শিরোনাম
◈ সদরঘাটে লঞ্চের ধাক্কায় বুড়িগঙ্গায় ট্রলারডুবি, ৮ জন উদ্ধার; নিখোঁজ ২ ◈ সিঙ্গাপুর শীর্ষে, সম্ভাবনার বন্দর চট্টগ্রাম কেন বিশ্বসেরার তালিকায় নেই? উঠে এলো নানা কারণ ◈ কুয়েতে বাসস্থান হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বাংলাদেশি শ্রমিকরা, ৫০ ডিগ্রি তাপদাহে চরম দুর্ভোগ ◈ ফিফাকে টাকা পরিশোধের পরও ১৪০ কোটি টাকার অনিয়ম: সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে তথ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ◈ বেসরকারি স্কুল-কলেজে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বড় সুখবর! ◈ বিশ্লেষণে নতুন সতর্কবার্তা: চীনের ৫০০ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের বিপরীতে ভারতের হাতে নেই একটিও ◈ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট নিরাপত্তা জোরদার, সীমানা অতিক্রম করলেই বাজবে অ্যালার্ম ◈ চট্টগ্রামে বন্যার পানিতে নতুন আতংক সাপ, কামড়ের শিকার ১১৮ জন! ◈ স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে যে দেশের সরকার ◈ এবার জুলাইয়ের ভুয়া মামলা ঘটনায় ফাঁসছেন বাদীরা!

প্রকাশিত : ১৮ জুলাই, ২০২৬, ১১:১৯ দুপুর
আপডেট : ১৯ জুলাই, ২০২৬, ০২:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

আ.লীগ আমলে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতায় নিয়োগপ্রাপ্ত ২২ হাজার পুলিশ সদ‌স্য চাকরীঝুঁকিতে

ডেস্ক রি‌পোর্ট : বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং দলীয় কোটায় নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া প্রায় গুছিয়ে এনেছে পুলিশ সদর দপ্তর। জেলা পর্যায়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক নিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

কনস্টেবল থেকে শুরু করে উপপরিদর্শক (এসআই) এবং সহকারী উপ-পরিদর্শকসহ (এএসআই) বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগের নথিপত্র যাচাই করেছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এতে সব মিলিয়ে প্রায় ২২ হাজার নিয়োগে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা পাওয়া গেছে। সূত্র: দেশরূপান্তর

তদন্তে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ আমলে ১০টি জেলা থেকে পুলিশ বাহিনীতে সবচেয়ে বেশি জনবল নেওয়া হয়। তাদের বড় অংশই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এছাড়া প্রভাবশালী নেতাদের ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) ও মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়েও অনেকে চাকরি পান। 

এভাবে নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের তালিকাটি অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের চেইন অব কমান্ড এবং স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এ কাজ করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে পুলিশ সূত্র।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পুলিশে কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মাস দুয়েক আগে তদন্তের নির্দেশ দেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। তাছাড়া পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টরদের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।

এই নির্দেশনার পর পুলিশ সুপারকে প্রধান করে প্রতিটি জেলায় তদন্ত কমিটি করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ডিএসবি এই কমিটিকে সহায়তা দিয়েছেন। সবগুলো কমিটির কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব পান পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত আইজিপি। জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। এখন এগুলো পর্যালোচনা করছে পুলিশ সদর দপ্তর।

পুলিশ সুপারদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিগুলো বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে। এর মধ্যে আছে নিয়োগপ্রার্থীদের স্থায়ী ঠিকানার পরিবর্তে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে কারসাজি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার।

সূত্র জানায়, জেলাভিত্তিক কমিটিগুলো ৫০ হাজার পুলিশ সদস্যের নথি যাচাই-বাছাই করেছে। তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পদোন্নতি ও ভালো জায়গায় পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না সেটিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। তালিকার পুলিশ সদস্যদের স্বজন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা সমর্থক কি না খতিয়ে দেখেছে তদন্ত কমিটি। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি জাতীয় নির্বাচনের পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের ভূমিকা পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা  বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় অনেকেই নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাদের অনেকে তিনটি জাতীয় নির্বাচনে দলীয় নেতাকর্মীর মতো কাজ করেছেন বলে তদন্ত কমিটির কাছে তথ্য এসেছে। তদন্তের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার পুলিশ সদস্যের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার, এসআই ও কনস্টেবল নিয়োগের দলীয়করণের বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকে ছিলেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী অথবা দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য। জেলা কোটা লঙ্ঘন এবং স্থায়ী ঠিকানার তথ্য গোপন করে রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক নিয়োগের তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি। ১৫ বছরে সারা দেশে পুলিশ বাহিনীতে ৪৫ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। 

বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পুলিশে নিয়োগে ব্যাপক দলীয়করণ করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এর মাধ্যমে পুলিশকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরপাকড়, গুম, হত্যা, নির্যাতন চালানো হয়।

তদন্তের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান অবস্থা : 

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশে ব্যাপক সংস্কারের দাবি ওঠে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে পুলিশের একাংশের মারণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে পুরো বাহিনী। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশেষ তদন্ত কমিটিগুলো গঠন করা হয়। সূত্র বলছে, তদন্তের কাজ এখন শেষ প্রান্তে। মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে পুলিশ সদর দপ্তর। যেকোনো দিন এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। এরপরই শুরু হবে দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ আমলে ‘রাতের ভোট’-এ সহায়তার কারণে তখনকার এসপিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন বাকিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে পুলিশ সদর দপ্তর। বিশেষ করে দায়িত্ব পালনকারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় তাদের তালিকাও চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

বিশেষ ১০ জেলায়’ বেশি অনিয়ম : তদন্তে পাওয়া গেছে, আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০টি জেলা বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতা ও মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকার পরেও অন্য জেলার প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তখনকার প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতারা এসব জেলা থেকে বেশি নিয়োগের সুপারিশ করেন। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার জেলার প্রার্থীদের বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় অন্য জেলার প্রার্থীদের ঠিকানা জাল করে এসব জেলার কোটায় চাকরি দেওয়া হয়। নিয়োগগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি হয়েছে কোটি টাকার বাণিজ্য।

নিয়োগে রাজনৈতিক সুপারিশের ধরন :

 নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের একটি বড় অংশের ফাইলে তখনকার আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, জেলা সভাপতি বা কেন্দ্রীয় নেতাদের সই করা ‘ডিও লেটার’ সংযুক্ত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে জেলা পুলিশ লাইনসে নিয়োগ পরীক্ষার আগেই নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা ঢাকা থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং দালাল চক্রকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে বাধ্য হতেন অনেকে। আবার মেধা ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিশেষ চক্র পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়নের ব্যবস্থা করেছে।

জানা গেছে, অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ২২ হাজার পুলিশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পদভিত্তিক বিন্যাসে দেখা গেছে, এই তালিকায় সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় অংশটি কনস্টেবল। তাদের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। এছাড়া এসআই ও এএসআই মিলে ৪ হাজার ও বাকিরা ইন্সপেক্টর, সহকারী পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার। 

পুলিশের একটি ইউনিটের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কনস্টেবল ও এসআই পদে মাঠ পর্যায়ে সরাসরি নিয়োগ হয় বলে এই দুই পদে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সবচেয়ে বেশি ছিল। আর ক্যাডার অফিসারদের (এএসপি) ক্ষেত্রে পিএসসির মাধ্যমে কিছুটা স্ক্রিনিং হলেও সাব-অর্ডিনেট র‌্যাংকের এই পদগুলোতে তখনকার মন্ত্রী, এমপি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণ থাকার তথ্য মিলেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যাদের নিয়োগে সরাসরি রাজনৈতিক কানেকশন ছিল, চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের চাকরিচ্যুত করার সুপারিশ থাকবে। অন্যদের কর্মকাণ্ড নজরদারির মধ্যে থাকবে। তালিকার সবাইকে চাকরিচ্যুত করা হবে না। নিরীহ কাউকে হয়রানিও করা হবে না।

সার্বিক বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে পুলিশের নিয়োগে বিভিন্ন পর্যায়ে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। অনেকে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে ও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগও পেয়েছেন। বিষয়গুলো তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়