শিরোনাম
◈ বাংলাদেশের পাসপোর্টে যুক্ত হচ্ছে জুলাই শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ ও ওয়াসিমের ছবি ◈ স্থানীয় সরকার নির্বাচন: আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সিদ্ধান্ত আদালত ও ইসির ◈ কুয়েত প্রবাসীদের জন্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বার্তা ◈ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার দাবিতে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, বড় সংঘাতের শঙ্কা ◈ রেলের আয় বেড়েছে ২২১ কোটি, লোকসান ১ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা ◈ সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের ক্রোক করা ফ্ল্যাটে প্রথম দিনে শত-শত কোট-টাইসহ যা যা মিলল ◈ লিজে আসছে ১০ উড়োজাহাজ, এয়ারবাসের আরও ১০ বিমান কেনার পথে বিমান ◈ দেশের সিনেমা হলগুলোতেও দেখা যাবে আর্জেন্টিনা-স্পেন বিশ্বকাপ ফাইনাল ◈ অর্থবছরের প্রথম ১৮ দিনেই দেশে এলো প্রায় ১৮০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স ◈ গবেষণায় আগ্রহী প্রাথমিকের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য সুখবর

প্রকাশিত : ১৯ জুলাই, ২০২৬, ০১:০২ দুপুর
আপডেট : ১৯ জুলাই, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দূতাবাসের সহায়তা নিয়ে অভিযোগ

কুয়েতে বাসস্থান হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বাংলাদেশি শ্রমিকরা, ৫০ ডিগ্রি তাপদাহে চরম দুর্ভোগ

বাসা থেকে উচ্ছেদের পর থাকার জায়গা না পেয়ে ভবনের ছাদে আশ্রয় নেন প্রবাসীরা | ছবি: সংগৃহীত

বাসস্থান হারিয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিকের দিন-রাত কাটছে রাস্তা কিংবা খোলা জায়গায়। গত বুধবার (১৫ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া এ সংকট এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে গতকাল দেশটির তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র এ গরমে অনেক প্রবাসী অসুস্থ হয়ে পড়লেও বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা মিলছে না বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।

কুয়েতের সরকারি পরিসংখ্যানের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, কুয়েতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক বসবাস করছেন। এসব শ্রমিকের অনেকেই এখন বাসস্থান সংকটের মুখে। গত ১৫ জুলাই রাতে আকস্মিকভাবে দেশটির জিলিব আল-শুয়ুখ, হাসাবিয়া ও আব্বাসিয়া এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন উচ্ছেদ এবং অবৈধ অভিবাসীবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। কুয়েতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ ফাহাদ ইউসুফ সৌদ আল-সাবাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ অভিযানে সেনাবাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড, ফায়ার ফোর্স, বিদ্যুৎ ও পানি মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত এবং বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় যৌথভাবে অংশ নেয়। অভিযানে আইন লঙ্ঘনকারী ভবনগুলোর বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে ভবনের মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের জরিমানা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) কুয়েত প্রবাসীরা ১৬১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কুয়েত থেকে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১৬৩ কোটি ডলার। রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে কুয়েতের অবস্থান অষ্টম স্থানে রয়েছে।

টানা তিনদিন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করা কুয়েতপ্রবাসী বাংলাদেশী আবদুল কাইয়ুম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বুধবার রাত ১২টার দিকে হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়। ওই সময় থেকে রাস্তায় রাত-দিন কাটছে। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গায়ের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। টানা তিনদিন ঘুমহীন, গোসল ও পানিছাড়া। এ পরিস্থিতির মধ্যে আর টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।’ আবদুল কাইয়ুম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুনেছি বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে কেউ একজন এ এলাকায় এসেছিল। কিন্তু এখানে থাকা শত শত বাংলাদেশীর কেউ তাদের দেখেনি। দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি।’

কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযানে মূলত অনিরাপদ ও অবৈধ ভবন, রাষ্ট্রীয় জমিতে অবৈধ দখলদারত্ব, অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন, আকামা (বসবাসের অনুমতি) লঙ্ঘনকারী, পলাতক ব্যক্তি এবং আবাসিক এলাকায় লাইসেন্সবিহীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

অভিযানের পর অনেক বাড়িওয়ালা রাতারাতি ঘর ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন, যার ফলে অনেক প্রবাসী আশ্রয় হারিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন। বাসা ভাড়াও বাড়ার পাশাপাশি হঠাৎ সামর্থ্যের মধ্যে বাসা খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকে। এসব এলাকায় আগে যেখানে কুয়েতি ২০০ দিনার (৮০ হাজার টাকা) থেকে ২৫০ দিনার (প্রায় ১ লাখ টাকা) এর মধ্যে বাসা ভাড়া পাওয়া যেত, এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০-৫০০ দিনার। বাংলাদেশী টাকায় দেড় লাখ থেকে ২ লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থে বাসা ভাড়া নেয়া অনেক প্রবাসীরই আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

উচ্ছেদের শিকার এসব এলাকার প্রবাসীরা জানান, হাসাবিয়া ও আব্বাসিয়া—এ দুই এলাকায় সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী থাকেন। আনুমানিক ১০ হাজারেরও বেশি প্রবাসী থাকেন এখানে। গত বুধবার মাঝরাতে হঠাৎ পুলিশ এসে প্রায় সবাইকে বের করে দেয়। এরপর থেকেই দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাস্তাঘাটে। কেউ কেউ নতুন বাসা খোঁজার চেষ্টা করছেন, কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বেশির ভাগ প্রবাসীই খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।

উচ্ছেদ করা আব্বাসিয়া এলাকায় দুই বছর ধরে বসবাস করছিলেন নড়াইলের রিয়াজুল ইসলাম। এখন কাটছে খোলা আকাশের নিচে। বণিক বার্তাকে এ প্রবাসী বলেন, ‘রাত ৩টার দিকে হঠাৎ দরজায় লাথির শব্দ শুনে খুলে দেখি পুলিশ। তারা সবাইকে পাসপোর্ট, মোবাইল আর আকামা নিয়ে ৫ মিনিটের মধ্যে রুম থেকে বের হওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপর পানি, বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কে বৈধ বা অবৈধ সেটা দেখার জন্য সবার আইডিও চেক করে। ভোর ৬টা পর্যন্ত সবাইকে এক জায়গায় বসিয়ে রাখে। অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বের হতে পারেনি। তাই পরদিন আবার এসব ভবনে এসে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেন। এ সময় অনেকে কোথাও যাওয়ার উপায় না পেয়ে ভবনের ছাদে রাতে আশ্রয় নেন। তবে পুলিশ লাঠিচার্জ করে সবাইকে বের করে দিয়েছে।’

বাড়ি ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে জানিয়ে রিয়াজুল ইসলাম আরো বলেন, ‘আগে যেখানে আমরা ২০০-২৫০ দিনার খরচ করে বাসায় থাকতাম, এখন খোঁজ নিয়ে দেখলাম দুই-তিন রুমের একই ফ্ল্যাটের ভাড়া ৪০০-৫০০ দিনার। এটা অনেকেরই সামর্থ্যের বাইরে।’

উচ্ছেদের পরদিন ১৬ জুলাই কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, উচ্ছেদের শিকার প্রবাসীদের একটি সরকারি স্কুলে অস্থায়ী শেল্টার হাউজে থাকার ব্যবস্থা করেছে দেশটির সরকার। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অভিযানের ফলে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি ও পরিবারগুলো তাদের বৈধ অবস্থানের প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপন সাপেক্ষে অস্থায়ীভাবে শেল্টার হাউজে অবস্থান করতে পারবে। তবে সেখানে অবস্থানকালে তারা কর্মস্থলে যোগদান বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে শেল্টার হাউজ ত্যাগ করতে পারবেন না।’

এছাড়া বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর ও চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সেলর (শ্রম) শোয়াইব-উল-ইসলাম তরফদারসহ একটি প্রতিনিধি দল ওই শেল্টার হাউজে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নেয়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের সার্বিক অবস্থা সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

অস্থায়ীভাবে শেল্টার হাউজে অবস্থানকালে কর্মস্থলে যোগদান বা কোনো উদ্দেশ্যে শেল্টার হাউজ ত্যাগ করার সুযোগ না থাকায় অনেক প্রবাসীই এ আশ্রয় কেন্দ্রে যাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবাসী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যেসব প্রবাসী এখানে থাকতাম তারা কম খরচে থাকতে পারতাম। যেহেতু ভবনগুলো পুরনো, তাই ভাড়াও কম ছিল। উচ্ছেদের বিষয়ে আমাদের মালিক পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। তারা হয়তো ভাড়ার জন্য আমাদের উচ্ছেদের তথ্য গোপন রেখেছে। দূতাবাস থেকেও কিছু জানতে পারিনি। তাহলে বাসা ছাড়ার একটা প্রস্তুতি থাকত। এসব ভবনে আমাদের মতো সাধারণ কর্মজীবী লোকজন থাকে। হঠাৎ করে রাতের মধ্যে সবাইকে বাসা থেকে বের করে দেয়। এত পরিমাণ বাংলাদেশীর জন্য দূতাবাসের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। তারা শুধু শেল্টারে গিয়ে পরিদর্শন করেছেন কিন্তু যারা ভবঘুরের মতো রাস্তায় থাকছেন তাদের খবর কেউ নিচ্ছে না।’

কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা যায়, প্রবাসীরা যেসব ভবনে থাকতেন সেখানে উচ্ছেদের বিষয়টি অনেক পুরনো। যেহেতু সরকার বাড়ির মালিকের কাছে নোটিস পাঠায়, তাই মালিকরা ভাড়া হারানোর ভয়ে হয়তো ভাড়াটিয়াদের কোনো তথ্য জানায়নি। তাই হঠাৎ উচ্ছেদে বিপাকে পড়েছেন প্রবাসীরা। সরকারিভাবে যে শেল্টারে অস্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখান থেকে বের হওয়া বা কাজে যোগ দেয়ার সুযোগ নেই। শেল্টার থেকে বের হতে হলে উচ্ছেদ করা এলাকার ভবনের বাইরে থাকার জায়গা আছে মর্মে মুচলেকা দিয়ে বের হতে হবে প্রবাসীদের। তাই অনেকেই শেল্টারে আসেননি। আবার শেল্টারে না আসা উদ্বাস্তু অবস্থায় থাকা প্রবাসীদের জন্য দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো একটি ভবন ভাড়া নিয়ে সেখানে রাখার ব্যবস্থা করার মতোও পরিস্থিতিও নেই বলে জানায় দূতাবাস সূত্রটি।

কুয়েতের বর্তমান এ পরিস্থিতির বিষয়ে ভালোভাবে অবগত নন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দূতাবাসের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব, সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে। কুয়েত সরকার যদি কোনো ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সেখানে বসবাসে নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেটি তাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। আমাদের দেশেও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অনেক সময় সরকার সিলগালা করে দেয়। কুয়েতেও যদি এমন কোনো বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে বিস্তারিত জেনে আমাদের পক্ষ থেকে যা করণীয়, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে। আলোচনার মাধ্যমে যতটুকু সহায়তা করা সম্ভব, আমরা তা করব।’ সূত্র: বণিক বার্তা 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়