলজিয়ামের সামনে মিশর-ইরান ও নিউজিল্যান্ড চ্যালেঞ্জ ◈ জু‌নের শুরু‌তে বিশ্বকাপ : যুদ্ধ আবহে এখনও ইরানি ফুটবলারদের ভিসা দেয়নি আমেরিকা

প্রকাশিত : ৩০ মে, ২০২৬, ১০:৪৬ দুপুর
আপডেট : ৩০ মে, ২০২৬, ১২:১৬ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

গোলকধাঁধায় ঢাকার হকার পুনর্বাসন উদ্যোগ

রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করতে একের পর এক উচ্ছেদ অভিযান, তারপর নতুন নীতিমালার আওতায় ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড ও নির্ধারিত স্থানে হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগ সব মিলিয়ে ঢাকার পথঘাটে শৃঙ্খলা ফেরানোর বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। একদিকে পসরার স্তূপ, অন্যদিকে মানুষের ভিড়। এই চিরচেনা বিশৃঙ্খলা দূর করতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত হকার পুনর্বাসন নীতিমালা আলোর মুখ দেখলেও, বাস্তবায়নের ময়দানে যেন এক গভীর অনিশ্চয়তা দানা বাঁধছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে হকারদের একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় আনার যে যে চেষ্টা করছে, উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে হকারদের সহযোগিতা পাচ্ছে না তারা। ফলে উচ্ছেদ, পুনর্বাসন ও নিয়ন্ত্রণ—এই তিনের মাঝখানে আটকে গিয়ে রাজধানীর হকার ব্যবস্থাপনা এখন যেন এক গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

হকার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সম্প্রতি হকার নীতিমালা অনুমোদন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সেই নীতিমালার ভিত্তিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন।

সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন ও হকারদের জন্য স্থান নির্ধারণের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে গুলিস্তান, নিউমার্কেট ও মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার কোথায় কোথায় তারা বসবেন, সে কাজ শেষ হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী হকারদের জন্য ছোট ছোট করে দাগ কেটে বসার নির্দিষ্ট করা জায়গা করে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। হকাররা ডিজিটাল কার্ড পেয়েছে, অন্যদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। তবুও হকাররা নির্দিষ্ট করে দেওয়া স্থানে বসছে না। আর সেটা পরিপূর্ণভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায়ও আনতে এখনও পারেনি সংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে যেন গোলকধাঁধায় পড়েছে হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগটি।

গুলিস্থানের পীর ইয়ামিন মার্কেটের পশ্চিম দিকের সড়কের স্টেডিয়াম আগ পর্যন্ত মাঝের সড়কের সাদা রং দিয়ে হকারদের দোকান নিয়ে বসার জন্য দাগ কেটে জায়গা করা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, সেই নির্দিষ্ট স্থানে কোনো হকারই বসেনি। তারা আগের মতো মূল সড়ক এবং ফুটপাত দখল করেই ব্যবসা পরিচালনা করছে। এটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কারো মনিটরিং নেই। তবে, হকাররা ধারণা করছে সবার তালিকা এবং কার্ড পাওয়ার আগ পর্যন্ত হয়তবা তারা সড়ক, ফুটপাতে বসতে পারবে। এরপর তাদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে বাধ্য করা হবে।

এদিকে নিবন্ধনের মাধ্যমে হকারদের মাঝে স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকশ হকারকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এই হকাররা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে নির্দিষ্ট সময় ব্যবসা করতে পারবেন। মাসিক বা বার্ষিক হিসেবে তাদের দেওয়া টাকা নির্ধারিত স্থানের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করবে কর্তৃপক্ষ। হকারদের কার্ড প্রদানের পরও যখন তারা নির্দিষ্ট জায়গায় বসছে না, আগের মতোই সড়ক, ফুটপাত দখল করে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে- তখন গুলিস্তান থেকে মিরপুর, সর্বত্রই এখন একটিই প্রশ্ন, ফুটপাতের এই রাজত্ব কি সত্যিই শৃঙ্খলায় ফিরবে, নাকি উচ্ছেদ আর পুনর্বাসনের এই পুরোনো খেলা কেবল নতুন নাম নিয়ে ফিরে এসেছে।

নতুন নীতিমালায় হকারদের মাসিক ১০০ টাকা অথবা বার্ষিক এক হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করেছে সিটি করপোরেশন। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ফুটপাতে বসার সুযোগ পেতে হলে হকারের বয়স হতে হবে অন্তত ১৮ বছর। প্রতিটি নিবন্ধিত হকারকে দেওয়া হবে একটি ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড, যাতে থাকা কিউআর কোড। স্ক্যান করলেই জানা যাবে তার ব্যবসার ধরন, নির্দিষ্ট স্থান ও সময়। তবে, এই সুযোগ সবার জন্য অবাধ নয়, এক পরিবার থেকে কেবল একজনই নিবন্ধিত হতে পারবেন। এছাড়া এমন স্থান হকারদের বসার জন্য নির্ধারণ করা হবে, যেখানে তাদের বসার পরও পথচারীদের চলাচলের জন্য ন্যূনতম ৫ ফুট জায়গা থাকবে। যানজট যাতে সৃষ্টি না হয়, সে জন্য মেট্রো স্টেশন, বাস টার্মিনাল বা গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে অন্তত ৩০ ফুট দূরে হকাররা বসার সুযোগ পাবেন।

এ নীতিমালার আওতায় সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কিছু স্থানে হলিডে মার্কেট বসবে। বাণিজ্যিক বা জনবহুল স্থানগুলোতে অফিস সময়ের পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হকাররা বসতে পারবেন। সেই জায়গাগুলোও নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তবে খেলার মাঠ, স্কুল মাঠ, গণপরিসর, উপাসনালয়ের মাঠ, কবরস্থানে কোনো হকার বসতে পারবেন না। তারা কোনো স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করতে পারবে না, ছাতা বা অস্থায়ী আচ্ছাদন ব্যবহার করা যাবে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে সিটি করপোরেশন।

এত আয়োজন তবুও গুলিস্থানে হকারদের নির্দিষ্ট বসার জায়গা দেখা গেলো ফাঁকা। সেখানে কেউ বসেনি, তবে সড়ক ফুটপাত দখল করে আগের মতোই হকাররা তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। এ বিষয়ে কথা হয় হামিদুর রহমান নামের একজন হকারের সঙ্গে।

তিনি বলেন, অনেকেই কার্ড পেয়েছে, আবার আমরা অনেকেই কার্ডের জন্য সব কিছু জমা দিয়েছি। যারা কার্ড পেয়েছে তারা কেউই এখনও নির্দিষ্ট জায়গায় বসছে না। আমার পাশের হকারও কার্ড পেয়েছে সেও নির্দিষ্ট জায়গায় তারা দোকান নিয়ে যায়নি। এখানেই দোকান করছে। কারণ সিটি করপোরেশন কার্ড ও নির্দিষ্ট স্থান করে দিলেও এখনও চাপাচাপি শুরু করেনি। আর ঈদের কারণে অনেকেই নতুন জায়গায় যায়নি, নতুন জায়গায় গেলে ব্যবসা কমে যাবে সে কারণে। আমরা কার্ড পেলে আর সিটি করপোরেশন নতুন জায়গায় যেতে বাধ্য করলে আমরাও চলে যাব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুলিস্থান এলাকার আরেক হকার বলেন, নতুন নির্দিষ্ট জায়গায় গেলেই কি আমাদের বেচা কেনা শুরু হবে? ওই ছোট্ট স্থানে একজন হকার কীভাবে মালামাল নিয়ে বসবে? আর ওখানে বিক্রিও হবে না সেভাবে। তাই আমি কার্ড পেয়েছি, তবুও যাইনি। এখনও আগের জায়গায় বসছি। 

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন কার্ড , জায়গা দিলেও আগের সিস্টেমেই চলবে। চাঁদা দেওয়াই লাগবে আমাদের, গুলিস্থানে চাঁদা না দিয়ে ব্যবসা করা যাবে? 

আগে অন্য দলের লোকেরা চাঁদা নিতো, এখন আরেক দলের পরিচয় দিয়ে চাঁদা দিতে হবে। এছাড়া যারা সিটি করপোরেশনের কার্ড পাচ্ছে বা আবেদন করছে, তাদের সিটি করপোরেশনকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া না লাগলেও অন্য জায়গায় ঠিকই টাকা দিতে হচ্ছে। কেউ সুপারিশ ছাড়া কার্ড কেউ পাবে না। সিটি করপোরেশনের দিনে ১০০ বা মাসে ১০০০ টাকা ফি ছাড়াও আমাদের দিনে কমপক্ষে ২০০ টাকা চাঁদা দেওয়া লাগে লাইনম্যানদের। সিটি করপোরেশন কার্ড করলেও নতুন জায়গায় হকারদের এখন নিয়ে যেতে পারেনি, আবার হকারদের অন্য জায়গায় ঠিকই চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। 
এদিকে নীতিমালাও হচ্ছে আবার চাঁদাবাজিও হচ্ছে। বলতে গেলে হকার পুনর্বাসন বর্তমানে একটি গোলকধাঁধার মধ্যে আছে। কী হবে কেউ জানে না।

কার্ডের জন্য আবেদন করা হকার শাজেদুল ইসলাম বলেন, যারা কার্ড পেয়েছে তারা এখন সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে দোকান নিয়ে যায়নি। আমরা যারা এখনও কার্ড পাইনি তারাও যাইনি নির্ধারিত স্থানে। যখন সিটি করপোরেশন কড়াকড়ি, অভিযান শুরু করবে তখন যাব। কারণ যেই জায়গা দিয়েছে সেখানে সেভাবে ব্যবসা হবে না আমাদের। আর একটা কারণ ঈদের জন্য সিটি করপোরেশন সবাইকে ছাড় দিয়েছে, তাই সবাই আগের জায়গাতেই ব্যবসা করছে।

তিনি বলেন, আমি কার্ডের জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু লোকজন না ধরলে আমি হয়তবা কার্ড পাবো না। অন্যদের কাছে শুনেছি সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট ফি এর বাহিরে যারা লাইনম্যান, প্রভাবশালী তাদের ২০/৩০ হাজার টাকা না দিলে না কি কার্ড হবে না। যদি এমনই হয় তাহলে সিটি করপোরেশন এমন উদ্যোগ নিল কেন? তার মানে টাকা বা চাঁদা আমাদের দুদিকেই দিতে হবে। সিটি করপোরেশনকে দিতে হবে মাসিক বা বাৎসরিক ফি আর স্থানীয় প্রভাবশালীদের দিতে দিন চুক্তি বা মাসিক চুক্তি চাঁদা। আর যেসব হকাররা জায়গা বরাদ্দ পেয়েছে তাদের জায়গা এতটাই ছোট যে সেখানে ব্যবসা করে খাওয়া অনেকটাই অসম্ভব।

এদিকে যাদের কার্ড হয়েছে, নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ হয়েছে, জায়গা সাদা রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের এখনও কেন সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না… এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরো তালিকা, কার্ড হওয়ার আগে পর্যন্ত এবং ঈদে ব্যবসা করার জন্য মানবিক কারণে হকারদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরপর হকারদের পুনর্বাসন নীতিমালা অনুযায়ী কঠোরভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রাজধানীর সদরঘাট থেকে গুলিস্থান হয়ে চলাচলকারী ভিক্টর বাসের চালক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কিছুদিন আগে যখন পুরো গুলিস্থান এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে হকার সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তখন যাতায়াত করে অন্যরকম ভালো লাগতো। এখন আবার ফুটপাত, সড়ক দখল করে হকাররা বসেছে। এখন গুলিস্থান পার হতেই আধাঘণ্টা সময় লাগে। আমরা চাই সড়ক ফুটপাত এভাবে দখল হয়ে না থাকুক, হকারদের অন্য কোথাও বসানো হোক। এখন হকার বসার নির্দিষ্ট জায়গা থাকার পরও হকাররা সড়ক, ফুটপাত দখল করে বসে আছে।

সমন্বিত, মানবিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। আমরাও পুনর্বাসন চাই। তবে সেটা সঠিকভাবে করতে হবে। যে পদ্ধতিতে সিটি করপোরেশন হকার ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছে, তা কাজে আসবে না। এভাবে তিন ভাগের এক ভাগ হকার বসার সুযোগ পেতে পারে। হকার যতগুলো আছে সবাইকেই সুযোগ দিতে হবে, সেভাবেই জায়গা বরাদ্দ বা নির্ধারণ করতে হবে : বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন

চলতি মাসের শুরুতে রাজধানীর মিরপুর ১০, মিরপুর ১ এবং মিরপুর ২ এর মূল সড়কের ভ্রাম্যমাণ দুই শতাধিক ব্যবসায়ীর (হকার) মাঝে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের বৈধতা দেওয়াসহ ব্যবসার জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে ২০২ জন হকারের মাঝে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে মিরপুর-১৩, ওয়াসা রোডে এবং বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচা বাজার সংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত মোট হকারের সংখ্যা ৮২৯ জন। বাকি হকারদেরও পর্যায়ক্রমে পরিচয়পত্র প্রদান করে নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করা হবে।

হকারদের নির্ধারিত স্থানের বাইরে ব্যবসা না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী কোনো কাঠামো নির্মাণ না করতে বলা হয়েছে। একটি মনিটরিং কমিটির মাধ্যমে স্থানান্তর কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) যুক্ত থাকবে।

পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকা ধরে পর্যায়ক্রমে হকারদের বিকল্প স্থানে স্থানান্তর করা হবে। নির্ধারিত সময়ের পর পুরোনো স্থানে হকার পাওয়া গেলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ৬ মাঠে হকার পুনর্বাসনের প্রস্তাব পেয়েছিলাম। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এসব মাঠে শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করে। তাই মাঠগুলো পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে হকারদের জন্য পৃথক হকার্স মার্কেট গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান

অন্যদিকে, হকারদের সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রস্তাবিত “ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬” এর আওতায় হকার পুনর্বাসন কার্যক্রমে প্রথমে ১০০ জন হকারকে রমনা ভবন সংলগ্ন লিংক রোড এলাকায় পুনর্বাসনের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র হস্তান্তর করেছে দক্ষিণ সিটি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত এলাকাগুলো হলো- গুলিস্তানে রমনা ভবনের লিংক রোডে দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীত পাশে এজিবি কলোনি মাঠ- সান্ধ্যকালীন মার্কেট (সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত ১০টা), মতিঝিল ইসলাম চেম্বারের সামনে ও আশেপাশের এলাকায়, সান্ধ্যকালীন মার্কেট (সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত ১০টা), রাজউক ভবনের পেছনে।

দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, গুলিস্তান টুইন টাওয়ার গলি, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, বাইতুল মোকাররম পূর্বগেট সংলগ্ন লিংক রোড, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন এক পাশে, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির অভ্যন্তরে মাঠ সংলগ্ন রাস্তা, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রথম দিনে ১০০ হকারকে কিউআর কোড সম্বলিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সকল হকারকে প্রদান করা হবে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া,  ট্রাফিক পুলিশ সহজেই তাদের বৈধতা ও বসার স্থান যাচাই করতে পারবে। হকার বসার পরও ফুটপাথে পথচারীদের চলাচলের জন্য ন্যূনতম ৫-৬ ফুট জায়গা উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

হকার, পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও সাধারণ মানুষ সবাই মিলে সহযোগিতা করলে এই ঢাকা শহরকে সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। পুনর্বাসনের পর সরকার ও সিটি করপোরেশনের সকল বিধিবিধান মেনে এবং বরাদ্দকৃত জায়গার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে বৈধ ব্যবসা পরিচালনার জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগিতা করতে হবে। আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি। আমাদের যেসব করণীয় সেগুলোর বিষয়ে আমরা উদ্যোগ নেব। কোনো স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা যাবে না। নীতিমালা লঙ্ঘনকারী বা লাইসেন্সবিহীন অবৈধ হকারদের যেকোনো সময় উচ্ছেদের পূর্ণ এখতিয়ার কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করবে। এছাড়া হকারদের কাছ থেকে অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর তদারকি করবে : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম

এদিকে রাজধানী ঢাকার রাস্তা ও ফুটপাতে হকারদের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। গত ১৯ মে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি আব্দুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ রুল জারি করেন।

ঢাকার হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬-এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শোয়েবুজ্জামান এই রিটটি দায়ের করেন। ওই নীতিমালায় সিটি করপোরেশনগুলোকে রাস্তা ও ফুটপাতে হকারদের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। রুলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে। তাদের আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, প্রস্তাবিত হকার নীতিমালায় পথচারীদের জন্য ন্যূনতম ৫-৬ ফুট জায়গা রাখবার শর্ত মেগাসিটির জন্য আধুনিক পরিকল্পনার মানদণ্ডের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। 

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নীতিমালা করা হলেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাবিহীন, স্বেচ্ছাচারী ও অপরিণামদর্শীতার নজির রেখে যেভাবে হকারদেরকে ফুটপাত ও সড়কে অপরিকল্পিতভাবে বসবার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে, সেটা ঢাকা শহরে চলাচলকারী নাগরিকের জন্য আরও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। 

হকার সমস্যা শুধু ঢাকা শহরের সমস্যা নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন নগর এলাকায় এই সমস্যা নগরের পথচারীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা, নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি জনজীবনে বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। ফলে, সারা বাংলাদেশের নগর এলাকার জন্যেই হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন করবার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করবার কোনো সুযোগ নেই। পাশাপাশি হকার সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ও কমিউনিটিভিত্তিক নজরদারির কোনো বিকল্প নেই : নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান

এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, আমাদের নগর এলাকার জন্য হকার নীতিমালায় প্রয়োজন ছিল অনেক দিন ধরেই। দেরিতে হলেও এই নীতিমালা প্রণয়ন হকারদের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সূচনা করবে। কিন্তু এই নীতিমালায় মেগাসিটিতে নাগরিকদের নিরাপদে চলাফেরার অধিকারকে কার্যত আরও সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। এতে হকার ব্যবস্থাপনা এবং ফুটপাতে পথচারীদের চলাচলের অধিকারের মধ্যে যেভাবে সমন্বয় করার চিন্তা করা হয়েছে, তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ।

সূত্র: ঢাকা পোস্ট

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়